সেতাফুলের অর্থ আত্মসাতের তদন্ত প্রতিবেদন

দায়ী ডিসিসহ ৫ কর্মকর্তা!

প্রকাশ : ২৬ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  উবায়দুল্লাহ বাদল

জেলা প্রশাসকসহ (ডিসি) ৫ কর্মকর্তার অসতর্কতার কারণে কিশোরগঞ্জের সাবেক ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা সেতাফুল ইসলাম ১৩ কোটি টাকা আত্মসাতের সুযোগ পেয়েছেন। এরা হলেন কিশোরগঞ্জের ডিসি মো. আজিমুদ্দিন বিশ্বাস, জেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. সিরাজুল ইসলাম, জেলা হিসাবরক্ষণ অফিসের সুপার মো. গোলাম হায়দার, একই অফিসের অডিটর মো. সৈয়দুজ্জামান এবং সোনালী ব্যাংকের কিশোরগঞ্জ শাখার ম্যানেজার। তারা নির্ভুলভাবে দায়িত্ব পালন করলে অর্থ আত্মসাতের এত বড় ঘটনা ঘটত না। সম্প্রতি তাদের অভিযুক্ত করে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মির্জা তারিক হিকমত। প্রতিবেদনটি পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ইতিমধ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেতাফুল ইসলাম ৪৮টি ক্ষতিপূরণের চেক বিভিন্ন ব্যক্তির নামে ইস–্য করেন, যার কোনো টাইটেল ঠিকমতো পাওয়া যায়নি। ভূমি অধিগ্রহণ শাখার লেজার বইয়ে ওই চেকগুলোর কোনো এন্ট্রি নেই। এসব চেকের মধ্যে মুড়ি অংশে যে পরিমাণ টাকা লেখা আছে, জেলা হিসাবরক্ষণ অফিসের হিসাব বইয়ে সেই পরিমাণ লেখা নেই। ক্ষতিগ্রস্ত মঞ্জু মিয়ার চেকের মুড়িতে লেখা আছে ২৫ লাখ টাকা। কিন্তু হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী এ চেকে টাকার পরিমাণ ৬৮ লাখ। এভাবে বিভিন্ন ব্যক্তির নামে ৪৮টি চেকের মাধ্যমে মোট আট কোটি ৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। সেতাফুল একটি চেকে পাঁচ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। সেই চেকের মুড়িতেও ক্ষতিগ্রস্ত জাহের মিয়ার নামে সাত লাখ ৩২ হাজার ৯৬১ টাকা লেখা ছিল। সেতাফুল ইসলামের কাছ থেকে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ১৪০টি চেকের প্রাপকের অংশ উদ্ধার করেন। এসব চেকের ১৩৮টির মুড়িতে প্রাপকের নাম ও টাকার পরিমাণ লেখা ছিল। এসব চেক ভাঙানো হয়নি। এসব চেকের টাকাও আত্মসাৎ করা হতো বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এ প্রসঙ্গে তদন্ত কর্মকর্তা মির্জা তারিক হিকমত বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, ‘ভূমি সচিবের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে। এই যুগ্ম সচিব আরও বলেন, এতদিন দেখতাম নালা জমি ভিটি দেখিয়ে সরকারের কাছ থেকে বেশি টাকা আদায় করা হয়। এছাড়া জমি অধিগ্রহণের নানা ধরনের দুর্নীতি হয়। কিন্তু এই প্রথম দেখলাম নতুন ধরনের দুর্নীতি।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী অভিযুক্ত ৫ জনের মধ্যে ডিসি আজিমুদ্দিন বিশ্বাসের বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে, সেতাফুল ইসলামের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়ার পরও কোনো ব্যবস্থা নেননি তিনি। হিসাবে গরমিল থাকার পরও হিসাব না নিয়ে ডিসি সেতাফুলকে অবমুক্ত করে দিয়েছেন। সেতাফুলের আট কোটি ৯ লাখ ৭০ হাজার টাকার আর্থিক অনিয়ম খতিয়ে দেখতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মির্জা তরিক হিকমতকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করে ভূমি মন্ত্রণালয়। এর আগে সেতাফুল ইসলামের আর্থিক অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন দেন কিশোরগঞ্জের তখনকার দুই অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মনিরুল ইসলাম পাটোয়ারী ও দুলাল চন্দ্র সূত্রধর। ওই প্রতিবেদনে ক্ষতিপূরণের প্রতিটি চেক পাস করার আগে ডিসি বা এডিসির মাধ্যমে যাচাই করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। ওই সব কমিটি সেতাফুলের কাছ থেকে আট কোটি ৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা আদায় করারও সুপারিশ করেছিল। একই সঙ্গে ইস্যুকৃত কিন্তু পাওয়া যায়নি এমন ১৩টি চেক ফেরত দিতে সেতাফুলকে বাধ্য করার সুপারিশ করা হয়েছিল। পরে সেতাফুল ওই ১৩টি চেকের দুটি ব্যবহার করে আরও পাঁ০চ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। এরই মধ্যে সেতাফুলকে পিরোজপুরে বদলি করা হয়।

তবে এইসব অভিযোগ মানতে নারাজ কিশোরগঞ্জের ডিসি আজিমুদ্দিন বিশ্বাস। বৃহস্পতিবার এ প্রসঙ্গে তিনি যুগান্তরকে বলেন, গত আগস্টে আগের এডিসি (রাজস্ব) বদলি হয়ে যাওয়ার সময় সেতাফুলের বিষয়ে এক পৃষ্ঠার একটি নোট রেখে যান। সেখানে সুস্পষ্ট কোনো তথ্য না থাকলেও শুধু হিসেবে গরমিলের কথা উল্লেখ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সেপ্টেম্বরে নতুন এডিসির (রাজস্ব) নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করে দেই। ওই কমিটির তদন্তকালেই ৩ ডিসেম্বর সেতাফুলের বদলির আদেশ আসে। সেখানে বলা হয়, ৫ তারিখের মধ্যে সেতাফুলকে অবমুক্তি না করা হলে ৬ ডিসেম্বর স্ট্যান্ডরিলিজ বলে গণ্য হবে। ওই সময় কমিটি আমার নির্দেশে প্রাথমিক প্রতিবেদন দেয়। সেখানে দুর্নীতির কিছু সুনির্দিষ্ট তথ্য পাই। বিষয়টি ভূমি মন্ত্রণালয়কে জানানো হলে আমাকে বলা হয়- হিসাবের গরমিলের বিষয়ে পরবর্তী কর্মস্থল হতেই সেতাফুল জবাব দেবে। কোনো সমস্যা হবে না। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে জনপ্রশাসন ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট দফতরে অবহিত করি। তদন্ত কমিটি ২৮ ডিসেম্বর পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দিলে তা ভূমি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ভূমি মন্ত্রণালয় একজন যুগ্ম সচিবকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়। ওই কর্মকর্তা জানুয়ারির প্রথমদিকে তদন্তকার্যক্রম শুরু করেন এবং ১১ জানুয়ারি তা ভূমি সচিবের কাছে জমা দেন। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার আগেই সেতাফুলকে অবমুক্ত করা হয়েছে। বরং ভূমি মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কর্মকর্তা ডিসি হিসেবে আমার বক্তব্য বা ব্যাখ্যা চাইতে পারতেন। কিন্তু তিনি আমার সঙ্গে কোনো কথা বলেননি।

ওদিকে জেলা হিসাবরক্ষণ অফিসার মো. সিরাজুল ইসলাম, সুপার মো. গোলাম হায়দার এবং অডিটর মো. সৈয়দুজ্জামান ফেঁসে যাচ্ছেন আট কোটি ৯ লাখ ৭০ হাজার এবং পাঁচ কোটি টাকার চেকের পেমেন্ট অর্ডার দেয়ার সময় সতর্কতা অবলম্বন না করার জন্য। জেলা হিসাবরক্ষণ অফিসের ওই কর্মকর্তারা সেতাফুল ইসলামকে অর্থ আত্মসাতে সহযোগিতা করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাঁচ কোটি টাকার চেকের প্রাপকের ঘরে ‘সেলফ’ লেখা ছিল এবং সেতাফুল ইসলামের স্বাক্ষরের নিচে কোনো সরকারি সিল ছিল না। সরকারি চেকে পদবি এবং স্বাক্ষরের নিচে অফিসিয়াল সিল ব্যবহার করার নিয়ম থাকলেও এ ক্ষেত্রে তা অনুসরণ করা হয়নি। রহস্যজনকভাবে এ বিষয়ে ব্যাংকও কোনো প্রশ্ন তোলেনি। একারণে ব্যাংকের ম্যানেজারকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

জানা গেছে, বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য কিশোরগঞ্জে কয়েকশ’ একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়। এসব ভূমির মালিককে ক্ষতিপূরণের টাকা দেয়ার সময় জালিয়াতির আশ্রয় নেন কিশোরগঞ্জের সাবেক ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা মো. সেতাফুল ইসলাম। দফায় দফায় অসংখ্য ভূমি অধিগ্রহণ চেকের মধ্যে সেতাফুল ইসলাম ১৩ কোটি ৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেন বলে অভিযোগ ওঠে। আর ওই অভিযোগে সেতাফুলকে গত ১৭ জানুয়ারি গ্রেফতার করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।