ঢাকা লিট ফেস্টের সমাপ্তি

শীর্ষেন্দু-মনীষায় মুগ্ধতা নিয়ে বাড়ি ফেরা

  সাংস্কৃতিক রিপোর্টার ১১ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

খ্যাতিমান সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়।
খ্যাতিমান সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। ছবি-যুগান্তর

শেষ বেলায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ভেসে বেড়াল লালনের গানের সুর। শেকড়ের গান। তার আগে সকাল থেকে শুরু করে সন্ধ্যা পর্যন্ত একটার পর একটা অধিবেশন। নানা বিষয়ে আলোচনা, না জানাকে জানা, আলোকিত হওয়া। হাজার হাজার সাহিত্যপ্রেমী পাঠক উপভোগ করলেন।

অনেকে পছন্দের বইটি কিনলেন। ফুড কোর্টে বাহারি খাবারের স্বাদ নিলেন। তবে সবকিছু ছাপিয়ে সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল সকালে মনীষা কৈরালা ও সন্ধ্যায় শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের সেশন। এ দুই সময়ে মিলনায়তনে তিলধারণের জায়গা ছিল না। মাঝে অস্কারপ্রাপ্ত অভিনেত্রী টিলডা সুইন্টনের অধিবেশনটিও ছিল উপভোগ্য।

দেশের সাহিত্যের সমৃদ্ধি কামনায় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে দেয়ার প্রত্যয়ে শেষ হয় তিন দিনের ঢাকা লিট ফেস্ট। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। শনিবার লিট ফেস্টের শেষ দিনে শেষ সেশন ছিল ‘শীর্ষেন্দুর সঙ্গে কথোপকথন’।

সাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলনের সঞ্চালনায় কথা বলেন ওপার বাংলার খ্যাতিমান সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়।

তিনি বলেন, যখন লেখালেখি শুরু করি তখন আমার লেখা কেউ বুঝতে পারত না। সেজন্য আমি জনপ্রিয় লেখক হতে পারিনি। আমার মধ্যে ভয় কাজ করত লেখা যদি কেউ বুঝতে না পারে তাহলে আমার পত্রিকা থেকে চাকরিটা না চলে যায়! আমার প্রথম উপন্যাস ‘ঘুণপোকা’ পড়ে কেউ কেউ বলেছিলেন, ওর লেখা পড় না, মন খারাপ হয়ে যায়। আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম তা শুনে। কিন্তু লিখতেই সব সময় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতাম।

নিজের প্রসঙ্গে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বলেন, আমি সব সময় একটা চেতন-অবচেতনে বিরাজ করি। অনেক সময় মনেও থাকে না আমি লেখক। অদ্ভুত ধরনের এক অন্যমনষ্কতা কাজ করে। রাস্তাঘাটে আমি খুবই অনিরাপদভাবে চলাচল করি। একজন ব্যক্তি জীবনযাপনে অনেক টুকরোতে বিভক্ত হয়ে জীবনযাপন করে- স্ত্রীর স্বামী, সন্তানের বাবা। আমিও তাই।

নিজের লেখক জীবন সম্পর্কে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বলেন, আমার লেখার কোনো ছক নেই। পরিকল্পনা নেই। আমার লেখার ধরন অদ্ভুত। লিখতে বসার আগে পর্যন্ত জানি না কী লিখব। একটা মনে ধরার মতো লাইনের জন্য অপেক্ষা করি। যদি ওই বাক্যটি পছন্দ হয় লিখতে শুরু করি। এমনও হয়েছে বাক্যে একটি শব্দ খুঁজতে গিয়ে ১২-১৩ দিন লিখতে পারিনি। আবার কোনো কোনো দিন ১২-১৩ ঘণ্টা টানা লিখে গেছি। আমার লেখার ধরন অনেকটা তুলোর গুটি থেকে সুতো পাকানোর মতো। ধীরে ধীরে একেকটি চরিত্রকে দেখতে পাই। তাদের মুখ, শরীর কাঠামো, পোশাক ভেসে ওঠে চোখের সামনে। তাদের জীবনযাত্রা, কথা দেখতে পাই। তখন আমার গল্প, উপন্যাস যেন হয়ে ওঠে একটি প্রতিবেদন লেখার মতো। তবে এভাবে লেখা প্রত্যাশিত নয়। আমার লেখার ধরনটা বৈজ্ঞানিকও নয়; কিন্তু আমি নিরুপায়।

শীর্ষেন্দু আরও বলেন, মানুষের জীবনের চলার পথে কিছু গর্ত রয়েছে, যা এড়ানো যায় না। মানুষ ভেতরে ভেতরে নিষ্ঠুর, কখনও কখনও খুব দয়ালু হয়ে ওঠে। মনের সঙ্গে এ খেলা চলে যাকে আমরা বুঝতে পারি না। মনের মধ্যে এমন ভাবনা আসে যা প্রকাশ করা যায় না, যাকে আমরা বোতলবন্দি করে রাখি। কিন্তু মনের মধ্যে সেটা থেকে যায়। আমি এ বিচিত্র জীবনকে দেখি। জীবন কতভাবেই না প্রকাশিত হচ্ছে। রাস্তায় ঘুরে ঘুরে মানুষ দেখি।

লিট ফেস্টের সমাপনী অধিবেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। আরও বক্তব্য দেন অস্কারজয়ী ব্রিটিশ অভিনেত্রী টিল্ডা সুইন্টন ও উৎসব পরিচালক সাদাফ সায।

আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, আমার মনে হয় বাংলাদেশে আমাদের রাজনৈতিক জীবনে উত্থান-পতন আছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের বাতাস আমরা সংস্কৃতি এবং সাহিত্যের পালে লাগতে দেই না। নির্বাচন আমাদের খুব সন্নিকটে, পরিবেশ খুব ভালো এবং শান্ত। যারা এখানে বিদেশি অতিথিরা এসেছেন, তাদের কাছে আমার প্রশ্ন- আপনারা কি বুঝতে পেরেছেন যে দেশে ইলেকশন সামনে? দেয়ার ইজ নো ইলেকশন ফিভার, অ্যান্ড ইট ইজ গুড। এর মানে হল আমরা ভালো আচরণ করছি এবং ডিসেম্বরেই নির্বাচন হবে।

উৎসবের সমাপনী দিনের শুরুতেই বলিউড অভিনেত্রী মনীষা কৈরালা কথা বলেন। ‘হিলড’ নামের এ অধিবেশন বসে বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে। উৎসব পরিচালক সাদাফ সায সঞ্চালিত আলোচনায় মরণব্যাধি ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াইয়ের কথা তুলে ধরেন মনীষা। মনীষা ফিরে গেলেন ২০১২ সালে ১০ ডিসেম্বর। বললেন, ‘জানতে পারলাম আমার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ৪৪ শতাংশ, আর মৃত্যুর ঝুঁকি ৫৬ শতাংশ। আমার হার্টবিট বেড়ে গেল। অসহনীয় শারীরিক যাতনার মধ্যেও হাল ছাড়িনি। জীবনযুদ্ধে লড়াইটা তীব্র হল।’

মনীষা আরও বলেন, শুরুতে চিকিৎসকরাও কিছু জানাতে চাচ্ছিল না। একপর্যায়ে পরীক্ষা করার পর জানানো হল- লিড স্টেজে ছড়িয়ে পড়েছে আমার ক্যান্সার। বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকলাম চিকিৎসকের দিকে। এক সময় বলা হল- আমার জরায়ুর ক্যান্সার হয়েছে এবং সেটা কেটে ফেলে দিতে হবে। আমি সন্তানের মা হতে চেয়েছিলাম। তখন উপলব্ধি হল- আমি কখনও মা হতো পারব না। এভাবেই আমার জীবনের নিঃসঙ্গ রাত শুরু হল। সেই সঙ্গে শুরু হল আমার ভয়ঙ্কর দিনগুলো। কথা বলতে বলতে মনীষার চোখের কোল গড়িয়ে পড়ে বেদনার অশ্রুজল।

চিকিৎসা পর্ব নিয়ে মনীষা বলেন, আমার বন্ধু, পরিবার সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিল কোথায় আমার অপারেশন করবে। কেউ বলল যুক্তরাষ্ট্র, কেউ ব্যাংকক, কেউ বা মুম্বাই। ক্যান্সার চিকিৎসায় অনিশ্চয়তার বিষয়টি উল্লেখ করে মনীষা বলেন, মুম্বাইয়ের চিকিৎসকরা যখন বললেন- এ সার্জারি খুবই কমপ্লিকেটেড; তখন শুভাকাক্সক্ষীদের পরামর্শে চিকিৎসার জন্য গেলাম যুক্তরাষ্ট্রে। ক্যান্সার চিকিৎসা অনেক অনিশ্চয়তার বিষয়। শুধু অপেক্ষা আর অপেক্ষা। এ নিয়ে আমার ‘হিল্ড’ শীর্ষক বইয়ে একটা চ্যাপ্টার আছে, নাম ‘ইন্তেজার’। ক্যান্সার চিকিৎসায় কয়েকটি ধাপ আছে। প্রথমত, অপারেশন সফল হতে হবে। দ্বিতীয়ত, অপারেশন পরবর্তী চিকিৎসা যথাযথ হতে হবে। সেই সঙ্গে আছে কেমোথেরাপি। সব চিকিৎসা শেষ হওয়ার পর চিকিৎসককে জিজ্ঞেস করলাম, আমি কি বাঁচব এখন? ছয় মাসে ক্যান্সার নিরাময় হওয়ার পর বলল, পুরোপুরি সুস্থ হতে তিন বছর সময় লাগবে।

সেই সময় পার হওয়ার পরও চিকিৎসক বললেন, ক্যান্সার বেড়ে ওঠার ৯০ শতাংশ চান্স আছে। কিন্তু আমি কখনও মনে করিনি আমাকে অল্প কিছুদিন বাঁচতে হবে। এ সময় মনীষা তার লেখা বইয়ের কয়েকটি লাইন তুলে ধরে বলেন, ক্যান্সার আমাকে বদলে দিয়েছে। আমি ভেতর থেকে বদলে গিয়েছি। আমার পৃথিবীও বদলে গেছে। আমি জীবনকে উপভোগের দ্বিতীয় সুযোগ পেয়েছি। তাই মরতে চাই না। এক অর্থে ক্যান্সার আমার জীবনের শিক্ষক। এটাকে আমি ইতিবাচকভাবে দেখি। এ রোগ থেকে জীবনের মূল্য বুঝেছি। একই সঙ্গে নিজেকে কঠিন ও মজবুতভাবে তৈরি করতে শিখেছি। এখন জীবনটাকে ভালোবাসার উপহার বলে মনে হয়। লাইফ ইজ ফুল অব পজেটিভ স্টোরিজ।

কথোপকথনে বলিউডে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রামী অধ্যায়টিও উন্মুখ শ্রোতাদের সামনে তুলে ধরেন মনীষা। তিনি বলেন, নেপালি হওয়ায় এ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে শুরুর দিকে বহিরাগত হিসেবে বিবেচিত হতাম। পাড়ি দিতে হয়েছে কঠিন একটা পথ। নার্ভাসনেস কাজ করত। কারণ স্কুল ছেড়ে যোগ দিয়েছিলাম ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে। নাচ করা থেকে ঘোড়া চালানো- এমন অনেক কিছু শিখতে হয়েছে। সেই শরীরের ধকল নেয়াটাও রপ্ত করতে হয়েছে। কারণ কখনও টানা ১৮ ঘণ্টাও কাজ করতে হয়েছে। শুধু ইচ্ছাশক্তির জোরেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছি বলিউডে। সুভাষ ঘাইয়ের সওদাগর ছবির মাধ্যমে বলিউডে আমার অভিষেক হয়। আমার জন্য ইতিবাচক বিষয় ছিল ইন্ডাস্ট্রিতে কিছু ভালো নির্মাতা ও শুভাকাঙ্ক্ষী পেয়েছিলাম। এছাড়া চলচ্চিত্রে যুক্ত হতে গিয়ে প্রথম প্রতিবন্ধকতা এসেছিল পরিবার থেকে। সে সময় শুধু মা ছিলেন আমার পাশে। অনুপ্রেরণা দিয়ে তিনি বলেছিলেন, তুমি যদি ঘাস কাট সেখানেও তোমাকে সেরা হতে হবে। আমি সেটাই করেছি।

২৮ সেপ্টেম্বর ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭১তম জন্মদিন। এ উপলক্ষে গল্পকার থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাকে নিয়ে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় লেখা কবিতার সংকলন- ‘পিস অ্যান্ড হারমনি : সেভেন্টিওয়ান পোয়েমস ডেডিকেটেড টু শেখ হাসিনা’, যা নিয়ে গতকাল আলোচনা করেন জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, মুহাম্মদ সামাদ, কামাল চৌধুরী, আবুল আজাদ, সংকলনের সম্পাদক আহমেদ রেজা, সংকলনের ইংরেজি অনুবাদক আনিস মুহাম্মদ প্রমুখ।

পুলিৎজারজয়ী সাহিত্যিক অ্যাডাম জনসনের প্রথম উপন্যাস ‘প্যারাসাইটস লাইক আস’। এ শিরোনামে আলোচনা করেন অ্যাডাম জনসন ও ফিলিপ হেনশার। সঞ্চালনায় ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক মন্ময় জাফর।

সকাল ১০টায় উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে ছিল আসলাম সানীর সঞ্চালনায় ‘কিশোর মনন ও আবৃত্তি’। নভেরা প্রদর্শনালয়ে ছিল সম্পাদনা নিয়ে রিচার্ড বেয়ার্ডের পরিচালনায় কর্মশালা। কসমিক টেন্টে ছিল ‘মুভিং পিকচারস অ্যান্ড বর্ডার’ শিরোনামের অধিবেশন। এতে সঞ্চালনা করেন সাল ইমাম। আলোচনা করেন প্রবার রিপন ও সাবাহাত জাহান। নজরুল মঞ্চে বাচ্চাদের বিভা সিদ্দিকী শোনান বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকজ গল্প।

বেলা সাড়ে ১২টায় কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে ছিল ‘ডেডলি লিগাসি অব ইন্ডিয়াস পার্টিসন’ শিরোনামের অধিবেশন। এতে মাহ্্রুখ মহিউদ্দিনের সঞ্চালনায় আলোচনা করেন নিশিদ হাজারি। উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে ছিল ‘বাংলা সাহিত্য : নারী ও পুরুষ’ শিরোনামের অধিবেশন। এতে সঞ্চালনা করেন শামীম রেজা। আলোচনা করেন সেলিনা হোসেন, সালমা বানী, শাহনাজ মুন্নী ও অদিতি ফাল্গুনী। নভেরা প্রদর্শনালয়ে ছিল স্যালি পমির শিশুতোষ পরিবেশনা ‘দ্য কিং উইথ ডার্টি ফিট’। কসমিক টেন্টে ছিল এ কে রহিমের গবেষণামূলক পরিবেশনা ‘দ্য রোহিঙ্গা : এ লিঙ্গুস্টিক হিস্টোরি’। এ পর্বটি সঞ্চালনা করেন সারাহ মজুমদার।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×