বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিল্প-সাহিত্যচর্চা
jugantor
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিল্প-সাহিত্যচর্চা

  রকিবুল হাসান  

০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

উচ্চশিক্ষাঙ্গনে বাংলা ভাষা-শিল্প-সাহিত্য চর্চা গতানুগতিকভাবে যা চলে আসছে, অনেকটা সেভাবেই রয়েছে। কোনো প্রবল তরঙ্গাভিঘাতের সৃষ্টি করতে পারছে না।

’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই এদেশের স্বাধীনতা ও স্বাধিকারের আন্দোলন অগ্নিরূপ ধারণ করে তা মুক্তিযুদ্ধতে পরিণত হয়েছিল, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছিল। ’৪৭-এর দেশভাগের সময় বাংলাকে ভাগ করে দেয়া হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরাকে ভারতের সঙ্গে রেখে, শুধু পূর্ব বাংলাকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। এই পূর্ব বাংলা পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক তেইশ বছর ভয়াবহ দুঃশাসনের শিকার হয়েছে। আমাদের ভাষার অধিকার হরণের নির্লজ্জ চেষ্টা করা হয়েছে। আমাদের শিল্প-সাহিত্যের ওপর আগ্রাসন চালানো হয়েছে। আমাদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির ওপর বহুবার বহুভাবে বহুকৌণিক রাজনৈতিক আঘাত এসেছে। কিন্তু এদেশের মানুষ তার নিজের ভাষা-শিল্প-সাহিত্যে কখনো কোনো আপস করেনি। নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেনি। হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান- এসব জাতধর্মের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে- বাঙালির বাঙালিত্ব। এটি আমাদের প্রাণের মূল শক্তি। যত সংকট আসুক- যত সমস্যা আসুক বাঙালির শক্তি তার ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের চেতনা। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষিত কি? এ প্রশ্ন খুব স্বাভাবিক। আমরা কি আগের চেতনায় অটুট আছি নাকি অন্য ভাষা-শিল্প-সাহিত্যে পরনির্ভরশীল হয়ে যাচ্ছি?

বাংলাদেশে বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবল এক জোয়ার চলছে। দেশে বর্তমানে ১০৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। বেশিও হতে পারে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়টিতে বাংলা বিভাগ আছে? কয়টিতে বাংলা পড়ানো হয়? শিল্প-সাহিত্যের চর্চা কি হয়? আমার জানা মতে, হাতেগোনা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ চালু আছে। সেগুলোরও আবার সব কয়টিতে পূর্ণ বাংলা বিভাগ নেই। ইউজিসি বেসরকারি প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ে সব বিভাগেই ১০০ নম্বরের ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্য’ ও ‘বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস’ নামে দুটি পূর্ণ কোর্স পড়ানো বাধ্যতামূলক করলেও, এটি কয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যকর হয়েছে? অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়েই কোর্স দুটি পড়ানো হয় না। কেন হয় না? হয় না এ কারণেই- সবার ধারণা বাংলা পড়ে কি হয়? বাংলা আবার পড়ার মতো কোনো ব্যাপার হলো? বাংলা পড়িয়ে তো টাকা আসে না। আর ও তো আমরা জানিই। যেটি ভয়াবহ, তা হলো বাংলা পড়ালে তো পুঁজি বাড়বে না। ব্যবসা হবে না। ইউজিসি বারবার কেন যে এসব চাপ প্রয়োগ করে! পারলে তাদের নির্দেশনামা সীমানার বাইরে রাখে- যতদিন চালু না করে পারা যায়। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় সিলেবাসও সংশোধন করে অনুমোদনের জন্য পাঠায় না। কারণ ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্য’ ও ‘বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস’ কোর্স দুটি সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত না করলে সংশোধিত সিলেবাসের আনুমোদন ইউজিসি দেবে না। ফলে সিলেবাস না পাঠিয়ে জোড়াতালি দিয়ে যতদিন চালানো যায়। তবুও বাংলা পড়াবে না। চলছেও এভাবে। দু-একটি ব্যতিক্রম ব্যতীত। অদ্ভুত। ভাবাও যায় না। সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে এভাবে চলছে এসব বিশ্ববিদ্যালয়। নিজের দেশ- নিজের দেশের শিল্প-সাহিত্য সম্পর্কে ন্যূনতম একটা ধারণাও শিক্ষার্থীদের দেয়া হচ্ছে না। কোন সাবজেক্টের বাজারমূল্য বেশি- সেটি চালু করা বা সেটিকেই লালন-পালন করা তাদের ধ্যান-জ্ঞানে পরিণত হয়। কারণ এতে পুঁজি বৃদ্ধি পায়। সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেই কমবেশি এ কথা প্রযোজ্য। কিছু বিশ্ববিদ্যালয় আছে তারা ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় হোক বা বিশেষ কোনো কারণেই হোক বাংলা বিভাগ চালু করেছেন। চালু রেখেছেন। সঙ্গে বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি-ধামকিও আছে। প্রায় সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় একবার নড়ে উঠেছিল- যখন হলি আর্টিজান জঙ্গিদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল। তার পর পরই সরকার সব বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজস্ব ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চা, অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয় সংগীত বাধ্যতার ভেতর এনেছিল। সে সময় বেসরকারি অনেক বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগ চালু করার কথা চিন্তা-ভাবনা করলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এখন তা প্রায় পুরোটাই নিভে গেছে। জাতীয় সংগীত তখন অনুষ্ঠানে শুরুতে গাওয়া বা বাজানো হলেও, কিছুদিন পরে সেটিও আর চালু থাকেনি। পূর্বের অবস্থানে সব ফিরে গেছে। সে সময় বাঙালি সংস্কৃতি নিয়ে- বাংলা ভাষা নিয়ে- বাঙালি কবি-সাহিত্যিকদের নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান লক্ষ করা গেলেও, তাও একসময় জলে ভেসে গেছে। হাতেগোনা কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ বৈরিতার ভেতরও চলছে। সেখানে কর্তৃপক্ষের কপালে ভাঁজ পড়া অবস্থার ভেতর দিয়েও দেশীয় ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে কিছু কাজকর্ম হয়। যদি বাংলার শিক্ষকরা চরমভাবে বেতনবৈষম্যের শিকার। এরকম পরিস্থিতির শিকার যারা, তাদের কাছে বাংলা পড়াটা ‘পাপ’ হিসেবে যদি গণ্য হয় বা ‘ভুল’ সিদ্ধান্ত বলে যদি বিবেচিত হয়, সেখানে এর বিপক্ষে জবাব মেলানো কঠিন আছে- যতই মন-মনন-শিল্পপ্রেমের দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়ে সান্ত্বনার অমিয়ধারা নিবেদন করা হোক না কেন। ওসব একরকম ফাঁকিবাজি- জীবনযুদ্ধে নামলেই তা বোঝা যাবে- প্রকৃত সম্মানটাও সেখানে রক্ষিত হয় না। পেটে ভাত নেই- বাসা ভাড়ার টাকা হয় না- উশকোখুশকো শিক্ষকের যে ছবি আমরা দেখে আসছি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার শিক্ষকরা কি এর চেয়ে ভালো আছেন? অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে- বিশেষ করে যেখানে বাংলা বিভাগ আছে- সেখানে একই যোগ্যতাসম্পন্ন অন্য বিভাগের শিক্ষকের চেয়ে বাংলা বিভাগের বেতন তুলনামূলক অনেক কম। কেন? দারিদ্র্যের সমুদ্রে নিমজ্জিত হয়ে শিল্প-সাহিত্যের সাধক তিনি! পেছনে উপহাস আর অবহেলা। তবুও কিছুই না হওয়ার চেয়ে কিছু হওয়া ভালো। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ করে যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ আছে, তাদের শিল্প-সাহিত্য বিষয়ক কর্মকাণ্ডকে ইতিবাচক বিবেচনা করলে, হতাশার পরিবর্তে কিছুটা হলেও আশার আলো অনুধাবন করে নেয়া যায়। যদিও সেসব কর্মকাণ্ডে কর্তৃপক্ষের তুচ্ছতাচ্ছিল্য আছে, দয়া দেখানোর মতো একটি ভাব আছে। বৈষম্যমূলক আচরণ আছে। ‘দেখানো’র একটি নাটক আছে। দেখানোটা কি? বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে তারা ধারণ করে। যদিও ভেতরে ভেতরে বাংলা বিভাগের শিক্ষকদের রীতিমতো শোষণ করা হয়- গুরুত্বপূর্ণহীন ভাবা হয়। এরপরও এটিকে ভালো দিক বলেই মানতে চাই। আর যারা বাংলা পড়ানোটাই প্রয়োজন মনে করে না, তাদের জন্য নিবেদিত মধ্যযুগের কবি আব্দুল হাকিমের কবিতা- ‘যে সবে বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী? সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি’।

যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ আছে, সেখানে বাংলাটা পড়ানো হয়। বাঙালি সংস্কৃতি পড়ানো হয়। বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য পড়ানো হয়। বিদেশি সাহিত্যও কমবেশি পড়ানো হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞান-সমাজবিজ্ঞান-তথ্যপ্রযুক্তি পড়ানো হয়। ইংরেজিও পড়ানো হয়। কিছু শিক্ষার্থী হলেও তাদের মনে-মননে-স্বপ্নে নিজের ভাষা- নিজের দেশ- নিজের সংস্কৃতিবোধ গড়ে ওঠে। যখন নিজের ভাষা পর-ভাষার রাহুগ্রাসে পরিণত হয়, পেশাদারিত্বে যখন নিজের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি গুরুত্বহীন হয়- বাঙালি মূল্যবোধ যখন অবক্ষয়ে ক্ষয়ে ক্ষয়ে শেষ হয়ে যায়- ভোগবাদী স্বার্থান্ধ সমাজ যখন ভয়ংকর বিষধর ফণা তুলে দংশন করে, তখন কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা-শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক ছোট ছোট আয়োজনগুলোকে আর ছোট ভাবার সুযোগ থাকে না- ক্ষুদ্রভাবে দেখার সুযোগ নেই। আলোটা হয়তো অনেক বড় নয়- আলোর জ্বালানি হয়তো অনিচ্ছায় দেয়া হচ্ছে- তবুও তো আলোটা জ্বলছে- জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে, সেটি মঙ্গল ও কল্যাণের আলো হিসাবেই জ্বলছে। এটিকে অনেক বড় করে দেখতে চাই। অনেক বড় কৃতিত্ব দিতে চাই। সেই অনিচ্ছাকেও সম্মান জানাই। বেসরকারি অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই জার্নাল প্রকাশিত হয়। কিন্তু বাংলা গবেষণা পত্রিকা কয়টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হয়? এক দুই করে তিন চার করে এর বেশি খুব একটা এগুবে না। অথচ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা শতাধিক। তবুও আলো দেখতে চাই। দু’চারটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে হলেও তো বাংলা ভাষা ও সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষণা পত্রিকা বেরোয়- হোক তা নিয়মিত কিংবা অনিয়মিত। এটি করতেও বাংলা বিভাগের শিক্ষকদের অনেক জ্বালা-যন্ত্রণা ও অবজ্ঞাকে ভালোবাসা ভেবে গ্রহণ করে নিতে হয়। কবিতাপাঠ, সাহিত্য বিষয়ক আলোচনা কিছুটা হলেও হয় তো। হয় বলেই তো সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে সদ্য প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতো মনীষী বারবার ছুটে গিয়েছেন। জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, অধ্যাপক সৈয়দ আকরম হোসেন, অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান, বিখ্যাত কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন, অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ, কবি রুবী রহমান, কথাশিল্পী ইমদাদুল হক মিলন, কবি হাবিবুল্লাহ সিরাজী, অধ্যাপক জুলফিকার মতিনের মতো দেশবরেণ্য মনীষীরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিল্প-সাহিত্যের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উপস্থিত হন। বাংলা শিল্প-সাহিত্যচর্চাটাকে তারা ভালোবাসেন বলেই তো এসব প্রতিষ্ঠানে প্রাণের টানে ছুটে আসেন। এটিই বাঙালির শেকড় ও শক্তি। এর পরও কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈশাখী উৎসব, বসন্তবরণ, পিঠা উৎসব- এসবের আয়োজন হয়। একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে শহিদ মিনারে পুষ্প অর্পণে খুব একটা গুরুত্ব না থাকলেও লোক দেখানোর মতো আলোচনার আয়োজন থাকে। একটি অভিজ্ঞতার কথা বলি, আমি কয়েক বছর আগে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগ দিই। তার আগে অন্য আর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে শিক্ষকতা করেছি। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে একুশে ফেব্রুয়ারি ভোরে শহীদ মিনারে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ারই প্রচলন ছিল না। দিনটি পুরো বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি থাকত। একুশে ফেব্রুয়ারির পরে কোনো একদিন এক আলোচনা অনুষ্ঠান করেই দায়িত্ব শেষ হতো। তাতেও যত কম টাকা ব্যয় করা যায়। অথচ অন্য কোনো বিভাগের সামান্য একটি সেমিনারেও এর চেয়ে বহুগুণ বেশি অর্থ বরাদ্দ থাকত। নতুন দায়িত্ব নিয়ে যখন অন্য আর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করি, এখানে এসে যখন জানলাম, একুশে ফেব্রুয়ারির ভোরে শহিদ মিনারে ফুলেল শ্রদ্ধা জানানো হয়, মনটা ভরে গেল। বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতি শ্রদ্ধা বেড়ে গেল। যোগদানের পরে প্রথম ফেব্রুয়ারিতে আমরা বিভাগের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের লেখা সংবলিত দেয়ালিকা প্রকাশ করলাম- শিক্ষার্থীদের কবিতা নিয়ে কবিতা সংকলন করলাম- কয়েকজন শিক্ষার্থীর কাব্যগ্রন্থ বের করার ব্যবস্থা করলাম পরিচিত বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে। পুরো বইমেলা মাসজুড়ে আমাদের ছেলেমেয়েদের আনন্দমুখর পদচারণা ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এসব তরুণ কবিদের জন্য ছোট পরিসরে অভিবাদন জানানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। তাদের ফুল দিয়ে সংবর্ধনা দিয়েছিল। এতে দারুণ অনুপ্রাণিত হলো এসব শিক্ষার্থী। আবার এই বিশ্ববিদ্যালয়ই লোকসানের কারণ দেখিয়ে কয়েকবার বাংলা বিভাগ বন্ধ করার উদ্যোগও নিয়েছে। যা হোক, একুশে ফেব্রুয়ারি সকাল সাতটায় ক্যাম্পাসের অস্থায়ী শহিদ মিনারে পুষ্প অর্পণের সিদ্ধান্ত হয়। সাড়ে ছয়টায় আমি, আমার স্ত্রী আর কন্যাকে নিয়ে যখন ক্যাম্পাসে গিয়ে উপস্থিত হই, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশদ্বারে তালা ঝুলছে। একটি মানুষও নেই। নিজের কাছে ভালো রকমের একটি ধাক্কা খাই। যে ছবিটি কল্পনা করে এসেছি, তার সঙ্গে পুরোটাই অমিল, আমরা ফুল হাতে দাঁড়িয়ে মূল ফলকে ধাক্কা দিতে থাকি। কিছুক্ষণ পরে এটা খোলা হয়।

একটু পরেই বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা আসতে শুরু করে। সাড়ে সাত-আটটার দিকে বড় বড় কর্মকর্তা এলেন- সব মিলে ১৫-২০ জন। গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ১০ হাজার বলে গর্ব করা হয়। আড়াইশ’র বেশি শিক্ষক-কর্মকর্তা। সেখানে এই হলো একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একুশের ভোরের ছবি। তবুও তো এখানে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধায় পুষ্প অর্পণ করা গেল। এক দেড়শ গজ পথ ঘুরে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গাইতে তো পারলাম। হোক ১৫-২০ জন। কিন্তু ১০৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে কয়টি বিশ্ববিদ্যালয় এতটুকুও করতে পেরেছে বা করেছে? পরবর্তীতে আমি উপাচার্য মহোদয়ের মিটিংয়ে এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে, নিয়ম করে দেয়া হয় একুশের ভোরে শহিদ মিনারে প্রত্যেক বিভাগ থেকে ন্যূনতম ৫০ জন শিক্ষার্থী এবং প্রত্যেক বিভাগের প্রধান ও ন্যূনতম দু’জন করে শিক্ষক অংশগ্রহণ করবে। উপাচার্য-উপউপাচার্য-ডিন-নিবন্ধক তো থাকবেনই। আর বাংলা বিভাগের সব শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। ভাষা আন্দোলন কি শুধু বাংলা বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য? অন্যদের কেনো নিয়মের ভেতর বেঁধে উপস্থিত করানো? অবাক করার মতো ব্যাপার পরের বারে একুশের ভোরের দৃশ্য অবশ্য গতবারের থেকে খানিকটা হলেও ভিন্ন হয়ে ওঠে। বাংলা বিভাগের সব শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অন্যদের উপস্থিতি মিলে দেড়-দু’শ হতে পেরেছিল। এ সংখ্যা ক্রমেই বেড়েছে। বাংলা বিভাগটা এ বিশ্ববিদ্যালয়ে না থাকলে, এ দৃশ্যটাও হয়তো তৈরি হতো না। অন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালগুলোর ছবি দেখে অন্তত সে ধারণাই হয়। এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিআর রিভিউ জার্নাল প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করলে, মিটিংয়ে তা উপস্থাপন করলে, ট্রাস্টি বোর্ডের একজন সদস্য তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বললেন, ‘এসব হাবিজাবি করে শুধু টাকা নষ্ট। এসব করে কি লাভ? বাংলা কি পড়ার মতো কোনো বিষয়? বাদ দেন এসব।’ উপাচার্য মহোদয়ের সহযোগিতায় একরকম প্রতিবাদ করে এর অনুমোদন নেয়া সম্ভব হলেও, প্রত্যেকটি সংখ্যা প্রকাশের আগে অনুমোদন নিতে গিয়ে নাস্তানাবুদ হতে হতো- হাজার কথা শুনতে হতো। যেন পৈতৃক সম্পত্তি রক্ষার জন্য যুদ্ধ! আসলে যুদ্ধটা যে তার চেয়েও বড়- সেই বোধ-তাড়না ও দায় নিয়ে, অবজ্ঞা-অপমানকে ভালোবেসে এসব করতে হয়েছে। অথচ অন্য বিভাগগুলো কত স্বাচ্ছন্দ্য ও কত সম্মানের সঙ্গে তাদের জার্নাল করেছে। আমি যেন এসব করে এক ‘মহাপাপ’ করেছি, ভাবখানা এমন। আর আমার মাথার উপরে যারা বিদেশের বড় বড় ডক্টরেট- তারা নিজের চেয়ার বাঁচানোর জন্য মেরুদণ্ডহীন ‘অ্যামিবা’ প্রাণী হয়ে নীরব থেকেছেন- টু-শব্দটিও করতে চান নি- যদি মালিকপক্ষ অখুশি হন- চাকরিটা যদি চলে যায়! আবার এরাই ভাষার আলোচনায় মহাবাক্য আওড়ান। অদ্ভুত সব ছবি! বিভিন্ন বিভাগের অনুষ্ঠানে বাইরে থেকে মান্যবর কোনো অতিথি আনা হলে, তাদের জন্য ভালো অঙ্কের সম্মানী-অর্থ বরাদ্দ থাকে। আপ্যায়নের উন্নত ব্যবস্থা থাকে। বাংলা বিভাগের অনুষ্ঠানের অনুমতি পেতেই ‘মলনমলা মেওয়া’ গরুর মতো ঘুরতে ঘুরতে নাভিশ্বাস উঠে যেত। অনুমতি মিললেও বরাদ্দ নেমে আসে তলানিতে, যা দিয়ে সাধাসিধে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করাই কঠিন হয়ে পড়ত। আপ্যায়নের মান কমে যেত- সম্মানীর অঙ্ক কমে যেত- কোনো কোনো সময় থাকতও না। বিশ্রিরকমের বৈষম্য। এসব নিয়ে মিটিংয়ে কথা বললে, ‘বলা হতো এসব রাজনৈতিক বক্তব্য থামাও।’ আচ্ছা, রাজনীতি ছাড়া কি কিছু হয়? ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন- এসব কি রাজনীতির বাইরের কোনো কিছু? আসলে দাসত্ব জিনিসটা এখনো মহারথিদের অনেকেরই পছন্দ। সাহিত্য পুরস্কারের আয়োজন করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি বৃদ্ধির ব্যাপারটি কর্তৃপক্ষ অনুধাবন করায় এটিকে চমৎকারভাবে করা সম্ভব হয়েছে। কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এটি একটি দারুণ ব্যাপার ছিল। দেশের দেড়-দুশ কবি-সাহিত্যিককে একসঙ্গে সমবেত করে একটি মিলনমেলায় পরিণত করতে পেরেছিলাম ঠিকই, কিন্তু সেখানেও নীরবে বৈষম্যের একটি বিশ্রি ব্যাপার ছিল। বিশেষ কিছু কবি-সাহিত্যিক- যাদের দেশজুড়ে নাম, তাদের জন্য গোপনে একরকমের বিশেষ আপ্যায়নের ব্যবস্থা, একটু কম নাম-করা কবি-সাহিত্যিকদের জন্য সাধারণমানের আপ্যায়ন- এসব বেদনাদায়ক ব্যাপারও হজম করতে হয়েছে। তবুও আশার আলো, থাকুক বৈষম্য, অন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এসব তো করেই না, এখানে তো তবু হচ্ছে। এটাই বা কম কিসের!

করোনাকালের এ সময়কালে যখন কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাভাষা ও শিল্প-সাহিত্য বিষয়ক কোনো ওয়েবিনার করেনি, তখন নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ প্রথম আন্তর্জাতিক ওয়েবিনারের আয়োজন করে। এবং এটি নিয়মিতভাবে এখনো আয়োজন করা হয়। অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড এবং ভারতের বিভিন্ন কবি-সাহিত্যিক শিক্ষাবিদ এসব ওয়েবিনারে অংশগ্রহণ করেন। নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য প্রায় প্রত্যেকটি ওয়েবিনারে যুক্ত থেকেছেন। বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, খ্যাতিমান অধ্যাপক-কবি-গবেষক এসব ওয়েবিনারে অংশগ্রহণ করেছেন। পরবর্তীতে আরও দু-একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে ওয়েবিনারের আয়োজন করেছে। প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয় যদি এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করে, বাংলা শিল্প-সাহিত্য বিকাশের ধারায় আরও বহু দূর এগিয়ে যাবে। তবে তার আগে প্রয়োজন কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতা- মাতৃভাষার প্রতি গভীর মমত্ব ও দায়বোধ, তা সম্ভব না হলে কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আনন্দের সঙ্গে শিল্প-সাহিত্য নিয়ে কাজ করা কঠিন। তিন-চারটে বিশ্ববিদ্যালয় ইউজিসি নির্ধারিত ১০০ নম্বরের বাংলা কোর্স পাঠদান করছে। কিন্তু সেখানে বাংলা বিভাগ নেই। কেনো প্রত্যেকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ নেই- এ প্রশ্নের উত্তর- পুঁজিবাদী চিন্তা- পুঁজির বিকাশ ঘটানোই মূল লক্ষ্য। মাতৃভাষার মর্যাদার জন্য যে দেশের সন্তানেরা বুকের তাজা রক্ত দিয়েছে, যে রক্তের স্রোতে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে- স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ অর্জিত হয়েছে- সেই দেশের প্রত্যেকটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাংলা বিভাগ প্রতিষ্ঠা কি অপরিহার্য নয়?

লেখক : কবি, গবেষক, চেয়ারম্যান বাংলা বিভাগ,

নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিল্প-সাহিত্যচর্চা

 রকিবুল হাসান 
০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

উচ্চশিক্ষাঙ্গনে বাংলা ভাষা-শিল্প-সাহিত্য চর্চা গতানুগতিকভাবে যা চলে আসছে, অনেকটা সেভাবেই রয়েছে। কোনো প্রবল তরঙ্গাভিঘাতের সৃষ্টি করতে পারছে না।

’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই এদেশের স্বাধীনতা ও স্বাধিকারের আন্দোলন অগ্নিরূপ ধারণ করে তা মুক্তিযুদ্ধতে পরিণত হয়েছিল, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছিল। ’৪৭-এর দেশভাগের সময় বাংলাকে ভাগ করে দেয়া হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরাকে ভারতের সঙ্গে রেখে, শুধু পূর্ব বাংলাকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। এই পূর্ব বাংলা পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক তেইশ বছর ভয়াবহ দুঃশাসনের শিকার হয়েছে। আমাদের ভাষার অধিকার হরণের নির্লজ্জ চেষ্টা করা হয়েছে। আমাদের শিল্প-সাহিত্যের ওপর আগ্রাসন চালানো হয়েছে। আমাদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির ওপর বহুবার বহুভাবে বহুকৌণিক রাজনৈতিক আঘাত এসেছে। কিন্তু এদেশের মানুষ তার নিজের ভাষা-শিল্প-সাহিত্যে কখনো কোনো আপস করেনি। নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেনি। হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান- এসব জাতধর্মের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে- বাঙালির বাঙালিত্ব। এটি আমাদের প্রাণের মূল শক্তি। যত সংকট আসুক- যত সমস্যা আসুক বাঙালির শক্তি তার ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের চেতনা। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষিত কি? এ প্রশ্ন খুব স্বাভাবিক। আমরা কি আগের চেতনায় অটুট আছি নাকি অন্য ভাষা-শিল্প-সাহিত্যে পরনির্ভরশীল হয়ে যাচ্ছি?

বাংলাদেশে বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবল এক জোয়ার চলছে। দেশে বর্তমানে ১০৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। বেশিও হতে পারে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়টিতে বাংলা বিভাগ আছে? কয়টিতে বাংলা পড়ানো হয়? শিল্প-সাহিত্যের চর্চা কি হয়? আমার জানা মতে, হাতেগোনা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ চালু আছে। সেগুলোরও আবার সব কয়টিতে পূর্ণ বাংলা বিভাগ নেই। ইউজিসি বেসরকারি প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ে সব বিভাগেই ১০০ নম্বরের ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্য’ ও ‘বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস’ নামে দুটি পূর্ণ কোর্স পড়ানো বাধ্যতামূলক করলেও, এটি কয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যকর হয়েছে? অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়েই কোর্স দুটি পড়ানো হয় না। কেন হয় না? হয় না এ কারণেই- সবার ধারণা বাংলা পড়ে কি হয়? বাংলা আবার পড়ার মতো কোনো ব্যাপার হলো? বাংলা পড়িয়ে তো টাকা আসে না। আর ও তো আমরা জানিই। যেটি ভয়াবহ, তা হলো বাংলা পড়ালে তো পুঁজি বাড়বে না। ব্যবসা হবে না। ইউজিসি বারবার কেন যে এসব চাপ প্রয়োগ করে! পারলে তাদের নির্দেশনামা সীমানার বাইরে রাখে- যতদিন চালু না করে পারা যায়। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় সিলেবাসও সংশোধন করে অনুমোদনের জন্য পাঠায় না। কারণ ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্য’ ও ‘বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস’ কোর্স দুটি সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত না করলে সংশোধিত সিলেবাসের আনুমোদন ইউজিসি দেবে না। ফলে সিলেবাস না পাঠিয়ে জোড়াতালি দিয়ে যতদিন চালানো যায়। তবুও বাংলা পড়াবে না। চলছেও এভাবে। দু-একটি ব্যতিক্রম ব্যতীত। অদ্ভুত। ভাবাও যায় না। সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে এভাবে চলছে এসব বিশ্ববিদ্যালয়। নিজের দেশ- নিজের দেশের শিল্প-সাহিত্য সম্পর্কে ন্যূনতম একটা ধারণাও শিক্ষার্থীদের দেয়া হচ্ছে না। কোন সাবজেক্টের বাজারমূল্য বেশি- সেটি চালু করা বা সেটিকেই লালন-পালন করা তাদের ধ্যান-জ্ঞানে পরিণত হয়। কারণ এতে পুঁজি বৃদ্ধি পায়। সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেই কমবেশি এ কথা প্রযোজ্য। কিছু বিশ্ববিদ্যালয় আছে তারা ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় হোক বা বিশেষ কোনো কারণেই হোক বাংলা বিভাগ চালু করেছেন। চালু রেখেছেন। সঙ্গে বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি-ধামকিও আছে। প্রায় সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় একবার নড়ে উঠেছিল- যখন হলি আর্টিজান জঙ্গিদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল। তার পর পরই সরকার সব বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজস্ব ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চা, অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয় সংগীত বাধ্যতার ভেতর এনেছিল। সে সময় বেসরকারি অনেক বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগ চালু করার কথা চিন্তা-ভাবনা করলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এখন তা প্রায় পুরোটাই নিভে গেছে। জাতীয় সংগীত তখন অনুষ্ঠানে শুরুতে গাওয়া বা বাজানো হলেও, কিছুদিন পরে সেটিও আর চালু থাকেনি। পূর্বের অবস্থানে সব ফিরে গেছে। সে সময় বাঙালি সংস্কৃতি নিয়ে- বাংলা ভাষা নিয়ে- বাঙালি কবি-সাহিত্যিকদের নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান লক্ষ করা গেলেও, তাও একসময় জলে ভেসে গেছে। হাতেগোনা কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ বৈরিতার ভেতরও চলছে। সেখানে কর্তৃপক্ষের কপালে ভাঁজ পড়া অবস্থার ভেতর দিয়েও দেশীয় ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে কিছু কাজকর্ম হয়। যদি বাংলার শিক্ষকরা চরমভাবে বেতনবৈষম্যের শিকার। এরকম পরিস্থিতির শিকার যারা, তাদের কাছে বাংলা পড়াটা ‘পাপ’ হিসেবে যদি গণ্য হয় বা ‘ভুল’ সিদ্ধান্ত বলে যদি বিবেচিত হয়, সেখানে এর বিপক্ষে জবাব মেলানো কঠিন আছে- যতই মন-মনন-শিল্পপ্রেমের দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়ে সান্ত্বনার অমিয়ধারা নিবেদন করা হোক না কেন। ওসব একরকম ফাঁকিবাজি- জীবনযুদ্ধে নামলেই তা বোঝা যাবে- প্রকৃত সম্মানটাও সেখানে রক্ষিত হয় না। পেটে ভাত নেই- বাসা ভাড়ার টাকা হয় না- উশকোখুশকো শিক্ষকের যে ছবি আমরা দেখে আসছি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার শিক্ষকরা কি এর চেয়ে ভালো আছেন? অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে- বিশেষ করে যেখানে বাংলা বিভাগ আছে- সেখানে একই যোগ্যতাসম্পন্ন অন্য বিভাগের শিক্ষকের চেয়ে বাংলা বিভাগের বেতন তুলনামূলক অনেক কম। কেন? দারিদ্র্যের সমুদ্রে নিমজ্জিত হয়ে শিল্প-সাহিত্যের সাধক তিনি! পেছনে উপহাস আর অবহেলা। তবুও কিছুই না হওয়ার চেয়ে কিছু হওয়া ভালো। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ করে যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ আছে, তাদের শিল্প-সাহিত্য বিষয়ক কর্মকাণ্ডকে ইতিবাচক বিবেচনা করলে, হতাশার পরিবর্তে কিছুটা হলেও আশার আলো অনুধাবন করে নেয়া যায়। যদিও সেসব কর্মকাণ্ডে কর্তৃপক্ষের তুচ্ছতাচ্ছিল্য আছে, দয়া দেখানোর মতো একটি ভাব আছে। বৈষম্যমূলক আচরণ আছে। ‘দেখানো’র একটি নাটক আছে। দেখানোটা কি? বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে তারা ধারণ করে। যদিও ভেতরে ভেতরে বাংলা বিভাগের শিক্ষকদের রীতিমতো শোষণ করা হয়- গুরুত্বপূর্ণহীন ভাবা হয়। এরপরও এটিকে ভালো দিক বলেই মানতে চাই। আর যারা বাংলা পড়ানোটাই প্রয়োজন মনে করে না, তাদের জন্য নিবেদিত মধ্যযুগের কবি আব্দুল হাকিমের কবিতা- ‘যে সবে বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী? সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি’।

যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ আছে, সেখানে বাংলাটা পড়ানো হয়। বাঙালি সংস্কৃতি পড়ানো হয়। বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য পড়ানো হয়। বিদেশি সাহিত্যও কমবেশি পড়ানো হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞান-সমাজবিজ্ঞান-তথ্যপ্রযুক্তি পড়ানো হয়। ইংরেজিও পড়ানো হয়। কিছু শিক্ষার্থী হলেও তাদের মনে-মননে-স্বপ্নে নিজের ভাষা- নিজের দেশ- নিজের সংস্কৃতিবোধ গড়ে ওঠে। যখন নিজের ভাষা পর-ভাষার রাহুগ্রাসে পরিণত হয়, পেশাদারিত্বে যখন নিজের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি গুরুত্বহীন হয়- বাঙালি মূল্যবোধ যখন অবক্ষয়ে ক্ষয়ে ক্ষয়ে শেষ হয়ে যায়- ভোগবাদী স্বার্থান্ধ সমাজ যখন ভয়ংকর বিষধর ফণা তুলে দংশন করে, তখন কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা-শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক ছোট ছোট আয়োজনগুলোকে আর ছোট ভাবার সুযোগ থাকে না- ক্ষুদ্রভাবে দেখার সুযোগ নেই। আলোটা হয়তো অনেক বড় নয়- আলোর জ্বালানি হয়তো অনিচ্ছায় দেয়া হচ্ছে- তবুও তো আলোটা জ্বলছে- জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে, সেটি মঙ্গল ও কল্যাণের আলো হিসাবেই জ্বলছে। এটিকে অনেক বড় করে দেখতে চাই। অনেক বড় কৃতিত্ব দিতে চাই। সেই অনিচ্ছাকেও সম্মান জানাই। বেসরকারি অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই জার্নাল প্রকাশিত হয়। কিন্তু বাংলা গবেষণা পত্রিকা কয়টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হয়? এক দুই করে তিন চার করে এর বেশি খুব একটা এগুবে না। অথচ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা শতাধিক। তবুও আলো দেখতে চাই। দু’চারটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে হলেও তো বাংলা ভাষা ও সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষণা পত্রিকা বেরোয়- হোক তা নিয়মিত কিংবা অনিয়মিত। এটি করতেও বাংলা বিভাগের শিক্ষকদের অনেক জ্বালা-যন্ত্রণা ও অবজ্ঞাকে ভালোবাসা ভেবে গ্রহণ করে নিতে হয়। কবিতাপাঠ, সাহিত্য বিষয়ক আলোচনা কিছুটা হলেও হয় তো। হয় বলেই তো সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে সদ্য প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতো মনীষী বারবার ছুটে গিয়েছেন। জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, অধ্যাপক সৈয়দ আকরম হোসেন, অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান, বিখ্যাত কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন, অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ, কবি রুবী রহমান, কথাশিল্পী ইমদাদুল হক মিলন, কবি হাবিবুল্লাহ সিরাজী, অধ্যাপক জুলফিকার মতিনের মতো দেশবরেণ্য মনীষীরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিল্প-সাহিত্যের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উপস্থিত হন। বাংলা শিল্প-সাহিত্যচর্চাটাকে তারা ভালোবাসেন বলেই তো এসব প্রতিষ্ঠানে প্রাণের টানে ছুটে আসেন। এটিই বাঙালির শেকড় ও শক্তি। এর পরও কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈশাখী উৎসব, বসন্তবরণ, পিঠা উৎসব- এসবের আয়োজন হয়। একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে শহিদ মিনারে পুষ্প অর্পণে খুব একটা গুরুত্ব না থাকলেও লোক দেখানোর মতো আলোচনার আয়োজন থাকে। একটি অভিজ্ঞতার কথা বলি, আমি কয়েক বছর আগে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগ দিই। তার আগে অন্য আর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে শিক্ষকতা করেছি। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে একুশে ফেব্রুয়ারি ভোরে শহীদ মিনারে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ারই প্রচলন ছিল না। দিনটি পুরো বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি থাকত। একুশে ফেব্রুয়ারির পরে কোনো একদিন এক আলোচনা অনুষ্ঠান করেই দায়িত্ব শেষ হতো। তাতেও যত কম টাকা ব্যয় করা যায়। অথচ অন্য কোনো বিভাগের সামান্য একটি সেমিনারেও এর চেয়ে বহুগুণ বেশি অর্থ বরাদ্দ থাকত। নতুন দায়িত্ব নিয়ে যখন অন্য আর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করি, এখানে এসে যখন জানলাম, একুশে ফেব্রুয়ারির ভোরে শহিদ মিনারে ফুলেল শ্রদ্ধা জানানো হয়, মনটা ভরে গেল। বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতি শ্রদ্ধা বেড়ে গেল। যোগদানের পরে প্রথম ফেব্রুয়ারিতে আমরা বিভাগের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের লেখা সংবলিত দেয়ালিকা প্রকাশ করলাম- শিক্ষার্থীদের কবিতা নিয়ে কবিতা সংকলন করলাম- কয়েকজন শিক্ষার্থীর কাব্যগ্রন্থ বের করার ব্যবস্থা করলাম পরিচিত বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে। পুরো বইমেলা মাসজুড়ে আমাদের ছেলেমেয়েদের আনন্দমুখর পদচারণা ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এসব তরুণ কবিদের জন্য ছোট পরিসরে অভিবাদন জানানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। তাদের ফুল দিয়ে সংবর্ধনা দিয়েছিল। এতে দারুণ অনুপ্রাণিত হলো এসব শিক্ষার্থী। আবার এই বিশ্ববিদ্যালয়ই লোকসানের কারণ দেখিয়ে কয়েকবার বাংলা বিভাগ বন্ধ করার উদ্যোগও নিয়েছে। যা হোক, একুশে ফেব্রুয়ারি সকাল সাতটায় ক্যাম্পাসের অস্থায়ী শহিদ মিনারে পুষ্প অর্পণের সিদ্ধান্ত হয়। সাড়ে ছয়টায় আমি, আমার স্ত্রী আর কন্যাকে নিয়ে যখন ক্যাম্পাসে গিয়ে উপস্থিত হই, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশদ্বারে তালা ঝুলছে। একটি মানুষও নেই। নিজের কাছে ভালো রকমের একটি ধাক্কা খাই। যে ছবিটি কল্পনা করে এসেছি, তার সঙ্গে পুরোটাই অমিল, আমরা ফুল হাতে দাঁড়িয়ে মূল ফলকে ধাক্কা দিতে থাকি। কিছুক্ষণ পরে এটা খোলা হয়।

একটু পরেই বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা আসতে শুরু করে। সাড়ে সাত-আটটার দিকে বড় বড় কর্মকর্তা এলেন- সব মিলে ১৫-২০ জন। গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ১০ হাজার বলে গর্ব করা হয়। আড়াইশ’র বেশি শিক্ষক-কর্মকর্তা। সেখানে এই হলো একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একুশের ভোরের ছবি। তবুও তো এখানে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধায় পুষ্প অর্পণ করা গেল। এক দেড়শ গজ পথ ঘুরে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গাইতে তো পারলাম। হোক ১৫-২০ জন। কিন্তু ১০৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে কয়টি বিশ্ববিদ্যালয় এতটুকুও করতে পেরেছে বা করেছে? পরবর্তীতে আমি উপাচার্য মহোদয়ের মিটিংয়ে এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে, নিয়ম করে দেয়া হয় একুশের ভোরে শহিদ মিনারে প্রত্যেক বিভাগ থেকে ন্যূনতম ৫০ জন শিক্ষার্থী এবং প্রত্যেক বিভাগের প্রধান ও ন্যূনতম দু’জন করে শিক্ষক অংশগ্রহণ করবে। উপাচার্য-উপউপাচার্য-ডিন-নিবন্ধক তো থাকবেনই। আর বাংলা বিভাগের সব শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। ভাষা আন্দোলন কি শুধু বাংলা বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য? অন্যদের কেনো নিয়মের ভেতর বেঁধে উপস্থিত করানো? অবাক করার মতো ব্যাপার পরের বারে একুশের ভোরের দৃশ্য অবশ্য গতবারের থেকে খানিকটা হলেও ভিন্ন হয়ে ওঠে। বাংলা বিভাগের সব শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অন্যদের উপস্থিতি মিলে দেড়-দু’শ হতে পেরেছিল। এ সংখ্যা ক্রমেই বেড়েছে। বাংলা বিভাগটা এ বিশ্ববিদ্যালয়ে না থাকলে, এ দৃশ্যটাও হয়তো তৈরি হতো না। অন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালগুলোর ছবি দেখে অন্তত সে ধারণাই হয়। এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিআর রিভিউ জার্নাল প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করলে, মিটিংয়ে তা উপস্থাপন করলে, ট্রাস্টি বোর্ডের একজন সদস্য তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বললেন, ‘এসব হাবিজাবি করে শুধু টাকা নষ্ট। এসব করে কি লাভ? বাংলা কি পড়ার মতো কোনো বিষয়? বাদ দেন এসব।’ উপাচার্য মহোদয়ের সহযোগিতায় একরকম প্রতিবাদ করে এর অনুমোদন নেয়া সম্ভব হলেও, প্রত্যেকটি সংখ্যা প্রকাশের আগে অনুমোদন নিতে গিয়ে নাস্তানাবুদ হতে হতো- হাজার কথা শুনতে হতো। যেন পৈতৃক সম্পত্তি রক্ষার জন্য যুদ্ধ! আসলে যুদ্ধটা যে তার চেয়েও বড়- সেই বোধ-তাড়না ও দায় নিয়ে, অবজ্ঞা-অপমানকে ভালোবেসে এসব করতে হয়েছে। অথচ অন্য বিভাগগুলো কত স্বাচ্ছন্দ্য ও কত সম্মানের সঙ্গে তাদের জার্নাল করেছে। আমি যেন এসব করে এক ‘মহাপাপ’ করেছি, ভাবখানা এমন। আর আমার মাথার উপরে যারা বিদেশের বড় বড় ডক্টরেট- তারা নিজের চেয়ার বাঁচানোর জন্য মেরুদণ্ডহীন ‘অ্যামিবা’ প্রাণী হয়ে নীরব থেকেছেন- টু-শব্দটিও করতে চান নি- যদি মালিকপক্ষ অখুশি হন- চাকরিটা যদি চলে যায়! আবার এরাই ভাষার আলোচনায় মহাবাক্য আওড়ান। অদ্ভুত সব ছবি! বিভিন্ন বিভাগের অনুষ্ঠানে বাইরে থেকে মান্যবর কোনো অতিথি আনা হলে, তাদের জন্য ভালো অঙ্কের সম্মানী-অর্থ বরাদ্দ থাকে। আপ্যায়নের উন্নত ব্যবস্থা থাকে। বাংলা বিভাগের অনুষ্ঠানের অনুমতি পেতেই ‘মলনমলা মেওয়া’ গরুর মতো ঘুরতে ঘুরতে নাভিশ্বাস উঠে যেত। অনুমতি মিললেও বরাদ্দ নেমে আসে তলানিতে, যা দিয়ে সাধাসিধে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করাই কঠিন হয়ে পড়ত। আপ্যায়নের মান কমে যেত- সম্মানীর অঙ্ক কমে যেত- কোনো কোনো সময় থাকতও না। বিশ্রিরকমের বৈষম্য। এসব নিয়ে মিটিংয়ে কথা বললে, ‘বলা হতো এসব রাজনৈতিক বক্তব্য থামাও।’ আচ্ছা, রাজনীতি ছাড়া কি কিছু হয়? ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন- এসব কি রাজনীতির বাইরের কোনো কিছু? আসলে দাসত্ব জিনিসটা এখনো মহারথিদের অনেকেরই পছন্দ। সাহিত্য পুরস্কারের আয়োজন করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি বৃদ্ধির ব্যাপারটি কর্তৃপক্ষ অনুধাবন করায় এটিকে চমৎকারভাবে করা সম্ভব হয়েছে। কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এটি একটি দারুণ ব্যাপার ছিল। দেশের দেড়-দুশ কবি-সাহিত্যিককে একসঙ্গে সমবেত করে একটি মিলনমেলায় পরিণত করতে পেরেছিলাম ঠিকই, কিন্তু সেখানেও নীরবে বৈষম্যের একটি বিশ্রি ব্যাপার ছিল। বিশেষ কিছু কবি-সাহিত্যিক- যাদের দেশজুড়ে নাম, তাদের জন্য গোপনে একরকমের বিশেষ আপ্যায়নের ব্যবস্থা, একটু কম নাম-করা কবি-সাহিত্যিকদের জন্য সাধারণমানের আপ্যায়ন- এসব বেদনাদায়ক ব্যাপারও হজম করতে হয়েছে। তবুও আশার আলো, থাকুক বৈষম্য, অন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এসব তো করেই না, এখানে তো তবু হচ্ছে। এটাই বা কম কিসের!

