এক জোড়া পয়মন্ত ইলিশ

  দিলারা মেসবাহ ১৫ জুন ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চশমাটা বিগড়েছে। মানে চোখ জোড়ার পাওয়ার বিগড়েছে। নাকি কোনো যমব্যাধি আসর করল। বাইফোকাল চশমার কাচ মিহি কুয়াশায় ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। ধুত্তোরি ছাই, বলে জানালার কাচ দু’হাতে ঠেলে সরাল মাহফুজা।

আষাঢ়ের মেঘ। আকাশজুড়ে মেলা বসিয়েছে। মচ্ছব আর কি। মেঘে মেঘে ঠাসবুনুনি। বিপুল সূর্য ঢেকে রইল পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘের দৌরাত্ম্যে অন্ধকার- বাপরে কী নিকষ অন্ধকার! আজও আকাশের মেজাজশরীফ সপ্তমে চড়ে থাকল? কুচকুচে পাথর আকাশ।

তিনটি সন্তান নিয়ে সংসারের হাল ধরেছিল একা মাহফুজা। একাই! তবু বিনীত সাহস আর অবুঝ স্বপ্নগুলো একেবারে বিসর্জন দিতে পারেনি। বছর পনেরো তো কেটেই গেল! আচমকা চলে গেল পরপারে তরফদার। তরফদার মানুষটা।...

ফাগুন মাসের মাঝামাঝি। পলাশ কৃষ্ণচূড়ার দিন। মাহফুজার ছোট ব্যালকনিতে ফুটেছে নয়নতারা, সন্ধ্যামণি। শুক্রবারের দুপুরবেলা। আউশের লাল চালের লাসা লাসা খিচুড়ি, ইলিশ সরষে। মোতাহের তরফদার কব্জি ডুবিয়ে খেয়েছিল। স্ত্রীর রান্নার গালভরা প্রশংসা করার অভ্যেস নেই তার। একেকজনের একেক আজব স্বভাব! তবে মাহফুজা স্বামীর গোলগাল মুখখানা দেখে বুঝে গিয়েছিল পরম তৃপ্তির সঙ্গে ভোজন করলেন তিনি। হয়তো খানিক কাছে একটা ঢেঁকুর উঠবে।...

পল্লী বিদ্যুতের মাঝারি মানের কর্মকর্তাটি ইলিশের পাঁড় ভক্ত। মওকা পেলেই কাওরানবাজার, মোহাম্মদপুর কৃষি বাজার, হাতিরপুল কাঁচাবাজার, কচুক্ষেত বাজার ইত্যাদি পরিভ্রমণ করে সুলক্ষণ, সুদর্শন রুপালি ইলিশ ক্রয় করতেন তরফদার।

জিগাতলার ছোট ফ্ল্যাট বাড়িটার রসুই ইলিশ রান্নার ঘ্রাণে মউ মউ করত। তখন তার শ্যামলা তিরতিরে শরীর ছটফটে বর্ণিল প্রজাতি। অপু, নিপু, দীপু কৈশোরের দ্বারপ্রাপ্তে...

ঘনমেঘের বালাপোষ জড়ানো কালচে আকাশটার দিকে অসহায় দু’চোখ মেলে চেয়ে থাকে মাহফুজা। বিষণ্ণ মনটা স্মৃতিময় ছাপচিত্রে ভরে ওঠে! আহা সেই দিনগুলো সোনার খাঁচা, মণিমুক্তার খাঁচা কিছুতেই বাঁধা পড়ে না। পড়ে না।

ইলশা জব্বর মাচ দুইডা! মাখখন। শনপাপড়ি। পাইচি মাহফুজা। যেমন ওজন, তেমন সুরতখান। মনপছন্দ। মাছুয়া ব্যাডা দাম হাঁকল আটশ টাকা। কুচ পরোয়া নেহি। মন চাইল- মন কান্দাইতে পারি, বল? জীবন তো একটাই। আর মনডা মহামূল্য ধন। টাক্কু মাছুয়া ব্যাডা ডালায় ইলশা সাজাইয়া রাখছে- না জানি মণিমুক্তার জড়োয়া গয়নাখান। কী দেমাগ, ত্যাড়া চোউখে কাস্টমার দেহে। কথা একখান। এক দর। নিলে লইয়া যান, বিবি খুশি হইব। না নিলে ফোটেন। মানসম্মান নিয়া টানাটানি। নিয়া নিলাম চক্ষু মুইদা। কচুশাকও নিলাম। বটল গিরিন কালার। মাথা, ল্যানজা দিয়া বনবো ভালো। আজকা করবা পাতুড়ি। লাউপাতায় জড়ায়া, সরষা, কাঁচামরিচ বাটা মাখায়া।

সদাইয়ের ঢাউস ব্যাগ ঢেলে দেয় মাহফুজা, এত্ত মুখিকচু আনছ ক্যারে?

তরফদার ধুলোময়লা মাখা বাটার স্যান্ডেল যথাস্থানে খুলে রাখতে রাখতে এগিয়ে আসে, আরে মুখিকচু দিয়া ইলশার পেটি রানবা একদিন। উমদা চিজ। মাহফুজা ততক্ষণে তৎপর ইলিশ বরণে। রূপা চকচকা ইলিশ চেয়ে আছে। কালচে পুঁতির মতো জোড়া চোখ। চারপাশে লালচে রঙের ছিটা। ওগুলো কী ওর অশ্র“জল! ইলিশের আঁশটে গন্ধের মধ্যে কেমন একরকম মাদকতা?

লতুর মা রূপবান ঠিকে কাজ করে। লতু থাকে বাঁধা। সবে ডাগর হয়ে উঠছে। ছোট মেয়ে। কাঁসার পদ্মপাতা খোদাই করা মায়ের হাতের থালা বের করে মাহফুজা। সুদর্শন মৎস্যের যথোপযুক্ত আসন। এমন রূপবান মৎস্য অসম্মান করা যায় না।

লতুর মা কাপড় ধুইয়ো খানিক বাদে। অহন ইলিশার ভাও করো। বঁটিডা পুতার লাগে ধার দিয়া লওগো। পেটি আর গাদা এক লগে ফালি করবা। ত্যাড়াবেঁকা হওন যাইব না। বহুত মজার মাচ গো।

মাহফুজা মাছ দুইডার শরীর স্পর্শ করে আনমনে ঠোঁটে ছুঁইয়ে চুমু খায়। ততক্ষণে রূপবান উপুড় হয়ে পুতার সঙ্গে বঁটি ধার দিতে শুরু করেছে। তার মনে খুশির বুড়বুড়ি। আজ লতুর পাতে, নিজের পাতে ইলশার টুকরা কচুর ঘণ্ট পড়বেই পড়বে। গরিবের রেজেকের মালিক মাবুদ আল্লাহ।

খানা টেবিলজুড়ে মেঘনার ঢেউ, ছলাৎ ছলাৎ। বাটি ভরা ইলিশের অকৃপণ ব্যঞ্জন। তরফদার আজ জমিদারের জমিদার। খানেওয়ালারা জানে জীবনের অমূল্য স্বাদ রসনার সাধনায়।

অপু, নিপু, দীপু। পিঠাপিঠি ভাইবোন। কোল মোছা সন্তান দীপু খানিক ভীতু, নরম স্বভাবের। চড়ুই পাখির মতো ইলিশের কাঁটা বাছে। খুঁটে খুঁটে লোকমা বানায়। অপু, নিপু ইলিশের কাঁটা বাছতে বেশ দক্ষ হয়ে উঠেছে।

মাহফুজার নজর দীপুর দিকে, এই যে মা হরিণের মাংস, কালা কালা মাখন। খা, আমি কাঁটা বাইছা দেই।

অপু, নিচু আড়চোখে তাকায়। দীপুর জন্য মায়ের যত দরদ। অথচ ও অঙ্কে তেত্রিশের বেশি পায় না। স্যারেরা দয়া করে দুই তিন নম্বর যোগ করে পাস করায়ে দেন। আর ওরা দু’জন প্রতিবছর লেটার মার্কস। নিপুও ঈর্ষাকাতর। মায়ের এ রকম পারসিয়ালিটি সহ্য হয় না। মুখে তুলে দিলে খেতে তো পারে ঘাউরা মাছের মতো, কৎ কৎ করে।

অপু অনাবশ্যক ঘ্যানঘ্যান করে, আমাকে হরিণের মাংস দাও মা।

ইতিমধ্যে ভোজনরসিক তরফদার তার একধাপ ওপরের কর্মকর্তা নিজামউদ্দিনের ফ্যামিলি নিমন্ত্রণ করে রেখেছে। টাটকা খাওয়াবে। রাতে আসবে ওরা। সরষে ইলিশ, কালো জিরা চাল, মুগডালে মাখামাখা খিচুড়ি। শেষ পাতে দই-মণ্ডা তো থাকবেই। আর অতিথি যদি হাতে করে মিষ্টান্ন নিয়ে আসে, তাও।

গত বছর নিজাম ভাইয়ের বাসায় দাওয়াত করেছিলেন তার গিন্নি। স্মোক্ড ইলশা, রোস্ট ইত্যাদি। কাচ্চি বিরিয়ানি অর্ডার দিয়ে আনা। চেহারা আর ঘ্রাণে তরফদার বোঝে কোনটা বাবুর্চির হাতের, আর কোনটা ঘরের রাঁধুনির ঘামের দামে সুপক্ব।

ইলিশের আইটেম খানিক পাতে নিয়েছিল তরফদার। জিবে ঠেকতেই রসভঙ্গ। ছাতানাতা কী সব রাঁধে মিশিভাবী! সংসারে আছিও, নেইও জাতের মহিলা। মাহফুজার মতো নয়। যেদিন বাড়িতে গেস্ট ডাকেন, সেদিন পয়লা পরথম পারলারে যায়, তারপর রান্না-বান্নার খবরদারি। সারাক্ষণ ব্যস্ত শাড়ির আঁচল সামলাতে, আর বয়কাট চুলগুলোকে অকারণ শাসন করতে।

ইলিশ বড় অমূল্য মৎস্য। মমতাভরা কৌশলী হাতে এই মাছ কড়াইয়ে দিতে হয়। এমনই মৎস্য অন্য মাছের মতো লবণ, লেবু কচলে ধোয়াও চলে না। খুব বেশি কারিশমাতেও ইলিশ বেজার। ড্রইংরুম বিহারিনীরা এসব কায়দা-কানুন জানেনই না। এক চামচ ভালোবাসাও ইলিশ রন্ধনে অত্যাবশ্যক।

এই তো, যেন সেদিনের কথা। কত দুপুর, রাত। ইলিশ মউ মউ সুগন্ধে ২/১ জলসিঁড়ির ফ্ল্যাট ভেসে গেছে। সুগন্ধে ছড়িয়ে পড়েছে জানালার ফোকর গলিয়ে।

তখনও পুরনো এই চারতলা ফ্ল্যাটের আশপাশে আকাশছোঁয়া এত হাইরাইজ দালান কোঠা ওঠেনি। দক্ষিণে একটা জারুলগাছ ছিল। মৌসুমে ফুলে ফুলে ছেয়ে যেত। এমনকি পুবের কোনায় একটা কদমগাছও ছিল। বর্ধিষ্ণু শহরের দূষিত বাতাসে মলিন হয়ে যেত বটে। কিন্তু বর্ষা এলে পত্র-পল্লবে, ফুলে ফুলে নবযৌবনা। কোনো রাতে ইলিশের ঘ্রাণের সঙ্গে হাস্নাহেনার চকিত সুবাস মিলেমিশে একাকার। কী দিন ছিল রে মাবুদ!... মাহফুজা এখন দু’হাতে ঠেলে দিতে চায় যাবতীয় স্মৃতি- সেই মানুষটাকে। স্মৃতিজলে আর কাঁহাতক ডুবে থাকা যায়। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম।...

চশমার কাচ আঁচল দিয়ে মুছতে মুছতে বসার ঘরে এসে বসে মাহফুজা। লতুর বিয়ে দিয়েছে। লতুর মা বুড়ি হয়ে গেছে। প্রাণশক্তি প্রায় তলানিতে। তবুও পেটের দায়ে কাজ ছাড়েনি।

দীপু আছে মায়ের সঙ্গে। জীবিকার তাড়ায় দৌড়াচ্ছে শান্ত মেয়েটা। অপু, নিপু কবেই বিদেশের মাটিতে সংসার পেতেছে। স্কাইপেতে মায়ের সঙ্গে বায়বীয় সাক্ষাৎ হয়।

বছর পনেরো কেটে গেল। অদ্ভুত, এখন স্বচ্ছ জলছবি। নুন হলুদে মরিচের গুঁড়ার রাঙানো ইলিশ ভাজা হচ্ছে। চনমনে ঘ্রাণ বাতাসে। ফ্রাইপ্যান থেকে তুলেই চালান হচ্ছে খাবার টেবিলে। চুচড়া মাছের চচ্চড়ি। কলিগ জাফর এমন মধুর আপ্যায়নে আপ্লুত।

তরফদার ভাই আপনি ইলিশ চেনেন বটে। জহুরি চোখ যাকে বলে। মিয়ানমার থেকে ইলিশের মতো দেখতে এক পদের মাছ আসে। মাছুয়ারা চিল্লায়, লইয়া যান, পদ্মার ইলশা। বরফের বাসি ইলিশেরও স্বাদ নাই। ঘাস ঘাস, স্পঞ্জের টুকরা যেন। ডিমভরা ইলিশ কিনলেও ঠকা। পোয়াতি ইলিশের স্বাদ কম। নোনা পানির মা-ইলিশ ডিম ছাড়তে আসে মিঠা পানির আঁতুড়ঘরে। যেমন নাইওরে আসে মেয়েরা বাপের বাড়ি। মা-ইলিশ ধরে বজ্জাতরা, জাইল্লা আর দাদনখোরের দল। শত পাহারা, কড়াকড়ির চোখে ধুলা দিয়ে। আফসোস।

আফসোস আমার বহুদিনের। তবে ইলিশ কিনে কখন পুলিশ হইনি। দাদার বাড়ি চাঁদপুর, মঠবাড়ি। সেই শিশুকাল থেকে বাপের কেনি আঙুল ধইরা মেঘনা ঘাটে যাইতাম। কত যে বায়াস্কোপ দেখতাম ভাই। ডালাভরা শ’য়ে শ’য়ে ইলশা। লাফান্ন্যা ইলশাও দেখছি। রোইদ পড়ইড়্যা চিক চিক করত। খুব ডেলিকেট চিজ। ডাঙ্গায় তোলার পর তিন ঝাঁপ দিয়া পরলোকগমন করে। পদ্মার ইলিশও চিনি। ওই মাচের স্বাদের তুলনা হয় না। খাটো চকচকা। গর্দান মোটা গোলগাল। নানিমা পদ্মাপাড়ের মাইয়া। ইলিশের পাঁচ ছয় কিসিমের পদ করত। কী স্বাদ রে ভাই। ইলশার তৈল হাতে জড়ায়া থাকত।

আঙুল শুঁকলে বোঝা যাইত ইলশা দিয়া ভাত খাইছে। লোনা ইলশাও খাইছি। তবে ওইডা আমার ফেভারিট না। আহারে জাটকা, মা ইলশা যদি কয়টা দিন অভয়াশ্রমে দিন কাটাইত তাইলে বাঙালির পাকঘরগুলায় উৎসব হইত, উৎসব। নাপিত জাইল্লা কামার কুমার স¹লে ইলিশা দিয়া ভাত খাইত। মাঘ, ফাল্গ–ন, বৈশাখে ইলিশের ছানাপোনারা চাঁদপুরের মোহনপুর, নীলকমল, হাজিমারায় শিুশুকাল কাটায়। এদিকে পটুয়াখালীর আন্ধারমানিক, সোনাতলি এসব জলসীমানায় কড়া পাহারা থাকে। বিশেষ সময়গুলোয় আন্ধারমানিক, লতা-চাপলি নদীর পানি আর ইলশা সমান সমান হয়্যা যায়। জালে আটকা পড়া ইলশার ওজনে জাইল্লারাও কুপোকাত। এক একখান মাচ ধরা ট্রলার দশ থেইকা পনেরো মণ ইলিশা ধরে। আহা মা, ইলশার কান্দন হেরা শোনে না। জাউল্লাগুলা বজ্জাত দাদনদারদের মদদ পাইয়া ঝাঁপাইয়া পড়ে। ধরা খাইলে জেলহাজত। তাও সই! মা-নু-ষ!

কোনো কোনোদিন মাহফুজা বিড়বিড় করে, খাইতে বইয়া লেকচার ছাড়তাছেন।

জলসিঁড়ি ফ্ল্যাটবাড়িটার ২/১ নম্বর ফ্ল্যাটটা আজকাল ইলিশ রান্নার সুঘ্রাণে চনমনে করে না। দীপু আর মাহফুজা দুটি প্রাণী। দীপু ব্যারিয়ারের পেছনে ছুটেছে। সোজা সরল মেয়েটি যেন থই পাচ্ছে না। ওর জন্য দুশ্চিন্তা মায়ের। বয়স তিরিশ ছুঁই ছুঁই।

দিনকয় আগে মাহফুজা জানল শিহবি নামের দীপুর এক কলিগ ওকে পছন্দ কর। দীপুর শ্যামলা করুণ মুখটি আজকাল প্রাণময় মনে হয়। এরই মধ্যে একদিন চায়ের নিমন্ত্রণে এসেছিল ছেলেটি। লম্বা, ছিপছিপে সারল্যমাখা মুখখানি। ওদের বাড়িও চাঁদপুর। কথায় কথায় ইলিশ প্রসঙ্গ এসেই পড়ল। শিহাবের সবচেয়ে পছন্দের মাছ ইলিশ। দীপু বেফাঁস বলে ফেলেছে তার মায়ের হাতের ইলিশ রান্না চমৎকার। বাবাও ছিলেন ইলিশপাগল।

আজ আষাঢ়ের ঘোর অন্ধকার। আজ রাতেই ওরা অর্থাৎ শিহাব, ওর বাবা-মা, বোন আসবে। আংটি পরাতে। পাকা কথা হবে।

চাপা স্বভাবের দীপু লাজুক হেসে বলেছিল, ওরাও ইলিশ ভালোবাসে। ওটা রেখ কিন্তু, মা।

ইলিশ, ইলিশ। মাথার জবুথবু মগজগুলো আর ভার নিতে পারছে না। কতদিন। ক-ত দিন এ রসুইঘরে ইলিশ নিয়ে মেতে ওঠে না মাফুজা। মাসকাবারি খরচার বহর লম্বা হচ্ছে দিনকে দিন। ওষুধ ডাক্তার, আনাজপাতি, মাছ মুরগি, যাবতীয় বিল, সার্ভিস চার্জ সামলানো দায়। তরফদারের সঞ্চয় বলতে তেমন কিছুই ছিল না। মাথার ওপর ছাদটুকু আছে এটুকুই শুকরিয়া। দীপু মাইনের মোটা অঙ্ক মাকে দেয়। মাইনেই বা মেয়েটার কত।

গতরাতে শিহাবের মা ফোনে জানালেন আজ রাতে তারা আসবেন। পাকা কথা বলতে। শুনে মাহফুজার বুক ধড়ফড় শুরু হয়েছিল। স্বামীর বন্ধু, স্বজন কেউ তো আর ধারে কাছে ভেড়ে না। মাহফুজারই কে আছে বন্ধু, স্বজন?

ইলিশ মাছ নিয়ে যত ফ্যাঁকড়া। সকাল থেকে কালো মুখ আকাশটার।

মাঠ পাড়ের মোল্লা স্টোরের মনুমিয়া বেশ মানুষ। মুদি দোকানি মনুমিয়া কত বছর ধরে নগদে, ধারে কত সদাইপাতি জোগান দিয়েছেন, জলসিঁড়িতে। শুকনা মরিচ থেকে সোডা সাবান মুড়ি, এনার্জি বিস্কুট, লতুর মা কত শত বার পা ফেলেছে মোল্লা স্টোরের রাস্তা ধরে। ঈমানদার দোকানি। মাপে পাক্কা। আজ মনুমিয়ার মোবাইলে ফোন দিল নিরুপায় মাহফুজা, মনুমিয়া আমারে এক জোড়া ভালো ইলিশ আইন্যা দিতে হইব। বুজলা মিয়া তুমিই ভরসা। সব বিষয় পরে জানাব। জরুরি।

মনুমিয়া অবাকের অবাক, কি কন খালাম্মা। কেবলই দোকানের ঝাপ খুলসি। দুইডা কাস্টমার ছাতি মুড়ি দিয়া খাড়া। এ বেলা তো বাইর হওনই যাইব না। আসমানের অবস্থাডা দেখছেন তো। রাইত নয়ডা দশডায় দোকান বন করব। খালাম্মা মনে কোনু নিয়েন না।

মাহফুজা থম মেরে যায়। মনুমিয়া আজ এমন উত্তরখান দিল। দিবই হাত্তি গত্তে পড়ছে যে। ব্যবসা ছাইড়া কাঁচাবাজারে ইলশা খুঁজবই বা কেমনে? সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে অস্থিরতা বাড়ে মাহফুজার। চশমার কাচ আবারও ঝাপসা হয়ে গেছে। শাড়ির আঁচল দিয়ে কাচ মুছতে মুছতে বসে পড়ে বিছানায়। মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল।

মোবাইলের লাল বোতামে টিপ দিয়ে মনুমিয়া হা হা করে হাসে খানিক। খালার কী হইছে। পাগলের কতাইনা কহনা। কাস্টমারকে মসুর ডাল, বনরুট দিতে দিতে স্বগতোক্তি করে মনুমিয়া।

জামালউদ্দিন গলা বাড়িয়ে বলে, ঘটনা কী মনু ভাই?

দোকানি যবনিকা টানে, আরে কিছু না। আবোল তাবোল।

আকাশের দিকে তাকাতে তাকাতে জামালউদ্দিন জলদি হাঁটা দেয়।

দীপুর বিয়ের পাকা পয়গাম নিয়ে আসছে সম্মানী পাত্রপক্ষ। রুই মাছ, গলদা চিংড়ি, চিনিগুঁড়া চাল মজুদ আছে। লতুর মাকে দিয়ে আড়াইশ গ্রাম বাঘাবাড়ির ঘি আনিয়ে নেয়া যাবে। কিন্তু ইলিশ! মেয়েটার কপালই ফাটা! মনটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। শিহাব বাবাজির পছন্দের মাছ বলে কথা। মাহফুজা জানে নাজু খালার মেয়ে নুসরাতের পানচিনিতে পায়েসে নুন দেয়া হয়েছিল বলে বিয়ে ভেঙে গিয়েছিল। খানদান মুরব্বিদের জোর আপত্তির মুখে। নুরীফুপুর বড় জামাই পোলাওয়ের ওপর বেরেস্তা বিছানো ছিল না বলে বউয়ের চৌদ্দগোষ্ঠীর ইজ্জত ধুয়ে দিয়েছিল। জামাই আদর জানে না, কালচার তো নাইই। এরপর জামাতা তিন বছর শ্বশুরবাড়িতে পদধূলি দেয় নাই।

গতকাল সারাটা দিন ছিল ধুম বৃষ্টি। আজও সকাল থেকেই আকাশের মুখ নিকষ কালো। মাহফুজার মাথাটা টন টন করছে। অস্বস্তিকর চাপা ব্যথা।

রোবটের মতো দরজা খুলে পাশের ফ্ল্যাটের পুরনো প্রতিবেশীর ফ্ল্যাটের কলিংবেলে তর্জনী ঠেকিয়ে মৃদু চাপ দিল। মাহফুজা। মাথাটা আবার ঘুরে উঠল। দেয়াল ধরে নিজেকে সামাল দিলও। দরজা-খুলল মিঠুর মা তনু ভাবী। তার চোখে মুখে তেমন ভাবান্তর নেই। নাকি তার মুখচ্ছবি এ রকম হওয়ার কথা।

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই কথা সারল মাহফুজা। মিন মিন করে বলল, ভাবী আপনার ড্রাইভার আসচে না?

মুহূর্তেই কেমন কলকলিয়ে উঠলেন, ভদ্রমহিলা, আর বলবেন না তার কানে নাকি ফোড়া উঠছে। কোঁকাচ্ছে। ছুটি দিয়ে দেব। মাহফুজা আর এক দফা বোকা বনে যায়। প্রতিবেশীর স্বভাব তার কিছুটা জানা আছে। ব্যথা আদতে তেমন তীব্র নয়, আর মিঠুর মা দুটো নাপা খাইয়ে দিনভর ডিউটিও করাতে পারবে। ভেবেছিল ড্রাইভারকে দিয়ে যদি ইলিশ আনাতে পারা যায়। সে গুড়েবালি। অথচ এদের বিপদে আপদে আনন্দে মাহফুজা শরিক হয়েছে। অপমানে মনটা একদম চুপসে যায়।

এবার দীপুর অফিসে ফোন করে মাহফুজা। দীপু ব্যস্ত গলায় বলে, হ্যাঁ মা বল।

এপার থেকে মা কোনো ভনিতা না করে বলে, না বলতেছিলাম কি ইলশার জোগাড় তো হইল না রে মা। কোনো পিয়ন টিয়ন দিয়া কি একজড়ো ইলশা-

দীপু বেশ টনটনে গলায় বলে ওঠে, আহ্ মা কিযে বলো না। এটা অফিস মা। যা ইচ্ছা তাই করা যায় না। রাখছি এখন। পরে কথা বলব।

দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে। আজ যদি সেই মানুষটা থাকত, তাইলে পদ্মা মেঘনা ছেঁচে ইলশা আনত। টাটকা জোড়ায় জোড়ায়। আদুরে কন্যার সুখের জন্য। বারবার ইলিশের শোক তাকে অস্থির করে তুলছে।... পায়েসে লবণ দেয়ার দুর্নামে নাজু খালার অমন সুন্দর লেখাপড়া জানা মেয়েটার বিয়ে ভেঙে গেছিল। শিউরে ওঠে মাহফুজা।

আচমকা লাগাতার কলিংবেল। ক্যার ক্যার ক্যার আওয়াজটা এত বিশ্রী। কানে খুব লাগে। দীপুকে কয়দিন বলেছে মাহফুজা, একটা টুং টাং আওয়াজের বেল আনিস তো মা। পুরনোটা ক্যার ক্যার করে। মেয়েটাও সময় পায় না।

মাহফুজা দরজা খোলে। বিপদের ওপর বিপদ। কসিরউদ্দিন পাটোয়ারী। আজই তার আসা লাগবে। লোকটা দূর সম্পর্কের দেওর। লোকটা বেহুদা প্যাচাল পাড়ে। কথা বলার সময় মুখ দিয়ে থুথু ছিটায়। হাঁটুর ওপর লুঙ্গি তুলে সুরুৎ সুরুৎ আওয়াজ করে চা খায়। আগে প্রায় প্রায় আসত, হাঁপানির চিকিৎসা করাতে। এই ফ্ল্যাটেই থেকে যেত হপ্তাহখানেক। তরফদারের বাল্যবন্ধুও সে। মাহফুজার অপছন্দের মানুষটা।

ভাবীসাব ভাইজানরে হপনে দেখছি। দুই রাইত। হেয় য্যান কী কইতাছে। মোনে হইল ইলশার কতা কইতাছে। ম্যাগনা গাট থেইক্যা কিন্যা লঞ্চে উঠেছি। সদরঘাট নামসি। বলতে বলতে দুটো চকচকে সুদর্শন ইলিশ তুলে ধরে। কানকো ফুটা করে সুতলিতে গাঁথা। লেজজোড়া ওসমানীয় সফেদ গোঁফের মতো জ্বলজ্বল করছে।

মাহফুজা অপলক চেয়ে থাকে।

আচমকা খানিক উবু হয়ে যায় মাহফুজা। মনে হয় কসিরউদ্দিনকে কদমবুসি করার নিয়তে উদ্যত তার দুটি শ্যামলা করুণ হাত।

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter