আজ ও আগামীর বিশ্ব এবং বাংলাদেশ
jugantor
আজ ও আগামীর বিশ্ব এবং বাংলাদেশ

  আতাউর রহমান  

০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাভাইরাস-জনিত ব্যাধির (কোভিড-১৯) প্রথম খবর পাওয়া যায় চীনের উহান প্রদেশে ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯ সালে। গত এক বছর ধরে সমগ্র বিশ্ব এ অজানা ব্যাধিকে সঙ্গী করে বসবাস করছে। সারা বিশ্বে আজ অবধি মৃত্যুর হার উনিশ লাখেরও অধিক ছাড়িয়েছে। আমাদের দেশে তুলনামূলকভাবে মৃত্যুর হার কম।

আজ অবধি আট হাজারেরও কম মানুষের প্রাণহানি হয়েছে যদিও আমাদের দেশে জনসংখ্যার ঘনত্ব অনেক বেশি। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই একটা স্থবিরতা এসেছে। ইউরোপের উন্নত দেশগুলো এবং আমেরিকার মতো বিত্তবান দেশও করোনাভাইরাসের আক্রমণে ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েছে। জীবনাচরণের সর্বক্ষেত্রে এসেছে স্থবিরতা। নানা রকমের টিকা বা রোগ প্রতিরোধের কথা শোনা যাচ্ছে। হয়তো, স্বল্প সময়ের মধ্যে টিকা অনেকেরই হাতে চলে আসবে; কিন্তু টিকা শেষ কথা নাও হতে পারে। কারণ এ ভাইরাস রূপ বদলাচ্ছে, যা সমগ্র যুক্তরাজ্যকে বড়দিন এবং নববর্ষ উদযাপন থেকে বিরত রেখেছে ‘লক ডাউন’র মধ্যে। মরণশীল মানুষের একটি দিন হারিয়ে যাওয়া অনেক বেদনার। বর্তমান অবস্থায় আমাদের অনিত্য জীবন থেকে অনেক দিন হারিয়ে গেছে। সেই সঙ্গে আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপুলভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

ভীতি মানুষের জীবনের একটি বড় আতঙ্ক। করোনাভাইরাসের এ দুর্বিসহ সময়ে আমরা একটা ভীতির মধ্যে জীবনযাপন করছি। অপেক্ষা করছি, আমরা সেই আনন্দময় পৃথিবীর, সেই ঝলসিত সূর্যালোকের এবং মনোলোভা চন্দ্রলোকের। মানুষ জন্মগ্রহণ করে এবং তার পরিণতি মৃত্যুতেই ঘটে, এ সত্যটি কারও অজানা নয়। তবে মানুষ একটি স্বাভাবিক মৃত্যু কামনা করে। বর্তমানে চলমান মহামারির কারণে আমাদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে স্থবিরতা নেমে এসেছে। পৃথিবীর সব দেশেই এ মহামারির কারণে সতত চলমান জীবনের প্রবাহ স্তিমিত। জীবিকা অর্জনের সংকটে ভুগছে সব দেশের জনগণ। চাকরিচ্যুত হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ অথবা তাদের বেতন সংকুচিত করা হয়েছে। ব্যবসা বাণিজ্যে চলছে চরম মন্দা। মানুষ আগের মতো নিত্য দিনের পরিশ্রম করতে অপারগ হয়েছে। পাশাপাশি তাদের সংসার ও সামগ্রিক জীবনযাপন হয়েছে বিপুলভাবে ব্যাহত। ক্ষুধা ও দারিদ্র্য বেড়ে গেছে। দেখা গেছে সব সংকটের সময় মানুষের সামাজিক অপরাধ বেড়ে যায়, এখনো তাই হচ্ছে। মানুষের দুর্বলতা ও অসহায়ত্বের সুযোগ নিচ্ছে দুষ্ট ও মন্দ লোকেরা। এ মহামারির সংকটের সময় জীবনের সব ক্ষেত্রে দুর্বৃত্তায়ন বেড়ে গেছে। মানুষের সব বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও শক্তি করোনা নামক অদৃশ্য অনুজীবীদের কাছে পরাজিত আজ। মানুষের নিত্যকার জীবিকার সংকট বেড়ে গেছে এবং নিত্যকার জীবনের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে নানা সাবধানতা অবলম্বন করতে গিয়ে। মুখে মাস্ক লাগাতে হবে, একজনের সঙ্গে অন্যের দূরত্ব রক্ষা করতে হবে এবং পাশাপাশি আরও বেশ কিছু সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। স্বাভাবিক অবস্থায় সুস্থতার পাশাপাশি অসুস্থতা জীবনের নিত্য নৈমিত্তিক উপসর্গ যা জীবিত মানুষকে মেনে নিতেই হয়। হঠাৎ সংক্রমিত এ মহামারির প্রকোপের শিকার হয়ে জগতের প্রতিটি মানুষ এখন বিশ্ব নিয়ন্তার কাছে প্রার্থনা করছে যাতে তারা আবারও তাদের নিত্যকার পৃথিবীকে ফিরে পায়। করোনা মানুষের জীবন সংগ্রামকে করেছে বিপন্ন। মানুষ এখন কোনো রকমে খেয়ে পরে বেঁচে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত। তবে আশার কথা হলো, অতীতে মানুষ অনেক সংকট অতিক্রম করে জীবনের নব অঙ্কুরোদগম ঘটিয়েছে। অতীতের ধ্বংসপ্রাপ্ত সুবর্ণ সভ্যতার শ্মশানকে অতিক্রম করে মানুষ তাকে আবার উর্বরা করছে। অতীতের গর্ভে বিলুপ্ত হয়েছে এসেরীয়, ব্যাবিলনীয়, মায়া, মিসরীয়, গ্রিসীয়, হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোর সুবর্ণ সভ্যতাগুলো। খ্রিষ্টপূর্ব সময়ে কুষ্ঠ রোগে মারা গেছে লাখো কোটি মানুষ। গত শতাব্দীতে প্লেগে মারা গেছে ৭ কোটি মানুষ। সোয়ান ফ্লুতে মারা গেছে ২ কোটি মানুষ। কলেরা, বসন্ত, যক্ষ্মা, দুর্ভিক্ষেও মারা গেছে লাখো কোটি মানুষ। সুদূর অতীতকাল থেকে বিভিন্ন যুদ্ধে মারা গেছে অগণিত মানুষ। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছাড়া আরও অনেক আঞ্চলিক যুদ্ধ ও সমরে প্রাণ হারিয়েছে অগণিত মানুষ।

তবে মানুষ, প্রাণী ও উদ্ভিদ জগৎ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েও যুগে যুগে শুরু করেছে নবযাত্রা। অতি দুঃখের দিনে মানুষের সৃজনশীল কর্মকাণ্ড যতিচিহ্ন টেনে নিশ্চুপ হয়ে যায় না। ইতিহাস থেকে আমরা এ পাঠ নিতে পারি যে; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গোলাগুলির মধ্যে ট্রেঞ্চে বসে মানুষের শিল্প সৃজন বন্ধ হয়ে যায়নি। লেখা হয়েছে নতুন নতুন বই এবং আঁকা হয়েছে পেনসিল বা কয়লা দিয়ে নানা ধরনের চিত্রশিল্প। গুহার মধ্যে বসে বা শুয়ে মানুষ গান গেয়েছে। পেটে ভাত না থাকলেও মানুষ কখনো শিল্প-সৃজন থেকে বিরত থাকেনি। সংগীত রাজা যেমন ভালোবাসে তেমনি অভুক্ত ভিক্ষুকও পছন্দ করে। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায় যে, ভিনস্যাস্ট ভ্যানগঘ এবং আমাদের বরিশালের কবি জীবনানন্দ দাশ দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করেও অনন্য অঙ্কনশিল্প ও কাব্য সৃজন করেছেন।

আমি বিশ্বাস করি আমাদের প্রিয় দেশসহ সমগ্র বিশ্ব একদিন করোনাভাইরাসের আক্রমণ থেকে মুক্ত হবে। হয়তো সেদিন খুব বেশি দূরে নয়। এ করোনাকালীন খেলাধুলা যেমন সীমিত আকারে সাবধানতা নিয়ে শুরু হয়েছে, তেমনি চলচ্চিত্র, টেলিভিশন নাটকের ধারণাও শুরু হয়েছে। জার্মানির বিখ্যাত নাটমঞ্চ, ‘বার্লিনার আন্সাম্বল’-এ দূরত্ব বজায় রেখে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে নাটকের মঞ্চায়ন শুরু হয়েছে করোনাভাইরাস আক্রমণের প্রথম দিক থেকে। রাজধানী ঢাকায় শিল্পকলা একাডেমি এবং মহিলা সমিতি মঞ্চেও সীমিত হারে নাটকের মঞ্চায়ন শুরু হয়েছে। ঢাকার বাইরে অন্যান্য জেলা শহরে একই চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে।

মানুষ আজকাল জীবিকা অর্জনের তাগিদে ঘরের বাইরে আসতে বাধ্য হচ্ছে। সর্বক্ষেত্রে জনগণের এখন অনেক বেশি সময় কাটে গৃহে। মানুষ সে সময় বই পড়ে, চলচ্চিত্র দেখে টিভিসহ অন্যান্য মাধমে, অনেকেই উপন্যাস, প্রবন্ধ, কবিতা লেখে ঘরে বসে, এমনকি সংগীত এবং নৃত্য পরিবেশন করছে ঘরোয়াভাবে। এক কথায়, মানুষের শিল্প-সৃজন থেমে নেই। যুগে যুগে দেখা গেছে, মানুষ আধ-পেটা থেকে শিল্প সৃজন করে গেছে। এ হচ্ছে মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। যে কোনো বৃত্তির মানুষ, ধনী, মধ্যবিত্ত এমন কি দরিদ্র মানুষেরা হৃদয়ের অন্তর্গত তাগিদে কোনো না কোনো ধরনের শিল্পচর্চা করে। শিল্প ও সাহিত্যচর্চা মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। সে জন্য, তাই এ মহামারির দুর্বিসহ সময়েও মানুষের সুকুমার ও প্রয়োগ শিল্পচর্চা থেমে নেই।

যেদিন সমগ্র বিশ্ব এবং আমাদের দেশ বর্তমানের ভয়ংকর ভাইরাস করোনার আক্রমণ থেকে মুক্ত হবে, তার পরবর্তী সময়ে শিল্প ও সাহিত্যচর্চা নতুন গতি পাবে কারণ কর্মজীবী মানুষেরা শিল্পের আধারে মানসিক আশ্রয়, আনন্দ ও শক্তি খুঁজে পায়।

আমি শিল্প-সাহিত্যের বর্তমান অবস্থাকে নেতিবাচক মনে করি না; আগের তুলনায় কিছুটা মন্থর হয়ে পড়েছে। হয়তো, আগের মতো উদ্বেলিত ও তরঙ্গায়িত নেই। সুতরাং আমি মনে করি; করোনামুক্ত বাংলাদেশে শিল্প ও সাহিত্যচর্চার কোনো দুর্ভিক্ষ থাকবে না বরং তা নতুন দ্যোতনায় উদ্ভাসিত হবে। আমি আশাবাদী, কারণ স্থবিরত্বের পরে উদ্ভাসিত হয় নব দিগন্ত। পরিশেষে আমি মনে করি ‘করোনা’মুক্ত দেশে শিল্প-সাহিত্যের অঙ্গন নব দ্যোতনায় উদ্ভাসিত হবে এবং আমরা পাব এক আনন্দময় দেশ ও পৃথিবীকে।

লেখক : অভিনেতা-নাট্য নির্দেশক

আজ ও আগামীর বিশ্ব এবং বাংলাদেশ

 আতাউর রহমান 
০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাভাইরাস-জনিত ব্যাধির (কোভিড-১৯) প্রথম খবর পাওয়া যায় চীনের উহান প্রদেশে ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯ সালে। গত এক বছর ধরে সমগ্র বিশ্ব এ অজানা ব্যাধিকে সঙ্গী করে বসবাস করছে। সারা বিশ্বে আজ অবধি মৃত্যুর হার উনিশ লাখেরও অধিক ছাড়িয়েছে। আমাদের দেশে তুলনামূলকভাবে মৃত্যুর হার কম।

আজ অবধি আট হাজারেরও কম মানুষের প্রাণহানি হয়েছে যদিও আমাদের দেশে জনসংখ্যার ঘনত্ব অনেক বেশি। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই একটা স্থবিরতা এসেছে। ইউরোপের উন্নত দেশগুলো এবং আমেরিকার মতো বিত্তবান দেশও করোনাভাইরাসের আক্রমণে ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েছে। জীবনাচরণের সর্বক্ষেত্রে এসেছে স্থবিরতা। নানা রকমের টিকা বা রোগ প্রতিরোধের কথা শোনা যাচ্ছে। হয়তো, স্বল্প সময়ের মধ্যে টিকা অনেকেরই হাতে চলে আসবে; কিন্তু টিকা শেষ কথা নাও হতে পারে। কারণ এ ভাইরাস রূপ বদলাচ্ছে, যা সমগ্র যুক্তরাজ্যকে বড়দিন এবং নববর্ষ উদযাপন থেকে বিরত রেখেছে ‘লক ডাউন’র মধ্যে। মরণশীল মানুষের একটি দিন হারিয়ে যাওয়া অনেক বেদনার। বর্তমান অবস্থায় আমাদের অনিত্য জীবন থেকে অনেক দিন হারিয়ে গেছে। সেই সঙ্গে আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপুলভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

ভীতি মানুষের জীবনের একটি বড় আতঙ্ক। করোনাভাইরাসের এ দুর্বিসহ সময়ে আমরা একটা ভীতির মধ্যে জীবনযাপন করছি। অপেক্ষা করছি, আমরা সেই আনন্দময় পৃথিবীর, সেই ঝলসিত সূর্যালোকের এবং মনোলোভা চন্দ্রলোকের। মানুষ জন্মগ্রহণ করে এবং তার পরিণতি মৃত্যুতেই ঘটে, এ সত্যটি কারও অজানা নয়। তবে মানুষ একটি স্বাভাবিক মৃত্যু কামনা করে। বর্তমানে চলমান মহামারির কারণে আমাদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে স্থবিরতা নেমে এসেছে। পৃথিবীর সব দেশেই এ মহামারির কারণে সতত চলমান জীবনের প্রবাহ স্তিমিত। জীবিকা অর্জনের সংকটে ভুগছে সব দেশের জনগণ। চাকরিচ্যুত হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ অথবা তাদের বেতন সংকুচিত করা হয়েছে। ব্যবসা বাণিজ্যে চলছে চরম মন্দা। মানুষ আগের মতো নিত্য দিনের পরিশ্রম করতে অপারগ হয়েছে। পাশাপাশি তাদের সংসার ও সামগ্রিক জীবনযাপন হয়েছে বিপুলভাবে ব্যাহত। ক্ষুধা ও দারিদ্র্য বেড়ে গেছে। দেখা গেছে সব সংকটের সময় মানুষের সামাজিক অপরাধ বেড়ে যায়, এখনো তাই হচ্ছে। মানুষের দুর্বলতা ও অসহায়ত্বের সুযোগ নিচ্ছে দুষ্ট ও মন্দ লোকেরা। এ মহামারির সংকটের সময় জীবনের সব ক্ষেত্রে দুর্বৃত্তায়ন বেড়ে গেছে। মানুষের সব বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও শক্তি করোনা নামক অদৃশ্য অনুজীবীদের কাছে পরাজিত আজ। মানুষের নিত্যকার জীবিকার সংকট বেড়ে গেছে এবং নিত্যকার জীবনের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে নানা সাবধানতা অবলম্বন করতে গিয়ে। মুখে মাস্ক লাগাতে হবে, একজনের সঙ্গে অন্যের দূরত্ব রক্ষা করতে হবে এবং পাশাপাশি আরও বেশ কিছু সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। স্বাভাবিক অবস্থায় সুস্থতার পাশাপাশি অসুস্থতা জীবনের নিত্য নৈমিত্তিক উপসর্গ যা জীবিত মানুষকে মেনে নিতেই হয়। হঠাৎ সংক্রমিত এ মহামারির প্রকোপের শিকার হয়ে জগতের প্রতিটি মানুষ এখন বিশ্ব নিয়ন্তার কাছে প্রার্থনা করছে যাতে তারা আবারও তাদের নিত্যকার পৃথিবীকে ফিরে পায়। করোনা মানুষের জীবন সংগ্রামকে করেছে বিপন্ন। মানুষ এখন কোনো রকমে খেয়ে পরে বেঁচে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত। তবে আশার কথা হলো, অতীতে মানুষ অনেক সংকট অতিক্রম করে জীবনের নব অঙ্কুরোদগম ঘটিয়েছে। অতীতের ধ্বংসপ্রাপ্ত সুবর্ণ সভ্যতার শ্মশানকে অতিক্রম করে মানুষ তাকে আবার উর্বরা করছে। অতীতের গর্ভে বিলুপ্ত হয়েছে এসেরীয়, ব্যাবিলনীয়, মায়া, মিসরীয়, গ্রিসীয়, হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোর সুবর্ণ সভ্যতাগুলো। খ্রিষ্টপূর্ব সময়ে কুষ্ঠ রোগে মারা গেছে লাখো কোটি মানুষ। গত শতাব্দীতে প্লেগে মারা গেছে ৭ কোটি মানুষ। সোয়ান ফ্লুতে মারা গেছে ২ কোটি মানুষ। কলেরা, বসন্ত, যক্ষ্মা, দুর্ভিক্ষেও মারা গেছে লাখো কোটি মানুষ। সুদূর অতীতকাল থেকে বিভিন্ন যুদ্ধে মারা গেছে অগণিত মানুষ। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছাড়া আরও অনেক আঞ্চলিক যুদ্ধ ও সমরে প্রাণ হারিয়েছে অগণিত মানুষ।

তবে মানুষ, প্রাণী ও উদ্ভিদ জগৎ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েও যুগে যুগে শুরু করেছে নবযাত্রা। অতি দুঃখের দিনে মানুষের সৃজনশীল কর্মকাণ্ড যতিচিহ্ন টেনে নিশ্চুপ হয়ে যায় না। ইতিহাস থেকে আমরা এ পাঠ নিতে পারি যে; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গোলাগুলির মধ্যে ট্রেঞ্চে বসে মানুষের শিল্প সৃজন বন্ধ হয়ে যায়নি। লেখা হয়েছে নতুন নতুন বই এবং আঁকা হয়েছে পেনসিল বা কয়লা দিয়ে নানা ধরনের চিত্রশিল্প। গুহার মধ্যে বসে বা শুয়ে মানুষ গান গেয়েছে। পেটে ভাত না থাকলেও মানুষ কখনো শিল্প-সৃজন থেকে বিরত থাকেনি। সংগীত রাজা যেমন ভালোবাসে তেমনি অভুক্ত ভিক্ষুকও পছন্দ করে। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায় যে, ভিনস্যাস্ট ভ্যানগঘ এবং আমাদের বরিশালের কবি জীবনানন্দ দাশ দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করেও অনন্য অঙ্কনশিল্প ও কাব্য সৃজন করেছেন।

আমি বিশ্বাস করি আমাদের প্রিয় দেশসহ সমগ্র বিশ্ব একদিন করোনাভাইরাসের আক্রমণ থেকে মুক্ত হবে। হয়তো সেদিন খুব বেশি দূরে নয়। এ করোনাকালীন খেলাধুলা যেমন সীমিত আকারে সাবধানতা নিয়ে শুরু হয়েছে, তেমনি চলচ্চিত্র, টেলিভিশন নাটকের ধারণাও শুরু হয়েছে। জার্মানির বিখ্যাত নাটমঞ্চ, ‘বার্লিনার আন্সাম্বল’-এ দূরত্ব বজায় রেখে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে নাটকের মঞ্চায়ন শুরু হয়েছে করোনাভাইরাস আক্রমণের প্রথম দিক থেকে। রাজধানী ঢাকায় শিল্পকলা একাডেমি এবং মহিলা সমিতি মঞ্চেও সীমিত হারে নাটকের মঞ্চায়ন শুরু হয়েছে। ঢাকার বাইরে অন্যান্য জেলা শহরে একই চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে।

মানুষ আজকাল জীবিকা অর্জনের তাগিদে ঘরের বাইরে আসতে বাধ্য হচ্ছে। সর্বক্ষেত্রে জনগণের এখন অনেক বেশি সময় কাটে গৃহে। মানুষ সে সময় বই পড়ে, চলচ্চিত্র দেখে টিভিসহ অন্যান্য মাধমে, অনেকেই উপন্যাস, প্রবন্ধ, কবিতা লেখে ঘরে বসে, এমনকি সংগীত এবং নৃত্য পরিবেশন করছে ঘরোয়াভাবে। এক কথায়, মানুষের শিল্প-সৃজন থেমে নেই। যুগে যুগে দেখা গেছে, মানুষ আধ-পেটা থেকে শিল্প সৃজন করে গেছে। এ হচ্ছে মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। যে কোনো বৃত্তির মানুষ, ধনী, মধ্যবিত্ত এমন কি দরিদ্র মানুষেরা হৃদয়ের অন্তর্গত তাগিদে কোনো না কোনো ধরনের শিল্পচর্চা করে। শিল্প ও সাহিত্যচর্চা মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। সে জন্য, তাই এ মহামারির দুর্বিসহ সময়েও মানুষের সুকুমার ও প্রয়োগ শিল্পচর্চা থেমে নেই।

যেদিন সমগ্র বিশ্ব এবং আমাদের দেশ বর্তমানের ভয়ংকর ভাইরাস করোনার আক্রমণ থেকে মুক্ত হবে, তার পরবর্তী সময়ে শিল্প ও সাহিত্যচর্চা নতুন গতি পাবে কারণ কর্মজীবী মানুষেরা শিল্পের আধারে মানসিক আশ্রয়, আনন্দ ও শক্তি খুঁজে পায়।

আমি শিল্প-সাহিত্যের বর্তমান অবস্থাকে নেতিবাচক মনে করি না; আগের তুলনায় কিছুটা মন্থর হয়ে পড়েছে। হয়তো, আগের মতো উদ্বেলিত ও তরঙ্গায়িত নেই। সুতরাং আমি মনে করি; করোনামুক্ত বাংলাদেশে শিল্প ও সাহিত্যচর্চার কোনো দুর্ভিক্ষ থাকবে না বরং তা নতুন দ্যোতনায় উদ্ভাসিত হবে। আমি আশাবাদী, কারণ স্থবিরত্বের পরে উদ্ভাসিত হয় নব দিগন্ত। পরিশেষে আমি মনে করি ‘করোনা’মুক্ত দেশে শিল্প-সাহিত্যের অঙ্গন নব দ্যোতনায় উদ্ভাসিত হবে এবং আমরা পাব এক আনন্দময় দেশ ও পৃথিবীকে।

লেখক : অভিনেতা-নাট্য নির্দেশক

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : ২২ বছরে যুগান্তর

০৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২১
০৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২১