ভোটের আগে একের পর এক জনতুষ্টির প্রকল্প

রেকর্ড ২১ উন্নয়ন প্রকল্প একনেকে উঠছে আজ * বাস্তবায়নে ব্যয় হবে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা * দুই মাস একনেক সভা হবে না ভেবে অনেকেই তাড়াহুড়া করছেন - পরিকল্পনা সচিব

  হামিদ-উজ-জামান ২৩ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একনেকের বৈঠক
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠক। ফাইল ছবি

জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জনতুষ্টির আরও একটি প্রকল্প উঠছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে। ‘দ্বিতীয় নগর অঞ্চল উন্নয়ন’ নামের এ প্রকল্পের মাধ্যমে ঢাকা এবং খুলনা বিভাগের বিভিন্ন পৌরসভার অবকাঠামো উন্নয়ন করা হবে।

প্রকল্পটি চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) অন্তর্ভুন্ত না থাকলেও দ্রুত সময়ের মধ্যে এর প্রক্রিয়াকরণ হচ্ছে। এটি বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ১ হাজার ৮৬৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ৬১০ কোটি ৭৫ লাখ এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণ থেকে ১ হাজার ২৫৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে। এছাড়া আজ একনেকে উঠছে রেকর্ডসংখ্যক আরও ২০টি উন্নয়ন প্রকল্প। এই ২১টি প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হবে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে এ পর্যন্ত ১০টি একনেক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এসব বৈঠকে অনুমোদন পেয়েছে মোট ১২৭টি উন্নয়ন প্রকল্প। এসব বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ২১২ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের এডিপির ৬২ দশমিক ৫৯ শতাংশ।

পরিকল্পনা বিভাগের সচিব মো. জিয়াউল ইসলাম সোমবার যুগান্তরকে বলেন, এডিপিতে না থাকলেও বিধিবিধানের মধ্য থেকে পরিকল্পনামন্ত্রীর অনুমোদন নিয়ে প্রকল্প প্রক্রিয়াকরণ করা যায়। তবে তাড়াহুড়া একটু আছে। কেননা সবাই ভাবছেন দুই মাস হয়তো একনেক হবে না। তাই আগেভাগেই প্রকল্প পাস করাতে চাচ্ছেন। কিন্তু আমরা মনে করি, একনেক বন্ধ হবে না। এটি রুটিন কাজ হিসেবে চলবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ২১টি প্রকল্প একনেক উপস্থাপনের জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। টেবিলে আর আলাদা করে প্রকল্প উপস্থাপন হবে না।

সূত্র জানায়, দ্বিতীয় নগর অঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পেলে ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে ২০২৪ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়ন হবে। প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর। এডিপির অন্তর্ভুক্ত না হলেও এটি অনুমোদন প্রক্রিয়াকরণ সম্পর্কে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি প্রক্রিয়করণের জন্য পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সম্মতি প্রদান করেছেন।

প্রকল্পের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, কয়েক বছর ধরে দেশে দ্রুত নগরায়ণ বৃদ্ধি পেলেও এর সঙ্গে প্রয়োজনীয় নগর অবকাঠামো উন্নয়ন করা সম্ভব হয়নি। সে পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বিকাশ, পরিবেশগত উন্নয়ন সাধন ও শহর অঞ্চলের অপরিকল্পিত বিস্তার রোধে এডিবির আর্থিক সহায়তায় ‘নগর অঞ্চল উন্নয়ন (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্পটি ২০১১ সালের জুলাই থেকে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এটি চলবে ডিসেম্বর পর্যন্ত।

এই পর্যায়ে ঢাকা ও খুলনা বিভাগের নগর ও নগর সন্নিহিত এলাকার অবকাঠামো উন্নয়ন করা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় এডিবির সহায়তায় দ্বিতীয় নগর উন্নয়ন প্রকল্পটি প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে প্রকল্প এলাকার ড্রেনেজ ও রাস্তা নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত সেবা ও সুবিধা বৃদ্ধি পাবে। সেই সঙ্গে উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। এছাড়া প্রকল্পটি জলাবদ্ধতা নিরসন, জনস্বাস্থ্যের উন্নতি সাধনে অবদান রাখবে।

প্রকল্পের আওতায় প্রধান কার্যক্রম হচ্ছে- ২৫৭ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন, ১৫৩ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণ, ১ হাজার ৭২২ মিটার ব্রিজ বা কালভার্ট নির্মাণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ আনুষঙ্গিক কার্যক্রম বাস্তবায়ন।

যেসব এলাকায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে সেগুলো হচ্ছে- ঢাকা বিভাগের সাভার এবং সাভার পৌরসভা, ধামরাই পৌরসভা, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন, কালিয়াকৈর পৌরসভা, নারায়ণগঞ্জ জেলার কাঞ্চন, তারাব, সোনারগাঁ পৌরসভা এবং রূপগঞ্জ ও আড়াইহাজার উপজেলা; মানিকগঞ্জের মানিকগঞ্জ ও সিংগাইর পৌরসভা এবং নরসিংদী পৌরসভা। এছাড়া খুলনা বিভাগের খুলনা সিটি কর্পোরেশন, চালনা পৌরসভা, যশোর জেলার যশোর, নওয়াপাড়া ও ঝিকরগাছা পৌরসভা এবং বাগেরহাট জেলার মোংলা পৌরসভা। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক মোস্তফা কে মুজেরি এর আগে যুগান্তরকে বলেছিলেন, ভৌত অবকাঠামো এবং কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের প্রকল্পগুলোয় রাজনীতি সংশ্লিষ্টদের আগ্রহ বেশি।

এক্ষেত্রে যারা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, তারা জনগণের কাছে প্রকল্প অনুমোদনের কথা বলে তাদের মনোযোগ আকৃষ্ট করতে পারেন। তাই এ দুই বিভাগেই চাপ বেশি। এক্ষেত্রে সঠিকভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করা না হলে সঠিক মান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার না হয়ে বরং অপচয় হতে পারে।

এছাড়া আজ একনেক উঠতে যাওয়া অন্য প্রকল্পগুলো হচ্ছে- কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার পুনর্নির্মাণ, এটি বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ৬২৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। ৩৫টি ড্রেজার ও সহায়ক জলযান সংগ্রহসহ আনুষঙ্গিক সরঞ্জামাদি সংগ্রহ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ, এতে ব্যয় হবে ৪ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক পুনর্বাসনসহ নর্দমা ও ফুটপাত উন্নয়ন, এতে ব্যয় হবে ৭৭৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। বরিশাল শহরের জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজিত নগর উন্নয়ন প্রোগ্রাম, এতে ব্যয় হবে ১৩০ কোটি টাকা। সৌর বেস স্টেশন স্থাপনের মাধ্যমে দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে টেলিটক নেটওয়ার্ক কভারেজ শক্তিশালীকরণ, এতে ব্যয় হবে ৪০৬ কোটি টাকা। ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তর প্রকল্প: সাপোর্ট টু ঢাকা (কাঁচপুর)-সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ এবং উভয় পাশে সার্ভিস লেন নির্মাণ, এতে ব্যয় হবে ৩ হাজার ৮৮৫ কোটি ৭২ লাখ টাকা। কেরানীহাট-বান্দরবান জাতীয় মহাসড়ক যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ, এতে ব্যয় হবে ২৩৫ কোটি টাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন, এতে ব্যয় হবে ১ হাজার ৪৪৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।

বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন সচিবালয়ের ৭টি আঞ্চলিক কার্যালয় প্রতিষ্ঠাসহ সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ, এতে ব্যয় হবে ১২৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা। সিপিজিসিবিএল-সুমিতোমো ১২০০ মেগাওয়াট আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের লক্ষ্যে ভূমি অধিগ্রহণ ও আনুষঙ্গিক কার্যক্রম, এতে ব্যয় হবে ১ হাজার ২৭০ কোটি টাকা। পায়রা ১৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র সংযোগ সড়ক ও আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণ, এতে ব্যয় হবে ২৫০ কোটি ৬২ লাখ টাকা। এস্টাবলিস্টমেন্ট অব থ্রি হ্যান্ডলুম সার্ভিস সেন্টারস ইন ডিফারেন্ট লুম ইনটেনসিভ এরিয়া প্রকল্প, এতে ব্যয় ৮৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

বাংলাদেশ তাঁত শিক্ষা প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট নরসিংদীর আধুনিকায়ন ও অবকাঠামোগত সম্প্রসারণ, এতে ব্যয় হবে ৬০ কোটি ১৫ লাখ টাকা। বৃহত্তর ময়মনসিংহ অবকাঠামো উন্নয়ন, এতে ব্যয় হবে ৬৯০ কোটি টাকা। গড়াই নদী ড্রেজিং ও তীর সংরক্ষণ, এতে ব্যয় হবে ৫৯১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। চাঁদপুর সেচ প্রকল্পের চর-বাগাদী পাম্প হাউস ও হাজিমারা রেগুলেটর পুনর্বাসন, এতে ব্যয় হবে ১১৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।

রংপুর বিভাগ কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন, এতে ব্যয় হবে ৩২১ কোটি ২২ লাখ টাকা। মহিষ উন্নয়ন (দ্বিতীয় পর্যায়), এতে ব্যয় হবে ১৬২ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। কক্সবাজার জেলার উখিয়া ও টেকনাফে পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন কার্যক্রম জরুরি সহায়তা, এতে ব্যয় হবে ৫৫৮ কোটি ৩৩ লাখ টাকা।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প, এটি বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ১ হাজার ৬৫৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এর আগে উপজেলা পর্যায়ে মডেল মসজিদ স্থাপন, মাদ্রাসা উন্নয়ন, সারা দেশে (রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ব্যতীত) বাস্তবায়নের জন্য ‘প্রোগ্রাম ফর সাপোর্টিং রুরাল ব্রিজেস’ প্রকল্পসহ বেশকিছু সড়ক-মহাসড়ক উন্নয়ন, প্রশস্তকরণ ও নির্মাণ সংক্রান্ত প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter