খালেদা জিয়ার জামিনে নমনীয় থাকবে সরকার

  রেজাউল করিম প্লাবন ০৯ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

খালেদা জিয়ার জামিনে নমনীয় থাকবে সরকার

সর্বোচ্চ ছাড় দিয়ে হলেও বিএনপিকে নির্বাচনে চায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলটিকে ভোটের মাঠে পেতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিনে সরকারের পক্ষ থেকে কৌশলে বিরোধিতা না করা এবং বিভিন্ন ‘রাজনৈতিক ও গায়েবি মামলা’র কার্যক্রম ‘ধীরে চল নীতি’ অনুসরণ করবে দলটি।

এছাড়া জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কর্মসূচি নির্বিঘ্ন করা এবং ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড (সবার জন্য সমান সুযোগ)’ নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে সবকিছুই নির্ভর করছে একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি তথা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অংশগ্রহণের ওপর। এর নিশ্চয়তা পেলেই সমঝোতার বিষয়গুলো দৃশ্যমান হবে। আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারণী সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক শ ম রেজাউল করিম বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, বিএনপিকে নির্বাচনমুখী করতে প্রধানমন্ত্রী তাদের অনেক দাবিই মেনে নিয়েছেন। রাজনীতিকভাবে আরও কোনো দাবি থাকলে তা আলোচনা হতে পারে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে দলটি বেশি জোর দিচ্ছে। আমাদের মধ্যেও আলোচনা হচ্ছে। বিএনপির নির্বাচনে আসার নিশ্চয়তার ওপর অনেক কিছুই নির্ভর করছে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ৭ দফার মধ্যে অন্যতম ছিল বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি। বুধবার দ্বিতীয় দফা সংলাপে জামিনের কথা জোরালোভাবে প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছেন নয়া এই জোটের শীর্ষ নেতারা। সেখানে নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ সৃষ্টির লক্ষ্যে খালেদা জিয়ার মুক্তির প্রসঙ্গটি লিখিত বক্তব্যে তুলে ধরেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতা ড. কামাল হোসেন।

এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘সংবিধানের কোথায় আছে যে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে নির্বাহী বিভাগ খালাস দিতে পারে? আদালত নিজস্ব গতিতে চলবে। আর সরকার তো এখানে কেউ না। দুর্নীতি দমন কমিশনের বিষয়। যদি তারা বাধা দেয় তাহলে এক ব্যাপার। আর বাধা না দিলে আরেক ব্যাপার।

তবে যদি আমাদের কিছু করণীয় থাকে, আমরা দেখব।’ জবাবে আইনি ব্যাখ্যা তুলে ধরে মওদুদ আহমদ বলেন, খালেদা জিয়ার জামিন হয়েছিল। কিন্তু দেড় মাস ধরে নানা আইনি জটিলতা তৈরি করে তার জামিন বাতিল করা হয়েছে। পরে তার সাজার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়ায় জামিনের সুযোগ ছিল। রাজনৈতিকভাবেই তাকে আটকে রাখা হয়েছে, এখনও এটাকে রাজনৈতিকভাবে বিবেচনা করে তার জামিনের ব্যবস্থা করা যায়।

ওই সংলাপে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ১ সেপ্টেম্বরের পর কোনো সংঘাত-সহিংসতা হয়নি। এরপর যেসব মামলা হয়েছে, সেগুলো একেবারে অসত্য, গায়েবি ও ভুয়া মামলা। তখন প্রধানমন্ত্রী তালিকা চাইলে তা দেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী তালিকাটি আইনমন্ত্রীকে দিয়ে ব্যবস্থা নিতে বলেন। রাজনৈতিক কারণে গ্রেফতার-হয়রানি হবে না বলেও আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী। তবে ব্যক্তিগত অপরাধের মামলা বিবেচনা করা হবে না বলে জানান তিনি।

প্রসঙ্গত, গত রোববার প্রথম দিনের সংলাপে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা ড. কামাল হোসেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে ৭ দফা দাবি পেশ করেছিলেন। সংবিধান পরিপন্থী দাবিগুলো ছাড়া বাকিগুলো মেনে নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া বুধবারের সংলাপে ৪টি দাবি প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করেন ড. কামাল হোসেন। এগুলো হল- সংসদ ভেঙে দিয়ে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন; ১১ সদস্যের নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকার গঠন, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন এবং কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি। সাংবিধানিক ও আইনি যুক্তি দেখিয়ে বুধবারই এসব প্রস্তাব নাকচ করে দেয় আওয়ামী লীগ। তবে রাজনৈতিক সমঝোতায় বেশ কয়েকটি বিষয়ে একমত হতে আপত্তি করছে না আওয়ামী লীগ। এর মধ্যে খালেদা জিয়ার জামিন অন্যতম।

জানা যায়, বিএনপিও চায় সরকারকে যতটা চাপে রেখে তাদের দাবি-দাওয়া আদায় করে নির্বাচনে। এজন্য সমাপনী সংলাপে তারা এ বিষয়ে অনেকটা আপসের কথাই বলেছেন। এদিকে ক্ষমতাসীন দল সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনকালীন সময়ে গ্রেফতার অনেক কমে আসবে। পূর্বের জ্বালাও-পোড়াও, হামলা-মামলার গতি অনেকটাই ধীরে চলবে। বিএনপি নেতাদের অনেকেই এসব মামলার আসামি। নির্বাচনী সমঝোতায় যাতে প্রত্যেকে প্রচার-প্রচারণা চালাতে পারে সেইজন্য ‘কচ্ছপ গতিতে’ মামলার কার্যক্রম পরিচালনা এবং রাজনৈতিক নেতাদের জামিনে নমনীয় থাকবে ক্ষমতাসীনরা।

আওয়ামী লীগের একজন শীর্ষ নীতিনির্ধারক যুগান্তরকে বলেন, সরকার চাইলে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের এসব মামলায় কঠিন বিপদে ফেলতে পারে। কিন্তু নির্বাচনে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতেই বিশেষ ছাড় দেয়ার পক্ষে সরকারি দল। বিএনপি নেতাদের অনেকেই এই নিশ্চয়তার কথাই প্রধানমন্ত্রীর কাছে উল্লেখ করেছেন।

বুধবারের সংলাপে বিএনপির একাধিক সিনিয়র নেতা নির্বাচনে আশার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বলে ক্ষমতাসীন পার্টির একাধিক নেতা নিশ্চিত করেছেন। তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যেতে আগ্রহী। এজন্য দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিনের বিষয়ে আশ্বস্ত হতে চান।

আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা যায়, নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়ার জামিন বিষয়ে নানা হিসাব-নিকাশ আছে। জামিনে বেরিয়ে নির্বাচনী মাঠে বেগম জিয়ার উপস্থিতি ভোটারদের মধ্যে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে সেটি নিয়েও দলীয় ফোরামে আলোচনা হচ্ছে। যদি খালেদা জিয়া জামিন পান, সেক্ষেত্রে তার নির্বাচনী সভা-সমাবেশ ‘সুপার ফ্লপ’ করতে দুর্নীতির নানা তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরে মাঠে-ঘাটে প্রচারণায় সরব থাকতে চায় ক্ষমতাসীনরা।

আওয়ামী লীগের সূত্রটি বলছে- সংলাপে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও নির্বাচনে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রীকে বলেছেন, নেত্রী আমিও নির্বাচনে আসতে চাই। কিন্তু তার আগে ম্যাডামের (খালেদা জিয়া) সঙ্গে কথা বলতে হবে।

জানা যায়, ইতিমধ্যে সভা-সমাবেশসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনে ধীরে ধীরে অবাধ সুযোগ দেয়া হয়েছে বিএনপি তথা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোকে। নির্বাচনী মাঠে প্রচার-প্রচারণায়ও কোনো ধরপাকড় বা বাধা থাকছে না বলেও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হচ্ছে। এমনকি সরকারের ব্যর্থতা তুলে ধরে বিলবোর্ড, ব্যানার, ফেস্টুন, দেয়াল লিখনেও বাধা দেবে না সরকারি দল আওয়ামী লীগ। সূত্র আরও জানায়, বিএনপির দাবিগুলোর মধ্যে বিদেশি পর্যবেক্ষকের অনুমতির কথা তো প্রথম সংলাপেই মেনে নেয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ ও সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আপত্তি নেই।

জানা যায়, সরকার ও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচন কমিশন ঘেরাও কর্মসূচি পালনে কোনো বাধা দেবে না। এর আগের কর্মসূচিগুলো সাধারণত প্রেসক্লাব বা শাহবাগ থেকে ফিরিয়ে দেয়া হতো। এবার এই বাধা থাকছে না। তবে নির্বাচন কমিশনের গেট পর্যন্ত যেতে পারবে ঘেরাও কর্মসূচি। এরপর আর এগোতে দেয়া হবে না। আরও জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী নিজেই জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের এই কর্মসূচি পালনে বাধা না দেয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

ঘটনাপ্রবাহ : কারাগারে খালেদা জিয়া

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter