বীমা খাতে দুর্নীতি প্রতিরোধ

আইন সংশোধন চায় দুদক

দুর্নীতির প্রচুর অভিযোগ থাকার পরও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না * আইন সংশোধনের পক্ষে অর্থনীতিবিদরাও

  মনির হোসেন ২৬ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বীমা খাতের দুর্নীতি প্রতিরোধে বিদ্যমান বীমা আইনের সংশোধন চায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ লক্ষ্যে ইতিমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। আর প্রস্তাবটি খতিয়ে দেখতে ৩১ জানুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয়ে একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। অর্থ সচিব ওই বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন। বীমা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সদস্যরাই বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন। ১৭টি বীমা কোম্পানির অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়টি তদন্ত করতে এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে দুদকের মহাপরিচালক (আইন শাখা) মো. মঈদুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ‘বেশ কিছু কোম্পানির বিরুদ্ধে দুদক অনুসন্ধান করেছিল। কিন্তু সেই কোম্পানিগুলো আর্থিক প্রতিষ্ঠান কিনা তার সংজ্ঞা নির্ধারণ করা দরকার। এ কারণে সরকারের কাছে চিঠি লেখা হয়েছে। আর বিষয়টি খতিয়ে দেখছে এ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইন্স্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথরিটি (আইডিআরএ)।’

জানতে চাইলে আইডিআরের সদস্য গকুল চাঁদ দাস যুগান্তরকে বলেন, ‘বীমা খাতে স্বচ্ছতা বাড়াতে আমরা যে কোনো ইতিবাচক সিদ্ধান্তের পক্ষে। তবে বিদ্যমান বীমা আইনে কি আছে, তা আমরা খতিয়ে দেখছি। কোনো অসঙ্গতি থাকলে তা সমাধানে আমরা সব ধরনের সহযোগিতা করব।’

এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদদের বক্তব্য হল- ‘আইনে অসঙ্গতি থাকলে অবশ্যই পদক্ষেপ নেয়া উচিত।’ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী বীমা খাতকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আওতায় বিবেচনায় করা হয়। বাংলাদেশেও তা করা উচিত। এক্ষেত্রে আইনে কোনো দুর্বলতা থাকলে অবশ্যই সংশোধন করতে হবে।’

জানা গেছে, অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয় দেখিয়ে গ্রাহকদের ১ হাজার ৭৮১ কোটি টাকার বেশি হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগে সরকারি-বেসরকারি ১৭ বীমা কোম্পানির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান করেছে দুদক। কোম্পানিগুলো হল- পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্স, জীবন বীমা কর্পোরেশন, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ, পদ্মা ইসলামী লাইফ, গোল্ডেন লাইফ, সন্ধানী লাইফ, প্রগতি লাইফ, সানফ্লাওয়ার লাইফ, সানলাইফ, প্রাইম ইসলামী লাইফ, মেঘনা লাইফ, ডেল্টা লাইফ, রূপালী লাইফ, হোমল্যান্ড লাইফ, প্রোগ্রেসিভ লাইফ, বায়রা লাইফ এবং ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স।

দুদকের উপ-পরিচালক মো. জালাল উদ্দিন ও সহকারী পরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন বিষয়টি তদন্ত করেছেন। অনুসন্ধান কাজের তদারকির দায়িত্বে রয়েছেন দুদক পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন। কিন্তু অনুসন্ধানের পর দেখা গেছে, বিদ্যমান আইনে বীমা কোম্পানি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আওতায় পড়ে না। এরপর বিষয়টি অবহিত করে দুদকের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে চিঠি লেখা হয়।

ওই চিঠিতে বীমা আইন-২০১০ এর সংশোধন চাওয়া হয়েছে। বীমা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রচুর অভিযোগ থাকার পরও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অন্তর্ভুক্ত না হওয়ার দুর্নীতির জন্য অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না দুদক। তাই বীমা আইন ২০১০-এর ১৫৮ ধারার সঙ্গে ১৫৮ক ধারা সংযুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন এ ধারাটি সংযুক্ত করা হলে বীমা কোম্পানিগুলো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আওতাভুক্ত হওয়ার পাশাপাশি বীমা কোম্পানির পরিচালনা পরিষদের সদস্য ও কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারী পাবালিক সার্ভেন্ট হিসেবে গণ্য হবেন। এ ব্যাপারে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন, ‘আমরা বীমা কোম্পানির বিরুদ্ধে প্রচুর অভিযোগ পাচ্ছি। এগুলো তদন্তের জন্য আইনের সংশোধন দরকার। আইন সংশোধন হলে দুদক তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে।’

সূত্রমতে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অন্তর্ভুক্ত করতে সংশোধনীর এ প্রস্তাব মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানের পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠায়। প্রস্তাবে আইন সংশোধনের যৌক্তিকতা তুলে ধরে দুদক। এতে বলা হয়, ‘বীমা কোম্পানিগুলো বীমা সংক্রান্ত কাজ সম্পাদন করলেও মূলত জনগণের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন করাই তাদের কাজের ধরন। সে কারণে তাদের মধ্যে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সব বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। কিন্তু ১৯৯৩ সালের আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইনের ধারা ২-এ বর্ণিত সংজ্ঞায় তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এছাড়া ব্যাংক কোম্পানি আইন-১৯৯১ এর ধারা ১১০-এ ব্যাংক কোম্পানির চেয়ারম্যান ও পরিচালকসহ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পাবলিক সার্ভেন্ট হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। কিন্তু বীমা কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান, সদস্য ও কর্মকর্তাদের পাবলিক সার্ভেন্ট হিসেবে গণ্য করা হয়নি।’

আইন সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে দুদক আরও জানায়, বীমা কোম্পানিগুলোর দুর্নীতির প্রচুর অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনে পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু বীমা কোম্পানি আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য না থাকায় কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ও কর্মকর্তা-কর্মচারী পাবলিক সার্ভেন্ট হিসেবে গণ্য না থাকায় এসব অভিযোগের কোনো প্রতিকার করা সম্ভব হচ্ছে না। সে কারণে ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১ (১৯৯১ সালের ১৪নং আইন) এর ধারা ১১০-এর অনুসারে বীমা কোম্পানি আইন-২০১০ এর ধারা ১৫৮ এরপর প্রস্তাবিত আকারে ধারা ১৫৮ক সন্নিবেশ পূর্বক সংশোধন আবশ্যক।

বৃহস্পতিবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বৈঠকটি স্থগিত করে ৩১ জানুয়ারি নির্ধারণ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×