বিদেশে এবি ব্যাংকের অর্থ পাচার

সাবেক চেয়ারম্যানসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা

সাবেক চেয়ারম্যানসহ দুই কর্মকর্তা দুপুরে গ্রেফতার; সন্ধ্যায় জামিন * সাইফুল হক ৩ দিনের রিমান্ডে

  যুগান্তর রিপোর্ট ২৬ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

এবি ব্যাংক

বিদেশে অফশোর কোম্পানি খুলে প্রায় ১৬৫ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে এবি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ও দুই এমডিসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। রাজধানীর মতিঝিল থানায় বৃহস্পতিবার দুপুরে মামলাটি করেন দুদকের সহকারী পরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই দুদকের পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বে একটি টিম মামলার আসামি ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান এম ওয়াহিদুল হকসহ তিনজনকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতার হওয়া অন্য দু’জন হলেন- ব্যাংকটির হেড অব কর্পোরেট ট্রেজারি আবু হেনা মোস্তফা কামাল ও ব্যাংকটির গ্রাহক সাইফুল হক। বিকালে তাদের ঢাকার সিএমএম আদালতে সোপর্দ করা হলে ম্যাজিস্ট্রেট আবু সাঈদের আদালত সন্ধ্যায় ওয়াহিদুল হক ও আবু হেনা মোস্তফা কামালকে জামিন দেন বলে জানিয়েছেন দুদকের পিপি আবুল হাসান। তিনি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় যুগান্তরকে বলেন, আমি আদালতে শুনানিতে ছিলাম। আদালত দু’জনকে জামিন দিয়েছেন। তবে ব্যাংকের গ্রাহক সাইফুল হকের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। দুদক কর্মকর্তারা অর্থ পাচারের মামলায় তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড চেয়েছিলেন।

দুদকের মামলায় এ তিনজন ছাড়া অন্য যাদের আসামি করা হয়েছে তারা হলেন- ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শামীম আহমেদ চৌধুরী ও ফজলুর রহমান, ব্যাংকের হেড অব অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট (ওবিইউ) মোহাম্মদ লোকমান, ব্যাংকের ট্রেজারি শাখার ভিপি মোহাম্মদ মাহফুজ-উল হক ও সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নুরুল আজিম। দণ্ডবিধির ৪০৯/৪২০/১০৯, ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা ও ২০১২ সালের মানি লন্ডারিং আইনের ৪(২) ও (৩) ধারায় আসামিদের বিরুদ্ধে মামলায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, এবি ব্যাংকের অর্থ পাচারের বিষয়ে দুদক বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে একটি লিখিত অভিযোগ পায়। সেই অভিযোগের অনুসন্ধান শেষে মামলা করা হয়। অভিযোগের বিষয়ে মামলার এজাহারে বলা হয়, ব্যাংকটির গ্রাহক সাইফুল হক দুবাইয়ে অবস্থানকারী আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্রের সদস্য খুররম আবদুল্লাহ ও আবদুস সালাম খানের মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপন করে ব্যাংকের অর্থ পাচারের একটি পরিকল্পনা করেন। এর অংশ হিসেবে সাইফুল হক ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যান এম ওয়াহিদুল হকের সঙ্গে প্রতারক চক্রের দুই সদস্যকে পরিচয় করিয়ে দেন। পরে তারা অসৎ উদ্দেশ্যে একাধিকবার দুবাইয়ে মিলিত হয়ে মিটিং করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ওয়াহিদুল হক ও ব্যাংকের হেড অব ট্রেজারি আবু হেনা মোস্তফা কামাল পরিচালনা বোর্ডকে না জানিয়ে এবং কোনো ধরনের দাফতরিক যোগাযোগ না করে ব্যক্তিগত উদ্যোগে দুবাই যান। সেখানে তারা প্রতারক চক্রের সঙ্গে মিটিং করেন। চক্রটি আগ থেকেই সিঙ্গাপুরভিত্তিক কোম্পানি পিনাকল গ্লোবাল ফান্ড (পিজিএফ) গঠন করেন। সেই সঙ্গে দেশ থেকে টাকা পাচারের অংশ হিসেবে তারা দুবাইয়ে অপর একটি কোম্পানি চেং বাও জেনারেল ট্রেডিং এলসির নামে দুবাই এডিসিবি ব্যাংকে একটি হিসাব খোলেন। পরে ওয়াহিদুল হক ও আবু হেনা মোস্তফা কামাল নিজ উদ্যোগে প্রতারক খুররম আবদুল্লাহর সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ শুরু করেন। একপর্যায়ে ওই কোম্পানিতে (পিজিএফ) বিনিয়োগের জন্য খুররম আবদুল্লাহর সঙ্গে একটি খসড়া ‘ওয়াকালা অ্যাগ্রিমেন্ট’ তৈরি করেন। তা অনুমোদনের জন্য আবু হেনা মোস্তফা কামাল ও ব্যাংকের সাবেক এমডি শামীম আহমেদ চৌধুরীর যৌথ স্বাক্ষরে বোর্ড মেমো প্রস্তুত করে ব্যাংকের ৫৩৯তম বোর্ডসভায় উপস্থাপন করেন। কিছু শর্ত আরোপ করে বোর্ড খসড়া চুক্তি অনুমোদন করে। ওই অ্যাগ্রিমেন্টের শর্ত ছিল- পিজিএফের ৬০ মিলিয়ন ডলার ছাড় করানোর পর এবি ব্যাংক ২০ মিলিয়ন ডলারের ব্যাংক গ্যারান্টি নিশ্চিত করবে। যা এবি ব্যাংক ও পিজিএফের প্রতিনিধির যৌথ স্বাক্ষরে পরিচালিত একটি যৌথ ব্যাংক হিসাবে জমা হবে। এ-ও সিদ্ধান্ত ছিল, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন সাপেক্ষেই শুধু এবি ব্যাংক ২০ মিলিয়ন ডলারের ব্যাংক গ্যারান্টি ছাড় করবে। এ ছাড়া তখন বলা হয়েছিল, চুক্তিটি চূড়ান্তভাবে স্বাক্ষরের আগে পুনরায় অনুমোদনের জন্য বোর্ডসভায় তোলা হবে।

