মনোনয়ন নিয়ে আ’লীগ-বিএনপিতে কোন্দল, স্বস্তিতে জাতীয় পার্টি

  মোস্তাক আহাম্মদ উজ্জল, নবীনগর ২৬ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ব্রাহ্মণবাড়িয়া

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে নবীনগর উপজেলা নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনে তৎপর রয়েছেন বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা। গণসংযোগের পাশাপাশি যোগ দিচ্ছেন সভা-সমাবেশে। ফেসবুকেও অনেকে সক্রিয়। প্রার্থীদের ছবিসংবলিত পোস্টার-ফেস্টুনও শোভা পাচ্ছে মোড়ে মোড়ে। তৃণমূলের সঙ্গে সংযোগ রক্ষার পাশাপাশি কেন্দ্রের সঙ্গেও যোগাযোগ বেড়েছে প্রার্থীদের। ভোটাররাও প্রার্থীদের নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। বিভিন্ন দলের প্রায় দেড় ডজন মনোনয়নপ্রত্যাশী এখন মাঠে। তবে নানা কারণে আগামী নির্বাচনে প্রার্থী নিয়ে শাসক দল আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিতে বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মনোনয়নের প্রত্যাশায় আওয়ামী লীগেরই ১২ জন প্রার্থী মাঠে সক্রিয়। বিএনপিতে এ সংখ্যা ৬। এদিক থেকে সুবিধাজনক অবস্থানে জাতীয় পার্টি- একজন প্রার্থী মাঠে। এ ছাড়া জাসদের (ইনু) একজন, ইসলামী ঐক্যজোটের একজন প্রার্থী গণসংযোগ করছেন। এলাকাটি জাতীয় পার্টির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল একসময়। বিশ্লেষকরা বলছেন, অভ্যন্তরীণ কোন্দল সত্ত্বেও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনে আগামী নির্বাচনে লড়াই হবে মূলত আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে।

নব্বইয়ের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ১৯টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনে প্রথম দফায় ১৯৯১ সালের ভোটে বিজয়ী হন জাতীয় পার্টির কাজী মো. আনোয়ার হোসেন। ১৯৯৬ সালের বিতর্কিত ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ী হন বিএনপি নেতা ও কেবিনেট সচিব সিদ্দিকুর রহমান। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে জয়লাভ করেন আওয়ামী লীগের আবদুল লতিফ, ২০০১ সালে প্রয়াত কাজী আনোয়ার হোসেন ‘ধানের শীষ’ নিয়ে এমপি হন। ২০০৮ সালে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে নৌকা প্রতীক নিয়ে বিজয়ী হন জাসদের (ইনু) অ্যাডভোকেট শাহ্ জিকরুল আহম্মদ। ২০১৪ সালের ভোটে আওয়ামী লীগের ফয়জুর রহমান বাদল এমপি হন। আগামী নির্বাচনেও তিনি শক্ত প্রার্থী।

তবে বর্তমান এমপি ফয়জুর রহমান বাদলের বিরুদ্ধে এলাকার ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা না করার অভিযোগ রয়েছে। ক্লিন ইমেজের অধিকারী বাদলের বিরুদ্ধে অভিযোগ- তিনি স্থানীয় কতিপয় লোককে সুবিধা দিচ্ছেন বেশি বেশি। এলাকার সঙ্গে যোগাযোগও রাখছেন কম। এসব নিয়ে তৃণমূলে ক্ষোভ রয়েছে। তবে আগামী নির্বাচনে মাঠ গুছিয়ে কাজে নামতে তার কিছুটা বেগ পেতে হবে বলে মনে করছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ। অভিযোগ রয়েছে, দলের মধ্য অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণে উপজেলা ও পৌর নির্বাচনে হেরে যায় আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা। এসব নিয়ে নানা কথা চালু রয়েছে।

আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে বর্তমান এমপি ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফয়জুর রহমান বাদল ছাড়াও রয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ মহানগর আওয়ামী যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৯নং ওয়ার্ডের কমিশনার একেএম মমিনুল হক সাঈদ, কেন্দ্রীয় কৃষক লীগের উপদেষ্টা ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য এবাদুল করিম বুলবুল, আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় উপকমিটির সহসম্পাদক ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি নিয়াজ মোহাম্মদ খান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট কাজী মোর্শেদ হোসেন কামাল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক ও আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় উপকমিটির সহসম্পাদক ব্যারিস্টার জাকির আহম্মদ, আওয়ামী লীগ নেতা ড. হুমায়ুন কবির, আওয়ামী লীগ নেতা ডা. এমএবি সিদ্দিক হেলাল, যুবলীগ নেতা জহির উদ্দিন সিদ্দিক টিটো, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপকমিটির সহসম্পাদক আরিফুল ইসলাম টিপু, উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক নুরুন্নাহার বেগম, কেন্দ্রীয় যুবলীগের সদস্য মো. আলামিনুল হক আলামিন।

এদিকে নবীনগর থেকে চারবারের নির্বাচিত এমপি বিএনপি নেতা মরহুম কাজী আনোয়ার হোসেনের ছেলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির সদস্য নাজমুল হোসেন তাপসের সক্রিয়তাকে দলের অনেকে ভালো চোখে দেখছেন না। অভিযোগ রয়েছে মূলত তাকে ঘিরেই শুরু হয়েছে বিএনপির কোন্দল। বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে মো. তকদির হোসেন জসিম এবং নাজমুল হোসেন তাপসকে ঘিরেই চলছে জল্পনা-কল্পনা।

বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন জাতীয়তবাদী কৃষক দল কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. তকদির হোসেন জসিম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী আজ্জম জালাল, ট্যাক্স ল’ ইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ও কেন্দ্রীয় বিএনপির নেতা গোলাম সারওয়ার, নবীনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার সফিকুল ইসলাম, নবীনগর উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি সায়েদুল হক সাঈদ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির সদস্য কাজী নাজমুল হোসেন তাপস, ইসলামী ঐক্যজোটের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হেফাজতে ইসলাম নবীনগর শাখার সভাপতি মাওলানা মেহেদী হাসান।

বিএনপির তকদির হোসেন জসিম বলেন, ‘নবীনগরের সাবেক এমপি কাজী আনোয়ার চারবার এমপি হয়েও চোখে পড়ার মতো কোনো উন্নয়ন করেননি। তার ছেলে কাজী তাপস মনোনয়নের জন্য কোমর বেঁধে নেমেছে। দলের জন্য মাঠপর্যায়ে কোনো কাজ না করে কিছু লোককে ম্যানেজ করে মনোনয়নের আশা ছেড়ে দিতে হবে। যিনি সব সময় নবীনগরবাসীর পাশে থাকবেন তিনিই হবেন বিএনপির প্রার্থী। কিছুসংখ্যক হাইব্রিড নেতার কারণেই নবীনগর বিএনপিতে যতসব কোন্দল।’ তকদির হোসেন জসিম ১৯৯৬ সালে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচন করে হেরে যান। কথা হয় বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী নাজমুল হোসেনের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, আমার পিতা এ আসনে চারবারের এমপি। নবীনগর বিএনপি ও দলের সব সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী আমার পাশে আছে। স্থানীয় বিএনপি আমার বাবাকে যেভাবে সহযোগিতা করেছে, আমাকেও সহযোগিতা করবে। মনোনয়ন পেলে আসনটি উদ্ধার করতে পারব। তবে আমার ব্যাপারে কারা কি বলল তাতে কিছু আসে যায় না। যারা বলে তাদেরকে নবীনগরের মানুষ লাল কার্ড দেখিছেন।

বিএনপির আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী সায়েদুল হক সাঈদ যুগান্তরকে বলেন, বিগত সময়ে দলের দুর্দিনে নেতাকর্মীদের পাশে ছিলাম। আশা করি হাইকমান্ড আমাকে মনোনয়ন দেবে।

আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী মমিনুল হক সাঈদ বলেন, ‘নবীনগর উপজেলা বিভিন্ন সময় উন্নয়নবঞ্চিত হয়েছে। নবীনগর একটি ঐতিহ্যবাহী উপজেলা। দল যদি মনোনয়ন দেয় তাহলে নবীনগরের মানুষের সব মৌলিক অধিকার রক্ষা করে একটি আধুনিক উপজেলা হিসেবে উপহার দেব।’ তিনি মসজিদ, মন্দির, স্কুলসহ সেবামূলক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আর্থিক অনুদান দিয়ে মাঠে তৎপর রয়েছেন।

জেলা আওয়ামী লীগ নেতা ব্যারিস্টার জাকির আহম্মদ বলেন, ‘এমপি বাদল সাহেব নবীনগরের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কোনোরকম যোগাযোগ করেন না, সংসদে যান না। তাহলে নবীনগরের উন্নয়ন হবে কিভাবে? নবীনগরবাসী চায়, আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট আবদুল লতিফের মতো সেবকের ভূমিকায় কাজ কববে। আগামী নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত।’

জানতে চাইলে ফয়জুর রহমান বাদল এমপি বলেন, ‘ব্যবসায়ীক ব্যস্ততায় অনেক সময় ফোন রিসিভ করতে পারি না তা ঠিক, কিন্তু নবীনগরবাসীর জন্য আমার ঢাকার রাজনৈতিক অফিসে বিকাল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত নিয়মিত সময় দিচ্ছি। নবীনগরের কোনো নেতাকর্মীর সঙ্গে আমার দূরত্ব নেই। নবীনগর আওয়ামী লীগের কোন্দল রয়েছে এটাও সঠিক নয়। মনোনয়নপ্রত্যাশী ও কতিপয় নেতা কোন্দল আছে বলে এলাকায় বলে বেড়াচ্ছেন। নেত্রী (শেখ হাসিনা) যাকে মনোনয়ন দেবেন, আমি তাঁর পক্ষে জানমালে কাজ করব।

আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী ইসলামী ঐক্যজোটের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হেফাজতে ইসলাম নবীনগর শাখার সভাপতি মাওলানা মেহেদী হাসান বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সঙ্গে হেফাজতে ইসলামের আপস হওয়ায় আশা করি মহাজোট থেকে আমি মনোনয়ন পাব। নবীনগরে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছি। মানুষ আমাকে ভালোবাসেন।’

মনোনয়নের দিক থেকে স্বস্তিতে আছে জাতীয় পার্টি। দলের একমাত্র প্রার্থী হচ্ছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের উপদেষ্টা কাজী মামুনুর রশিদ। তিনি বলেন, ‘নবীনগরে জাতীয় পার্টিকে শক্তিশালী অবস্থানে আনতে প্রতিটি ওয়ার্ড ও ইউনিয়নে দফায় দফায় গিয়ে কাজ করেছি। প্রতিটি সংসদ নির্বাচনে নবীনগরে জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা অনেক ভোট পেয়ে থাকে। নবীনগর থেকে জাতীয় পার্টি দু’বার নির্বাচিত হয়। আশা করছি আগামী নির্বাচনে জাতীয় পার্টি হারানো আসনটি বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে ফিরে পাবে।’

জাসদের প্রভাবশালী নেতা ক্লিন ইমেজের শাহ জিকরুল আহামেদ খোকনের প্রতি এলাকাবাসীর বিশ্বাস ও ভরসারও কমতি নেই। জিকরুল আহমেদ বলেন, ‘আমি মহাজোট থেকে মনোনয়ন পাব নিশ্চিত। মাঠপর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছি। ফয়জুর রহমান বাদলের সঙ্গে এখন আমার কোনো দ্বন্দ্ব নেই। গত সংসদ নির্বাচনের আগে আমি বাদলকে শিক্ষকের ছেলে বিধায় ছাড় দিয়ে মনোনয়নে সহযোগিতা করেছি। এবার আমি নিজেই প্রার্থী।’

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×