বড় দু’দলেই প্রার্থীর ছড়াছড়ি

আবারও ১৪ দলের মনোনয়ন চান নজিবুল বশর

  মজুমদার নাজিম উদ্দিন, চট্টগ্রাম ব্যুরো ২১ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বড় দু’দলেই প্রার্থীর ছড়াছড়ি
ফাইল ছবি

দুটি থানা, দুটি পৌরসভা ও ১৭টি ইউনিয়ন নিয়ে চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসন। ৭৭৩.৫৫ বর্গ কিলোমিটারের এ উপজেলায় প্রায় ৭ লাখ মানুষের বসবাস। আয়তনে এটি ফেনী জেলার চেয়েও বড়। আর চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় উপজেলা ফটিকছড়ি। একাদশ জাতীয় নির্বাচন ঘিরে সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়ছে নির্বাচনী উত্তাপ।

এ আসনে মনোনয়ন পেতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির একাধিক প্রার্থী সক্রিয়। বড় এ দু’দলের পাশাপাশি এখানে আলোচনায় আছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক দল- বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনও। এছাড়া জাতীয় পার্টিরও শক্ত অবস্থান রয়েছে এ আসনে।

গত নির্বাচনে ১৪ দলীয় জোট প্রার্থী হিসেবে তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী নৌকা প্রতীক নিয়ে ফটিকছড়ি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তখন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা তার পক্ষে কাজ করেছিলেন। তবে এখন আর তার ওপর সন্তুষ্ট নন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। আগামী নির্বাচনে তার পরিবর্তে দলের ত্যাগী, সৎ ও যোগ্য কোনো নেতাকে প্রার্থী হিসেবে দেখতে চান তারা।

অপরদিকে নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী এবারও জোটের প্রার্থী হিসেবে আসনটি থেকে নির্বাচন করতে আগ্রহী। তার প্রার্থিতা নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিরোধিতা থাকলেও তরিকত ফেডারেশন ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক দল হওয়ায় এখান থেকে দলটির চেয়ারম্যান হিসেবে নজিবুল বশরের মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনাই উজ্জ্বল। তবে স্থানীয় আওয়ামী লীগ পক্ষে না থাকায় তার মনোনয়ন এখন চ্যালেঞ্জের মুখে।

ফটিকছড়ি আসনে ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগ প্রার্থী নুরুল আলম চৌধুরী, ১৯৭৯ সালে বিএনপি প্রার্থী জামাল উদ্দীন আহমদ, ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগ প্রার্থী নুরুল আলম চৌধুরী, ১৯৮৮ সালে জাসদ (রব) মাজহারুল হক শাহ চৌধুরী, ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগ প্রার্থী সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী, ১৯৯৬ সালে (১৫ ফেব্র“য়ারি) বিএনপি প্রার্থী সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী, ১৯৯৬ সালে (৬ জুন) আওয়ামী লীগ প্রার্থী রফিকুল আনোয়ার, ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ প্রার্থী রফিকুল আনোয়ার, ২০০৮ সালে বিএনপি প্রার্থী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, ২০১৪ সালে তরিকত ফেডারেশন প্রার্থী (আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট) সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী নির্বাচিত হন।

আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা হলেন- উত্তর জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য নুরুল আলম চৌধুরী, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান এটিএম পেয়ারুল ইসলাম, সাবেক সংসদ সদস্য রফিকুল আনোয়ারের কন্যা খাদিজাতুল আনোয়ার সনি, রফিকুল আনোয়ারের ছোট ভাই উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য সম্পাদক ফখরুল আনোয়ার, উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান এম তৌহিদুল আলম বাবু, উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মুজিবুল হক, তরুণ আওয়ামী লীগ নেতা শিল্পপতি সাদাত আনোয়ার সাদী, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আমেরিকা প্রবাসী মোহাম্মদ শাহাজাহান।

এছাড়া মনোনয়ন চান বর্তমান সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী, জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা, সাবেক সংসদ সদস্য ও চাকসুর সাবেক ভিপি মাজহারুল হক শাহ চৌধুরী, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের চেয়ারম্যান এমএ মান্নান। এদের মধ্যে শেষের তিনজন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট গঠিত হলে জোটের মনোনয়ন পেতে আগ্রহী। আর আলাদাভাবে দল নির্বাচনে গেলে তারা নিজ নিজ দল থেকে প্রার্থী হতে পারেন।

২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী এটিএম পেয়ারুল ইসলাম বিএনপি প্রার্থী সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর কাছে পরাজিত হন। এবারও পেয়ারুল দলীয় মনোনয়ন পেতে আগ্রহী। এ প্রসঙ্গে তিনি যুগান্তরকে বলেন, নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী নির্বাচিত হয়ে এলাকায় খুব বেশি উন্নয়ন করতে পারেননি। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও ফটিকছড়ির সাধারণ মানুষ তার কাছ থেকে কোনো উপকার পাননি। তিনি এর আগে আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপিতে যোগ দিয়ে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন।

ওই সময় অনেক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী হত্যা-নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। এসব কারণে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা তাকে জোটের প্রার্থী হিসেবে দেখতে চান না। তারা চান দলীয় প্রার্থী। ফটিকছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগ এরই মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, নজিবুল বশরকে জোটের প্রার্থী দেয়া হলে তার পক্ষে তারা তাজ করবে না।

তবে সংসদ সদস্য নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারীর দাবি, নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত দেড় হাজার কোটি টাকার উন্নয়নকাজ করেছেন তিনি নিজের সংসদীয় আসনে। অনেক বড় বড় প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে।

তিনি যুগান্তরকে বলেন, জোটের শরিক দলের বর্তমান এমপিদের নিজ নিজ আসনে এবারও মনোনয়ন দেয়া হবে- এমন সিদ্ধান্ত রয়েছে। এ হিসেবে আমি ফটিকছড়ি থেকে এবারও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের মনোনয়ন পাব ।

তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের অনেক নেতা এ আসন থেকে মনোনয়ন চান। তাদের মনোনয়ন চাওয়ার অধিকার রয়েছে। এটাকে আমি সম্মান করি। তবে আমাদের ক্ষুদ্র স্বার্থ পরিহার করে এখন বৃহত্তর স্বার্থের কথা চিন্তা করতে হবে। কে এমপি-মন্ত্রী হলাম বা হলাম না সেটা বড় কথা নয়। দেশের কথা, দলের কথা ভাবতে হবে। আগামী নির্বাচনে যদি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করতে না পারে তাহলে জোটের সবারই বিপদের আশঙ্কা রয়েছে। আমার সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের কোনো দূরত্ব নেই। তাদের সঙ্গে আমার নিয়মিত কথা হয়, যোগাযোগ হয়। তারা আমার বিরোধিতা করতেই পারেন। কারণ আমার বিরোধিতা না করলে তারা মনোনয়ন পাবেন কিভাবে। আমি মনে করি, নৌকা প্রতীক যাকেই দেয়া হোক, এ প্রতীকের দিকে তাকিয়ে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবেন।’

ফটিকছড়িতে একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী থাকায় শেষ পর্যন্ত কাকে মনোনয়ন দেয়া হবে এ নিয়ে বিপাকে পড়তে হতে পারে দলীয় হাইকমান্ডকে। এখন পর্যন্ত বিএনপির তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সহ-সম্পাদক কাদের গণি চৌধুরী, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) চট্টগ্রাম শাখার চারবারের সাধারণ সম্পাদক ও উত্তর জেলা বিএনপি নেতা ডা. খুরশিদ জামিল চৌধুরী, সাবেক বিচারপতি ও বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ফয়সাল মাহমুদ ফয়েজির নাম আলোচনায় রয়েছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে এখান থেকে নির্বাচিত হন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী। পরে যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসি হয় তার। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পরিবার থেকে তার স্ত্রী ফরহাত কাদের চৌধুরী অথবা ভাই বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী অথবা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী মনোনয়ন চাইতে পারেন বলেও গুঞ্জন রয়েছে।

তবে স্থানীয় বিএনপি নেতারা জানান, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পরিবার রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া আসন থেকে নির্বাচন করে আসছেন। বিএনপির যোগ্য প্রার্থী না থাকায় ২০০৮ সালে ফটিকছড়ি থেকে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে মনোনয়ন দেয়া হয়। এবার বাইরের প্রার্থীর পরিবর্তে ফটিকছড়ি এলাকার কাউকে মনোনয়ন দেয়া হোক এমন দাবি রয়েছে। ফটিকছড়ি উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক সালাহউদ্দিন এবং উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য মীর্জা আকবরও মনোনয়ন পেতে আগ্রহী বলে জানা গেছে।

এ আসন থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী বিএনপি নেতা কাদের গণি চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, ‘কোনো নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনে আমি বা আমার দল অংশ নেবে না। নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে আমরা নির্বাচনে যেতে চাই। দলের গবেষণা বিষয়ক সহ-সম্পাদকের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে আমি কেন্দ্রে ও নির্বাচনী এলাকা ফটিকছড়িতে কাজ করছি। দল মনোনয়ন দিলে নির্বাচন করব। তবে অন্য কাউকে মনোনয়ন দেয়া হলেও আমি দলের প্রার্থীর পক্ষে সর্বতোভাবে কাজ করে যাবে। সন্ত্রাসের জনপদ ফটিকছড়িতে শান্তি ফিরে আসুক এমনটাই চান এখানকার বাসিন্দারা। ধানের শীষের প্রার্থীর বিজয়ের মধ্য দিয়ে শান্তি ফিরে আসতে পারে।’

ডা. খুরশিদ জামিল চৌধুরী বলেন, ‘মামলা-হামলার কারণে ফটিকছড়িতে বিএনপির নির্বাচনী প্রচার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচার চালিয়ে যাচ্ছি। দল যদি মনোনয়ন দেয় আমি প্রার্থী হব, আর যদি অন্য কাউকে মনোনয়ন দেয়া হয় সে ক্ষেত্রে তার পক্ষে কাজ করব। তবে বহিরাগত কাউকে দেয়া হলে তাতে ভোটে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’

ঘটনাপ্রবাহ : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×