কিন্তু ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এম ওয়াহিদুল হক, সাবেক এমডি ফজলুর রহমান ও হেড অব ট্রেজারি আবু হেনা মোস্তফা কামাল অসৎ উদ্দেশ্যে প্রতারক চক্রের সঙ্গে যোগসাজশ করে অনুমোদিত খসড়া চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে চুক্তিপত্রে ‘ব্যাংক গ্যারান্টি’ শব্দটি বাদ দিয়ে আলাদা চুক্তিপত্র তৈরি করেন। পরে তা বোর্ডে উপস্থাপন ছাড়া তাতে এবি ব্যাংকের প্রতিনিধি হিসেবে ওয়াহিদুল হক ও ফজলুর রহমান স্বাক্ষর করেন। পরে এই চুক্তিপত্র নিয়ে ওয়াহিদুল হক ও আবু হেনা মোস্তফা কামাল দুবাই যান। সেখানে তারা অস্তিত্বহীন পিজিএফ কোম্পানির দু’জন প্রতিনিধির স্বাক্ষর নেন। তবে চুক্তিপত্রে পিজিএফের পক্ষে স্বাক্ষরকারী দু’জন প্রতিনিধির নাম-ঠিকানা বা পরিচয় উল্লেখ করা হয়নি। ওই চুক্তিপত্রে আরও শর্ত ছিল, দুবাইয়ে অথরাইজড সিগনেটরি হওয়ার জন্য চুক্তি স্বাক্ষরের ১৫ দিনের মধ্যে ওয়াহিদুল হকের রেসিডেন্সি ভিসা পাওয়ার ব্যবস্থা করে কথিত কোম্পানি পিজিএফ। কিন্তু ওয়াহিদুল হক দুবাইয়ের রেসিডেন্সি ভিসা পাননি। অথচ তিনি ও অপর কর্মকর্তা আবু হেনা মোস্তফা কামাল ২০১৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি দুবাই যান। সেখানে তারা ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অবস্থান করেন। সে সময় তারা যৌথ স্বাক্ষরে পরিচালনার উদ্দেশ্যে হিসাব না খুলেই প্রতারক চক্রের নামে দুবাইয়ের এডিসিবি ব্যাংকে খোলা একটি হিসাবে ২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার স্থানান্তরের জন্য এবি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন। তাদের মৌখিক নির্দেশ পেয়ে ব্যাংকটির ট্রেজারি শাখার কর্মকর্তা নুরুল আজিম ২০১৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ৫ মিলিয়ন ডলার, ১২ ফেব্রুয়ারি ৫ মিলিয়ন ডলার, ১৩ ফেব্রুয়ারি ১০ মিলিয়ন ডলারসহ মোট ২০ মিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৬৫ কোটি টাকা) পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। তিনি এবি ব্যাংকের ওবিইউ ইপিজেড, চট্টগ্রাম থেকে দুবাইয়ের এডিসিবি ব্যাংকের ওই হিসাবে টাকা পাঠানোর জন্য ব্যাংকটির অপর কর্মকর্তা মোহাম্মদ লোকমানকে ই-মেইলের মাধ্যমে আদেশ দেন। সে অনুযায়ী মোহাম্মদ লোকমান এডিসিবি ব্যাংকের ওই হিসাবে তিনটি ট্রানজেকশনের মাধ্যমে ২০ মিলিয়ন ডলার পাঠিয়ে দেন। পরবর্তী সময়ে ওই হিসাব থেকে পে-অর্ডারের মাধ্যমে সমুদয় টাকা উত্তোলন করে তারা আত্মসাৎ করেন। অনুসন্ধানে দেখা যায়, এডিসিবি ব্যাংকের ওই হিসাবে জমা হওয়া অর্থ তুলে নেয়ার পর হিসাবটি বন্ধ করে দেয়া হয়। এ ছাড়া সিঙ্গাপুরের কথিত পিজিএফ নামের কোম্পানিটিও ২০১৬ সালের ২৫ মে থেকে বন্ধ আছে।

মামলায় আরও বলা হয়, কথিত বিনিয়োগের কনসালটেন্সি হিসেবে ব্যাংকের গ্রাহক সাইফুল হকের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতারক চক্র অপর একটি হিসাব খুলে সে হিসাবে ২৫ হাজার মার্কিন ডলার একই প্রক্রিয়ায় হস্তান্তর করেন।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×