শেষ বিদায়ে অশ্রুসিক্ত প্রিয়জনরা

ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় নিহতদের দাফন * গ্রামের বাড়িতে লাশ পৌঁছতেই স্বজনদের কান্নার রোল * সন্তান হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন বাবা-মা

  যুগান্তর ডেস্ক ২১ মার্চ ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নেপালে বিমান দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে যাদের লাশ দেশে এসেছে মঙ্গলবার ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় তাদের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। এ সময় প্রিয়জনকে শেষবিদায় জানাতে গিয়ে অশ্র“সজল হয়ে ওঠেন নিহতের স্বজনরা। বিশেষ করে সন্তানকে হারিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন বাবা-মায়েরা। সন্তানের লাশবাহী গাড়ি গ্রামের বাড়িতে পৌঁছতেই পাগলের মতো আহাজারি করতে থাকেন তারা। অনেকে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। আত্মীয়স্বজন পাড়া-প্রতিবেশীদের চোখেও তখন কান্না নেমে আসে। এই অকাল মৃত্যু কেউ যেন মেনে নিতে পারছিলেন না।

নিহতদের মধ্যে রাজশাহীতে আক্তারা বেগম, শরীয়তপুরে সাংবাদিক ফয়সাল, গাজীপুরে ফারুক হোসেন প্রিয়ক ও তার মেয়ে তামাররা প্রিয়ম্ময়ী, মানিকগঞ্জে তাহিরা তানভীন শশী, ফেনীতে মতিউর রহমান পলাশ, নোয়াখালীতে রফিক জামান রিমু, তার স্ত্রী সানজিদা হক বিপাশা ও একমাত্র শিশুপুত্র অনিরুদ্ধ জামান, ফরিদপুরে মাহমুদুর রহমান রিমনকে দাফন করা হয়েছে। এ ছাড়া রাজশাহীর নওদাপাড়া এলাকার গোলাম কিবরিয়ার নিউইয়র্ক প্রবাসী মেয়ে বিলকিস আরা মিতু, শিরোইল এলাকার বেগম হুরুন নাহার ওরফে বিলকিস বানু, তার স্বামী হাসান ইমাম ও ইঞ্জিনিয়ার মাসুদ উদ্দিন ভূঁইয়ার স্ত্রী উম্মে সালমাকে ঢাকায় দাফন করা হয়েছে। যুগান্তর রিপোর্ট, ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

রাজশাহী ও গোমস্তাপুর (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) : নিহত আক্তারা বেগম নগরীর উপশহর এলাকার নজরুল ইসলামের স্ত্রী। দুর্ঘটনায় নজরুল ইসলামও নিহত হয়েছেন। তবে তার মরদেহ এখনও দেশে আসেনি। আক্তারা বেগমের মরদেহ ঢাকা থেকে প্রথমে চাঁপাইনবাবগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় স্বজনদের দেখানোর জন্য। এরপর মঙ্গলবার সকালে মরদেহ রাজশাহী আনা হয়। সকাল ৯টা ২০ মিনিটে তার মরদেহ উপশহর ক্রীড়া সংঘের মাঠে পৌঁছায়। সেখানে তার শেষ জানাজায় মানুষের ঢল নামে। এ সময় শোকাবহ হয়ে ওঠে এলাকার পরিবেশ। স্বজনদের মধ্যে কান্নার রোল পড়ে। সবাই কফিন ছুঁয়ে শেষবিদায় জানান তাকে।

জানাজায় রাজশাহী সিটি মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন, রাজশাহী জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী সরকার, মহানগর ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি লিয়াকত আলী লিকুসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ অংশ নেন। নেপালে বিমান দুর্ঘটনায় রাজশাহীর তিন দম্পতিসহ মোট সাতজন ছিলেন। এদের মধ্যে ছয়জনই নিহত হয়েছেন। নিহত ছয়জনের মধ্যে সোমবার পাঁচজনের মরদেহ দেশে আসে। এর মধ্যে শুধু আক্তারা বেগমের মরদেহ দাফনের জন্য রাজশাহী নিয়ে যাওয়া হয়। বাকি চারজনের মধ্যে তিনজনের মরদেহ ঢাকার শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। আর রুয়েট শিক্ষক এমরানা কবির হাসির স্বামী রকিবুল হাসানের মরদেহ দাফন করা হয়েছে তার গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার বাগুটিয়া গ্রামে। শিক্ষক হাসিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য নেপাল থেকে সিঙ্গাপুর নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

শরীয়তপুর ও ডামুড্যা : ডামুড্যা উপজেলার সিধলকুড়া গ্রামের হাজী সামসুদ্দিন সরদারের ছেলে এবং বৈশাখী টেলিভিশনের রিপোর্টার ফয়সাল আহমেদের লাশ সোমবার রাত ৩টায় তার গ্রামের বাড়ি পৌঁছে। এ সময় আত্মীয়স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীসহ শত শত লোক ফয়সালের বাড়িতে ভিড় করেন। কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা-মাসহ স্বজনরা। তার মা সামসুন্নাহার বেগম বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। বাবা সামসুদ্দিন সরদার বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। এলাকাবাসী ও নিকটাত্মীয়রা তাদের সান্ত্বনা দেন। এ সময় সবাই অশ্র“সজল হয়ে পড়েন।

মঙ্গলবার সকাল ১০টায় ডামুড্যা উপজেলা সদরে পূর্ব মাদারীপুর কলেজ মাঠে জানাজা শেষে ডামুড্যা বাজারে নিজ বাড়ি সরদার গার্ডেনে পারিবারিক কবরস্থানে ফয়সালকে দাফন করা হয়। এ সময় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি বাহাদুর বেপারি, ডামুড্যা পৌর মেয়র হুমায়ুন কবীর বাচ্চু ছৈয়াল, ডামুড্যা উপজেলা চেয়ারম্যান আলমগীর হোসেন মাঝি, ডামুড্যা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রোজী আকতার, ফয়সালের কর্মস্থলের সহকর্মীবৃন্দ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীসহ হাজার হাজার মানুষ জানাজায় অংশ নেন। এর আগে সোমবার রাতে ঢাকায় তার কর্মস্থল বৈশাখী টেলিভিশন ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আলাদা আলাদা জানাজা হয়েছে।

মানিকগঞ্জ : মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নিহত তাহিরা তানভীন শশীর মরদেহ মানিকগঞ্জ শহরের লঞ্চঘাট এলাকায় আনার পর তার বাড়িতে এক শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। স্বজনদের আহাজারিতে এলাকার বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। শত শত মানুষ শশীর বাবা-মাকে সান্ত্বনা দিতে ভিড় জমায়। তার মা কামরুন নাহার বেলী ও বাবা ডা. রেজা হাসান একমাত্র সন্তানের অকাল প্রয়াণে শোকে পাথর হয়ে পড়েন। বেলা ১টার পর শশীর মরদেহ নেয়া হয় মানিকগঞ্জ সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ মাঠে। সেখানে জানাজা শেষে স্থানীয় সেওতা কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

৭ম বিবাহবার্ষিকী পালন করতে ১২ মার্চ জীবনসঙ্গিনী ডা. রেজওয়ানুল হক শাওনকে নিয়ে নেপালে গিয়ে বিমান দুর্ঘটনায় শশী নিহত হন। আর মারাত্মক আহত হন শশীর স্বামী ডা. শাওন। তিনি বর্তমানে সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাকে স্ত্রী শশী নিহত হওয়ার খবর জানানো হয়নি। শশীর মামা আওয়ামী লীগ নেতা শহিদুল ইসলাম পুলক জানান, শশীর স্বামীর শারীরিক অবস্থা আশঙ্কামুক্ত না থাকায় ডাক্তারের পরামর্শে শশীর মৃত্যুর বিষয়টি জানানো হয়নি।

ফরিদপুর ও নগরকান্দা : নিহত এসএম মাহমুদুর রহমান রিমনের লাশবাহী গাড়িটি মঙ্গলবার সকাল ৮টায় ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামে রিমনের বাড়িতে এসে পৌঁছে। এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন তার স্বজনরা। রিমনের মা লিলি বেগম একনজর সন্তানকে দেখার জন্য ছুটে যান গাড়ির কাছে। বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন তিনি। শুধু কেঁদে কেঁদে বলছিলেন, ‘তোরে ছাড়া আমি কেমনে বাঁচবোরে বাজান। আল্লাহ আমাগো আগে কেন তোরে নিয়া গেল। কী পাপ করছিলান আমরা। তোর আগে কেন আমাগো নিয়া গেল না। তুই এইভাবে আমাগো ফেলাইয়া থুইয়া চইলা যাইস না।’ বিলাপ করছিলেন রিমনের বাবা নিরু মিয়াও। রিমনের স্ত্রী ঝর্ণা বেগম অল্প বয়সে স্বামীকে হারিয়ে শোকে পাথর হয়ে যান।

সকাল ১০টায় লস্করদিয়া স্কুল মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে তাদের পারিবারিক কবরস্থানে রিমনের লাশ দাফন করা হয়। এর আগে সকাল ৯টায় ফরিদপুর জেলা প্রশাসক বেগম উম্মে সালমা তানজিয়া, নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. বদরুদ্দোজা শুভ, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ শাহিনুজ্জামান শাহিন আসেন নিহত রিমনের বাড়িতে। রিমনের বাবা, মা, স্ত্রীকে সমবেদনা জানান। জেলা প্রশাসক আর্থিক সহায়তা হিসেবে তাদের হাতে তুলে দেন নগদ এক লাখ টাকা।

দাগনভূঞা (ফেনী) : নিহত সোনাগাজী উপজেলার বগাদানা ইউনিয়নের আউরারখিল গ্রামের মতিউর রহমান পলাশের দাফন পারিবারিক কবরস্থানে সম্পন্ন হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে উপজেলার মীরবাড়ি প্রাঙ্গণে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় উপজেলা চেয়ারম্যান জেডএম কামরুল আনাম, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান, ওসি মো. মোয়াজ্জেম হোসেন, পৌর মেয়র রফিকুল ইসলাম খোকন ও আত্মীয়স্বজনসহ বিপুলসংখ্যক মুসল্লি অংশ নেন। পলাশের মৃত্যুতে আত্মীয়স্বজনসহ এলাকাবাসীর মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

চাটখিল : নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার আমিশাপাড়া ইউনিয়নের কেশারখিল গ্রামের একই পরিবারের রফিকুজ্জামান রিমু, তার স্ত্রী সানজিদা হক বিপাশা ও একমাত্র শিশুপুত্র অনিরুদ্ধ জামানের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। মঙ্গলবার ভোরে ঢাকা থেকে মা রওশন আরা বেগম ও তার বড় দুই বোন নিহত রফিকুজ্জামান, তার স্ত্রী ও শিশুপুত্রের লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়ি সোনাইমুড়ী উপজেলার কেশারখিলের সাতানী ভূঁইয়া বাড়িতে পৌঁছেন। এ সময় নিহতদের আত্মীয়স্বজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। পরে সকাল ১০টায় কেশারখিল বালিকা উচ্চবিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়।

শ্রীপুর (গাজীপুর) : নিহত ফারুক হোসেন প্রিয়ক ও তার মেয়ে তামাররা প্রিয়ম্ময়ীকে তাদের শ্রীপুরের জৈনা বাজারের বাড়ির আঙিনায় মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে পাশাপাশি কবরে দাফন করা হয়েছে। এর আগে সকাল ৯টায় স্থানীয় আবদুল আওয়াল কলেজ মাঠে তাদের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার লোকজন অংশ নেন। পরে বেলা ১১টায় স্থানীয় মাতবর বাড়ি ঈদগাহ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর বাড়ির আঙিনায় নিহত ফারুকের নিজ হাতে লাগানো প্রিয় ফুলবাগানে মেয়েসহ তাকে দাফন করা হয়। এর আগে সোমবার রাতে তাদের লাশ বাড়িতে নিয়ে আসা হয়।

পিয়কের সবচেয়ে কাছের বন্ধু সোহানুর রহমান সোহাগ জানান, তার বন্ধুর মৃত্যুর খবর ছিল তার কাছে খুবই কষ্টের, বিমান দুর্ঘটনার সংবাদ শোনার পরই তিনি নেপাল ছুটে গেছেন তার বন্ধুর খোঁজে। লাশের সঙ্গেই বাড়ি ফিরে এসেছেন। এতদিন কফিনের পেছনে ঘুরলেও আজই বুঝতে পারছেন তিনি কী হারিয়েছেন। তিনি আরও জানান, কিশোর বয়স থেকেই প্রিয়কের সঙ্গে তার পথচলা। প্রিয়কের স্বপ্ন ছিল আন্তর্জাতিক মানের একজন ফটোগ্রাফার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। কিন্তু তা অধরাই থেকে গেল।

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter