খুনি ওমরের জবানবন্দি

কিলিং মিশনের বাজেট ছিল ৫০ হাজার টাকা

  সৈয়দ আতিক ১৮ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মামুন
ফাইল ছবি-যুগান্তর

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলা ছাত্রলীগ নেতা মামুন আল রশিদ হত্যা মামলার আসামি ওমর উদ্দিনের স্বীকারোক্তিতে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে সে খুনের আদ্যোপান্ত বর্ণনা করেছে।

জবানবন্দিতে আজিজ ও সুমন নামে আরও দু’জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। খুনের আগে মামুনের গতিবিধি ও চলাফেরাসহ সবকিছু খুনিদের জানাত মামুনের চাচাতো ভাই সুমন। সুযোগ বুঝে বাড়ির কাছে তাকে খুন করা হয়।

কর্ণফুলী উপজেলার বড় উঠান ইউনিয়নের শাহমীরপুর গ্রামের জমাদর পাড়ায় বাড়ির কাছে ২৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় মামুনকে কুপিয়ে খুন করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় মামুনের ভাই মো. ইয়াসিন বাদী হয়ে পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন।

মামলার এজাহারভুক্ত আসামিরা হল- ওমর, আলী নূর, আজম, আলী আজগর ও শাহনুর। তাদের মধ্যে ওমরকে ২ অক্টোবর কিশোরগঞ্জ এলাকা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গ্রেফতার হওয়ার পর ওমর খুনের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের তথ্য জানায়। ৩ অক্টোবর চট্টগ্রামের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে জবানবন্দি দেয় একমাত্র গ্রেফতার হওয়া আসামি ওমর।

জাবনবন্দিতে ওমর জানায়, এ বছর পশ্চিম পটিয়া এজে চৌধুরী কলেজ থেকে আমি এইচএসসি পাস করেছি। এলাকার বড় ভাই মামুন ও আজিজের (আহত) সঙ্গে আমরা এলাকায় একত্রে রাজনীতি করি। যুব উন্নয়নে কম্পিউটার শেখার জন্য ২৬ সেপ্টেম্বর বন্ধু আজগরের (আসামি) সঙ্গে চট্টগ্রাম শহরের নিউ মার্কেট এলাকায় দোস্ত বিল্ডিংয়ে যাই।

ওই দিন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে এলাকার বন্ধু আজম তাকে ফোন করে জানায়, আশিক ও শাহেনুরকে মারধর করেছে মামুন (নিহত)। ‘মার খাওয়া’ বন্ধুরা মোবাইল ফোনে তাকে ও তার বন্ধুদের শাহমীরপুরে যাওয়ার জন্য বলে।

এর কিছুক্ষণ পর সুমন তাকে ফোন করে। শাহনুরের চাচাতো ভাই পারভেজের বন্ধু সুমন। তার বাড়িও একই এলাকায়। সুমন তাকে চকবাজারে আসার জন্য বলে। সুমন জানায়, শাহেনুর তাকে ওর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছে। ফোন পাওয়ার পর দুপুর দেড়টার দিকে তারা শহরের চকবাজার গুলজার টাওয়ার মোড়ে যায়।

সেখানে সে, সুমন ও আজগর চায়ের দোকানে বসে আলোচনা করে। একপর্যায়ে সুমন বলে, পারভেজ তাকে বলেছে মামুন যেহেতু শাহেনুর ও আশিককে মেরেছে তাই মামুনকে মারতে হবে।

এ বিষয়ে সেখানে প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে তাদের মধ্যে কথা হয়। জবানবন্দিতে ওমর জানায়, তারা কর্ণফুলী উপজেলার শাহমীরপুর তালতলায় অবস্থান নেয়। এরপর তাদের সঙ্গে আশিক, আজম ও শাহনুর যোগ দেয়। সুমন আলাদাভাবে বাদামতলায় যায়। সুমনের ফোন পেয়ে সে, শাহেনুর, আশিক, আজগর ও আজম পরিকল্পনা করে মামুনকে মারার।

আজম একটি রাম দা, শাহেনুর তার মামার বাড়ি থেকে দুটি কিরিচ ও আজগর তার বাসা থেকে একটি চাইনিজ কুড়াল আনে। ঘটনার দিন আসরের আজানের সময় সুমন তাকে ফোন দেয়।

শাহেনুরের মোবাইল ফোনে কল দিয়ে সুমন জানায়, মামুন তার ঘরের সামনে গরুর খড় শুকানোর কাজ করছে। সেখানে তাড়াতাড়ি যাওয়ার জন্য তাকে বলে।

ওমর জানায়, এর মধ্যে সে আবার জানতে পারে মামুনকে মারার জন্য আজগরকে সুমন ৫০ হাজার টাকা দেবে। মাগরিবের সময় ওমর, আশিক, শাহেনুর, আজগর, আজম ঘটনাস্থলে যায়।

ওমর জানায়, ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর তারা দেখে মামুন ও আজিজ রাস্তার মোড়ে বসে গল্প করছে। এ সময় তারা রামদা, কিরিচ ও চাইনিজ কুড়াল নিয়ে অতর্কিত হামলা চালায়। কিরিচ দিয়ে সে ও আজগর চাইনিজ কুড়াল দিয়ে প্রথমে মামুনকে কোপ মারে।

এরপর আজিজের ডান পায়ে সে কোপ মারে। শাহেনুর মামুনকে এলোপাতাড়ি কোপ মারে। আশিকও মামুনকে কোপ মারে। মামুন ও আজিজকে মারার পর তারা সেখান থেকে পালিয়ে যায়। যাওয়ার সময় নালার মধ্যে তাদের কিরিচ, চাইনিজ কুড়াল ফেলে দেয়।

স্বীকারোক্তিতে ওমর জানায়, হামলা করার পর তারা প্রথমে শিকলবাহা ক্রসিংয়ে আসে। পরে হেঁটে কালারপুল পৌঁছে। এর মধ্যে মোবাইল ফোনে খবর পায় মামুন মারা গেছে।

এরপর শহরে মোবাইল ফোন বিক্রি করে তারা অলংকার মোড়ে যায়। সেখান থেকে তারা ঢাকায় চলে যায়। ঢাকায় এক দিন থাকার পর সে কিশোরগঞ্জে আত্মীয়ের বাড়িতে চলে যায়। সেখান থেকে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও আহত আজিজ জানান, ঘটনার দিন দুপুরে ডাঙ্গামার্কেট বাজারে সেলুনে বসা আশিককে একটা থাপ্পড় মেরেছিল মামুন। এ বিষয়ে তাদের মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়। বিষয়টি মামুন সেদিন তাকে জানায়।

মামলার বাদী মো. ইয়াছিন আলী যুগান্তরকে বলেন, খুনিদের গ্রেফতার করা হবে বলে পুলিশ তাদের আশ্বস্ত করলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখছি না। অবিলম্বে সব আসামিকে গ্রেফতারের দাবি জানান তিনি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন (সিএমপি) পুলিশ কমিশনার মো. মাহাবুবর রহমান যুগান্তরকে বলেন, এজাহারের বাইরে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ ও স্বীকারোক্তিতে পারভেজ ও সুমন নামে আরও দু’জনের নাম আসে। আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশের টিম কাজ করছে। আশা করা যাচ্ছে খুনিদের গ্রেফতার করা সম্ভব হবে। তবে তারা ঘনঘন স্থান বদল করছে। হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কোনো বড় ভাই জড়িত আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এমন তথ্য শোনা যাচ্ছে। তবে তদন্ত না করে এ ব্যাপারে এখনই কিছু বলা যাবে না।

স্থানীয় সূত্র জানায়, মামুন খুনের কিছুদিন আগে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারা চট্টগ্রাম এলাকায় যান। ওই সময় কর্ণফুলী উপজেলা ছাত্রলীগের কমিটি করার বিষয়েও আলোচনা হয়। তখন থেকেই পদ পেতে সরব হয়ে উঠে স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতারা।

ছাত্র রাজনীতির দলাদলি, আধিপত্য বিস্তার, মাদকবিরোধী কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকার কারণে ঘাতকরা মামুনকে খুন করতে পারে। বিষয়টিকে পুলিশ তদন্তে গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে অন্য আসামি গ্রেফতার হলে ঘটনা সম্পর্কে আরও তথ্য জানা যাবে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×