রেলের গাছ কেটে কর্মকর্তাদের ফার্নিচার

আলামত নিশ্চিহ্ন করতে উপড়ে ফেলা হয়েছে মূল

  রাজশাহী ব্যুরো ২৭ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গাছ কাটা

পশ্চিম রেলের অফিসার্স কোয়ার্টারের কোটি টাকার অর্ধশত মেহগনি গাছ লোপাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রকাশ্যে নিলাম না করে ৩০ বছরের পুরনো এসব মেহগনি গাছ গোপনে কেটে ফার্নিচার বানাতে দিয়েছেন পশ্চিম রেলওয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা। গাছগুলো কেটে গাছের আলামত নিশ্চিহ্ন করতে মূলকাণ্ড উপড়ে ফেলা হয়েছে। এসব গাছের গোড়ামাটি দিয়ে ঢেকে ফেলা হয়েছে। কয়েকটি গাছের গুঁড়ি পুড়িয়েও আলামত নষ্টের চেষ্টা করেছে সংশ্লিষ্টরা। শুক্রবার শ্রীরামপুর এলাকার রেলকলোনি স্টাফ কোয়ার্টার এলাকা সরেজমিন ঘুরে রেলওয়ে কর্মকর্তাদের এসব অপকর্ম দেখেছেন গণমাধ্যম কর্মীরা।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, নগরীর শ্রীরামপুর এলাকায় রেলওয়ের স্টাফ কোয়ার্টার এলাকায় র‌্যাব-৫ এর একটি ফাঁড়ি ছিল। কিছু দিন আগে র‌্যাব-৫ এর সদর দফতর নগরীর মোল্লাপাড়া এলাকায় স্থানান্তর হলে কোয়ার্টারগুলোতে পশ্চিম রেলওয়ের জিএম ও প্রধান প্রকৌশলীসহ অন্য কর্মকর্তারা বসবাস করছিলেন। এলাকাবাসীসহ রেলওয়ের কর্মচারীরা জানান, কিছু দিন আগে থেকে রেলকলোনি নামে পরিচিত স্টাফ কোয়ার্টার ক্যাম্পাসে থাকা পুরাতন মেহগনি গাছগুলো একটি-দুটি করে কাটা শুরু হয়। মেহগনি গাছগুলো কাটার সময় কোয়ার্টারের মূল ফটক বন্ধ রাখা হতো। এভাবে গত এক মাসে স্টাফ কোয়ার্টার এলাকায় থাকা প্রায় অর্ধশত মেহগনি গাছ কেটে সাবাড় করা হয়েছে। এসব গাছ কেটে নিয়ে কর্মকর্তারা বাসাবাড়ির ফার্নিচার তৈরি করেছেন। কেউ কেউ এখনও এসব গাছের কাঠ দিয়ে ফার্নিচার বানাচ্ছেন।

শুক্রবার সরেজমিন গিয়ে আরও দেখা গেছে, মেহগনি গাছগুলোর গোড়া থেকে কেটে নেয়ার পর মূলকাণ্ডসহ উপড়ে ফেলে দেয়া হয়েছে। ফলে লোপাট করা গাছের প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণ সম্ভব হয়নি। কোয়ার্টারে বসবাসরত কয়েকজন কর্মচারী জানান, কোয়ার্টারের অভ্যন্তরে মেহগনি গাছ কাটা হয়েছে রাতের বেলা। এ সময় মূল ফটক বন্ধ রাখা হয়। কেটে নেয়া গাছের সংখ্যা জানার জন্য গাছের গুঁড়ির ঢেকে দেয়া অংশ শুক্রবার দুপুরে গুনে দেখা হয়। মোট ৫৮টি গুঁড়ির চিহ্ন পাওয়া গেছে। প্রমাণ ঢাকতে গর্তগুলোতে মাটি চাপা দেয়া হয়েছে। তবে কিছু চিহ্ন হারিয়ে গেছে। এ কারণে কেটে নেয়া গাছের প্রকৃত সংখ্যা কত তা বের করা সম্ভব হয়নি। আর কিছু বড় মেহগনি গাছের বড় কাণ্ড কেটে নেয়া হয়েছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, পশ্চিম রেলের কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের বসবাসের জন্য প্রায় ৩০ বছর আগে শ্রীরামপুর এলাকায় এ কোয়ার্টার নির্মাণ করা হয়। আর কেটে নেয়া মেহগনি গাছগুলো ওই সময় লাগানো হয়। এ হিসেবে গাছগুলোর বয়স কমপক্ষে ৩০ বছর হয়েছে। গাছগুলোর একেকটির আনুমানিক দাম এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা। ফলে অর্ধশত মেহগনি গাছের দাম কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে কর্মচারীরা জানান। এদিকে রেলকলোনির এই স্টাফ কোয়ার্টারসহ অভ্যন্তরে থাকা সব সম্পদ দেখভালের দায়িত্ব পালন করেন একজন উপনির্বাহী প্রকৌশলী। স্টাফ কোয়ার্টার ক্যাম্পাসের এতগুলো মেহগনি গাছ কে কেটে নিয়ে গেছে, জানতে চাইলে উপনির্বাহী প্রকৌশলী নাজিত কায়সার যুগান্তরকে বলেন, আজ শুক্রবার ছুটির দিন। এ ব্যাপারে মোবাইল ফোনে কিছু বলব না। বিষয়টি সম্পর্কে জানতে হলে রেলভবনে আমার দফতরে এসে যোগাযোগ করতে হবে। তবেই তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলবেন।

বিনা টেন্ডারে গাছ কাটা এবং কাটার আগে বন বিভাগের অনুমতি নেয়া হয়েছিলে কিনা- জানতে চাইলে উপসহকারী প্রকৌশলী বলেন, মেহগনি গাছ কাটার বিষয়টি সম্পর্কে মহাব্যবস্থাপক (জিএম) এবং প্রধান প্রকৌশলীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাই বলতে পারবেন। এ ব্যাপারে আমার কিছু বলার নেই। জিএম ও প্রধান প্রকৌশলী মেহগনি গাছগুলো কাটার নির্দেশ দিয়েছেন। কারা কেটেছে সেটাও তিনি বলতে পারেননি।

বিপুল সংখ্যক মূল্যবান মেহগনি গাছ লোপাট প্রসঙ্গে রাজশাহীর বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) সাজ্জাদ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, রেল কোয়ার্টারের মেহগনি গাছ কাটার ব্যাপারে বন বিভাগের কিছু জানা নেই। সরকারি বিধি অনুযায়ী, গাছ কাটতে হলে বন বিভাগের কাছে আগে আবেদন করতে হয়। বন বিভাগ গাছের সরেজমিন পরিস্থিতি দেখে মূল্য নির্ধারণের পর কাটার অনুমতি দেয়। তবে এ ধরনের কোনো আবেদন আমি পশ্চিম রেলের কাছ থেকে পাইনি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

গাছ কাটার জন্য প্রকাশ্যে নিলাম এবং আনুষঙ্গিক বিধিবিধান অনুসরণ করা হয়েছে কিনা- এ ব্যাপারে পশ্চিম রেলের প্রধান এস্টেট কর্মকর্তা আবদুল মান্নান বলেন, আমি একটি বিয়ের দাওয়াতে এসেছি। আর এ ব্যাপারটি দেখভালের দায়িত্বে রয়েছে প্রকৌশল বিভাগ। বিষয়টি সম্পর্কে জানতে হলে তাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তবে অফিস চলাকালীন যোগাযোগের জন্য তিনি এ প্রতিবেদককে পরামর্শ দেন।

অন্যদিকে বিপুলসংখ্যক মেহগনি লোপাটের ব্যাপারে জানতে পশ্চিম রেলওয়ের জিএম খায়রুল আলম ও প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন ধরেননি। রেলওয়ে কর্মচারীদের অনেকেই বলেছেন, এসব গাছ গোপনে কেটে নিয়ে পশ্চিম রেলওয়ের বড় কর্মকর্তারা ভাগাভাগি করেছেন। তারা নিজের বাসাবাড়ি ও অনেকেই গ্রামের বাড়িতেও মেহগনি কাঠ পাঠিয়েছেন। পুরো বিষয়টি তদন্ত করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি করেছেন তারা।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×