করোনাকালের এ সময়কালে যখন কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাভাষা ও শিল্প-সাহিত্য বিষয়ক কোনো ওয়েবিনার করেনি, তখন নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ প্রথম আন্তর্জাতিক ওয়েবিনারের আয়োজন করে। এবং এটি নিয়মিতভাবে এখনো আয়োজন করা হয়। অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড এবং ভারতের বিভিন্ন কবি-সাহিত্যিক শিক্ষাবিদ এসব ওয়েবিনারে অংশগ্রহণ করেন। নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য প্রায় প্রত্যেকটি ওয়েবিনারে যুক্ত থেকেছেন। বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, খ্যাতিমান অধ্যাপক-কবি-গবেষক এসব ওয়েবিনারে অংশগ্রহণ করেছেন। পরবর্তীতে আরও দু-একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে ওয়েবিনারের আয়োজন করেছে। প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয় যদি এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করে, বাংলা শিল্প-সাহিত্য বিকাশের ধারায় আরও বহু দূর এগিয়ে যাবে। তবে তার আগে প্রয়োজন কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতা- মাতৃভাষার প্রতি গভীর মমত্ব ও দায়বোধ, তা সম্ভব না হলে কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আনন্দের সঙ্গে শিল্প-সাহিত্য নিয়ে কাজ করা কঠিন। তিন-চারটে বিশ্ববিদ্যালয় ইউজিসি নির্ধারিত ১০০ নম্বরের বাংলা কোর্স পাঠদান করছে। কিন্তু সেখানে বাংলা বিভাগ নেই। কেনো প্রত্যেকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ নেই- এ প্রশ্নের উত্তর- পুঁজিবাদী চিন্তা- পুঁজির বিকাশ ঘটানোই মূল লক্ষ্য। মাতৃভাষার মর্যাদার জন্য যে দেশের সন্তানেরা বুকের তাজা রক্ত দিয়েছে, যে রক্তের স্রোতে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে- স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ অর্জিত হয়েছে- সেই দেশের প্রত্যেকটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাংলা বিভাগ প্রতিষ্ঠা কি অপরিহার্য নয়?

লেখক : কবি, গবেষক, চেয়ারম্যান বাংলা বিভাগ,

নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : ২২ বছরে যুগান্তর

০৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২১
০৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২১