পিরোজপুর-৩: কোন্দলে আ’লীগ-বিএনপি মাঠে রুস্তম আলী ফরাজী

  আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল ব্যুরো ও আব্দুস সালাম আজাদী, মঠবাড়িয়া ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পিরোজপুর-৩: কোন্দলে আ’লীগ-বিএনপি মাঠে রুস্তম আলী ফরাজী
পিরোজপুর-৩: কোন্দলে আ’লীগ-বিএনপি মাঠে রুস্তম আলী ফরাজী

নেতৃত্বের দ্বন্দ্বের জেরে আগামী নির্বাচনে ডজনখানেকেরও বেশি প্রার্থী নিয়ে বিপাকে মঠবাড়িয়া উপজেলা নিয়ে পিরোজপুর-৩ আসনে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি।

সবশেষ ২০১৪ সালের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে এমপি নির্বাচিত ডা. রুস্তম আলী ফরাজী এবার দলীয় ব্যানারে নির্বাচনের আশায় সম্প্রতি ফের যোগ দিয়েছেন তারই পুরনো দল জাতীয় পার্টিতে।

বিশেষ করে নব্বইয়ের পটপরিবর্তনের পর মোটা দাগে ৫টি নির্বাচনের মধ্যে তিনবারই এমপি হন রুস্তম আলী ফরাজী। দলবদলে অভিজ্ঞ এই রাজনীতিক আগামী নির্বাচনে লাঙ্গল প্রতীকে মহাজোটের শক্ত প্রার্থী।

১৯৯১ সালে এ আসন থেকে এমপি হন আ’লীগের তৎকালীন প্রেসিডিয়াম সদস্য মহিউদ্দিন আহম্মেদ। ১৯৯৬ সালে জাতীয় পার্টি থেকে এমপি হন রুস্তম আলী ফরাজী। ২০০১ সালের নির্বাচনে দল বদল করে বিএনপিতে যাওয়া ফরাজী ফের এমপি হন।

তবে ২০০৮ সালে রুস্তম ফরাজীকে হারিয়ে নৌকা প্রতীক নিয়ে এমপি হন পিরোজপুর জেলা আ’লীগের সহসভাপতি ডা. আনোয়ার হোসেন। তিনি পান ৫৯ হাজার ৬শ’ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ফরাজী পান ৩৫ হাজার ভোট।

২০১৪ সালে বিএনপিবিহীন নির্বাচনে বিএনপি থেকে ছিটকে পড়া রুস্তম ফরাজী ২৯ হাজার ৩৪২ ভোট পেয়ে এমপি হন। নৌকা নিয়ে ডা. আনোয়ার হোসেন পান ২৫ হাজার ৪০৯ ভোট।

একটি পৌরসভা ও ১১টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এ আসনে আওয়ামী লীগের ৮ জন বিএনপির ৬ জন এবং জাতীয় পার্টির একজন প্রার্থী মাঠে সক্রিয়। এদের সবাই দলীয় মনোনয়ন ফরম ক্রয় ও জমা দিয়েছেন।

মঠবাড়িয়ায় আ’লীগ বেশ শক্তিশালী। এরপরও ’৯৬ সালে আ’লীগের প্রভাবশালী নেতা মহিউদ্দিন আহম্মেদকে হারতে হয়েছে। পরের দফায়ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী এই দলটিকে পরাজিত হতে হয়।

২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনেও পরাজিত হয় আ’লীগ। অভিযোগ রয়েছে, দলীয় কোন্দলের কারণেই পিরোজপুর-৩ আসনে আ’লীগকে বারবার হারতে হয়েছে। সেই কোন্দলের অবসান হয়নি। নানারূপে তা রয়েই গেছে। এ কোন্দল ভোটের দিন পর্যন্ত থাকলে দলকে কঠিন মূল্য দিতে হবে।

গত উপজেলা নির্বাচন-উত্তর যুবলীগ কর্মী লিটন পণ্ডিত হত্যার ঘটনা তারই জের। অভিযোগের তীর স্থানীয় রাজনীতিতে নবাগত উপজেলা চেয়ারম্যান আশরাফুর রহমানের দিকে।

উপজেলার অধিকাংশ চেয়ারম্যান আশরাফুরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির লিখিত অভিযোগ দেয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে। জেলা প্রশাসনের তদন্তে প্রমাণও মেলে। আগামী নির্বাচনে আশরাফুর রহমানও দলের মনোনয়ন চাচ্ছেন।

বিএনপিতেও রয়েছে দ্বন্দ্ব-কোন্দল। নবম সংসদ নির্বাচন ও উপজেলা কমিটি নিয়ে দুই ভাগে বিভক্ত দল।

বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন- কর্নেল (অব.) শাহজাহান মিলন এবং জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমীন দুলাল, মৎস্যজীবী দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রফিকুল ইসলাম মাহাতাব, জেলা বিএনপির বিশেষ সম্পাদক এবং মঠবাড়িয়া পৌর বিএনপির সভাপতি কেএম হুমায়ুন কবির, কৃষক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক জামাল উদ্দিন খান মিলন, তারিকুল ইসলাম জহির এবং ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির সদস্য এমএজি আলিম।

জাতীয় পার্টি থেকে এ আসনে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন মাত্র একজন। তিনি হচ্ছেন বর্তমান এমপি ডা. রুস্তম আলী ফরাজী।

কথা হয় উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন দুলালের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে বিএনপির বিজয় সুনিশ্চিত। আমিই একমাত্র ব্যক্তি যে, হামলা, মামলার শিকার হয়েও এলাকা ছেড়ে যাইনি। দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে কেন্দ্রের সব কর্মসূচি পালন করেছি। দলীয় মনোনয়ন পেলে আন্দোলনের ফসল ঘরে তুলতে পারব।’

বিএনপির আরেক সম্ভাব্য প্রার্থী কর্নেল (অব.) শাহজাহান মিলন সাম্প্রতিক সময়ে দলীয় কর্মকাণ্ডে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ায় সবশেষ জাতীয় সম্মেলনে কেন্দ্রীয় কমিটি থেকেও বাদ পড়েছেন তিনি।

জানতে চাইলে শাহজাহান মিলন যুগান্তরকে বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ আমি দলীয় মনোনয়ন পাব। দলের জন্য কাজ করেছি এবং করছি। এলাকার মানুষ আমাকে ভালোবাসে। তারা আমার পাশে থাকবে।’ বিএনপি নেতা হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আন্দোলন সংগ্রামে মাঠে ছিলাম। জীবনের ঝুঁকি নিয়েও দলের জন্য কাজ করেছি। মামলার আসামি হয়েছি। অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করেছি। এসব কাজের মূল্যায়ন দল করবে এটুকুই আশা করছি। দল যে সিদ্ধান্ত দেবেন তাই-ই মাথা পেতে নেব।’

বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা বলেন, ‘জয়ের আশায় অন্য দলের লোক ধরে এনে এমপি বানিয়েছে কেন্দ্র। হালুয়া-রুটি খাওয়া শেষে তারা আবার দল ছেড়ে চলেও গেছে। এক্ষেত্রে অবজ্ঞা করা হয়েছে দলের ত্যাগী পরীক্ষিতদের। আগামী নির্বাচনেও যদি একই ঘটনা ঘটে তাহলে এখানে আর যাই হোক বিএনপির জয়লাভের কোনো সম্ভাবনা নেই।’

আ’লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা আ’লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মহিউদ্দিন মহারাজ, উপজেলা আ’লীগের সভাপতি ও পৌর মেয়র রফিউদ্দিন আহমেদ ফেরদৌস, সাবেক এমপি ও জেলা আ’লীগের সহসভাপতি ডা. আনোয়ার হোসেন, জেলা আ’লীগের সহসভাপতি ডা. এম নজরুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় যুবলীগের সহসম্পাদক তাজউদ্দিন আহমেদ, উপজেলা চেয়ারম্যান আশরাফুর রহমান, অ্যাড. শামসুন্নাহার ডলি এবং সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আ’লীগ সদস্য সাদিকুর রহমান।

কথা হয় রুস্তম আলী ফরাজীর সঙ্গে। যুগান্তরকে তিনি বলেন, ‘মঠবাড়িয়ার সাধারণ মানুষ আমাকে চেনে এবং ভালোবাসে। রাজনৈতিক জীবনে আমার কোনো কলঙ্ক নেই। কোনো অনিয়ম, দুর্নীতি, সন্ত্রাস করিনি। আশা করি এসব দিক বিবেচনা করে সাধারণ ভোটাররা আমার পক্ষে গণরায় দেবে।’

আ’লীগের আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী সর্বকনিষ্ঠ জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন মহারাজ মাঠে সক্রিয়। সবশেষ জেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পান সাবেক এমপি আ’লীগ নেতা অধ্যক্ষ মো. শাহ আলম।

বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটে জয়ী হন মহারাজ। ক্লিন ইমেজের এই নেতা আসন্ন ভোটযুদ্ধে ফ্যাক্টর হবেন নিঃসন্দেহে।

যুগান্তরকে মহারাজ বলেন, ‘দলের কাছে মনোনয়ন চাইব। জাতির জনকের স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণের কর্মী হিসেবে জননেত্রী শেখ হাসিনা যদি সুযোগ দেন তো নিশ্চিত বিজয় নিয়েই ঘরে ফিরব।’

প্রয়াত মহিউদ্দিন আহম্মেদের ভাগ্নে রফিউদ্দিন আহমেদ ফেরদৌস বলেন, ‘জনগণের ভালোবাসায় আমি পরপর তিনবার পৌর মেয়র নির্বাচিত হয়েছি। দলীয় মনোনয়ন পেলে বিজয়ের ধারা অব্যাহত রেখে নৌকার হারানো আসন উদ্ধার করব।’

ডা. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘৫ জানুয়ারির নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেলেও আমাকে হারানো হয়েছে। মনোনয়ন পেলে বিজয় সুনিশ্চিত ইনশাআল্লাহ।’

আ’লীগের আরেক প্রার্থী ডা. এম নজরুল ইসলাম জানান, ‘দীর্ঘদিন ধরে বিনামূল্যে লাখ লাখ মানুষকে চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছি। দলীয় মনোনয়ন পেলে জনগণ ভালোবেসে আমাকে তার প্রতিদান দেবে।’

তাজউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘স্কুলজীবন থেকেই ছাত্রলীগের রাজনীতিতে হাতেখড়ি। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান হয়েও রাজনীতি করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছি। দলীয় সভানেত্রীর কাছে মনোনয়ন চাইব। না পেলে যাকে মনোনয়ন দেয়া হবে তার পক্ষে কাজ করব।’

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×