হলফনামায় অসঙ্গতি পেলে কঠোর ব্যবস্থা

দুদক চেয়ারম্যান

  যুগান্তর রিপোর্ট ০৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

হলফনামায় অসঙ্গতি পেলে কঠোর ব্যবস্থা

নির্বাচনে কালো টাকার ব্যবহার ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেছেন, হলফনামায় কোনো ধরনের অসঙ্গতি পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। বৃহস্পতিবার গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন।

দুদক সদর দফতরে আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় দুদক কমিশনার ড. মো. মোজাম্মেল হক খান, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, একুশে টিভির মনজুরুল আহসান বুলবুল, এনটিভির খায়রুল বাশার মুকুল, প্রথম আলোর আবদুল কাউয়ুম, কালের কণ্ঠের ইমদাদুল হক মিলন, এসএ টিভির খ ম হারুন, একাত্তর টিভির মোজাম্মেল বাবু, এটিএন বাংলার জ ই মামুন, সমকালের মুস্তাফিজ শফি, মানবজমিনের শামীমুল হক, সিনিয়র সাংবাদিক রাহুল রাহা, আশিষ সৈকত ও মঞ্জুরুল হক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

হলফনামা নিয়ে দুদকের ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন, সবকিছু সত্য বলতে হবে। সব দেশে জনগণের প্রত্যাশা থাকে নেতার চরিত্র যেন পবিত্র হয়। আমাদের দেশেও নেতার নেতৃত্বে অবশ্যই সততা ও জবাবদিহিতা থাকতে হবে। এজন্য নির্বাচনের আগেই বলেছিলাম যারা হলফনামায় তথ্য দেবেন, তা যেন সঠিক হয়। হলফনামা পাবলিক ডকুমেন্ট। আমাদের গোয়েন্দা ইউনিট প্রতিটি হলফনামা ডাউনলোড করছে। তবে কী করব, তা ভবিষ্যৎ বলবে। আমরা বই আকারে সব সংরক্ষণ করছি। সরকারি, বেসরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধান সংস্থায় জমা দেয়া প্রার্থীদের স্টেটমেন্টও সংগ্রহ করা হচ্ছে। মিলিয়ে দেখে তথ্যে অসঙ্গতি পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মাথায় পচন ধরলে শরীর বাঁচানো কঠিন এবং সে চেষ্টা করা বৃথা। তাই রাজনৈতিক স্পষ্টতা, জবাবদিহিতা, প্রতিজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও সততা না থাকলে দেশ থেকে দুর্নীতি দূর করা কঠিন।

নির্বাচনে কালো টাকার ব্যবহার ঠেকাতে দুদক পদক্ষেপ নিচ্ছে জানিয়ে চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন, এরই মধ্যে কমিশনের ইন্টেলিজেন্সি টিমকে বিশেষ নির্দেশনা দিয়ে মাঠে পাঠানো হয়েছে। কেউ চায় না নির্বাচনে কালো টাকা ব্যবহার হোক। এজন্য ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে গাইডলাইন দেয়া হয়েছে।

তবে এখন এটি প্রকাশ করা হবে না। একটি উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, কে কতগুলো গরু জবাই করলেন, কীভাবে প্রচার-প্রচারণা চালালেন, কতগুলো রঙিন পোস্টার বানালেন ইত্যাদি ইন্টেলিজেন্স ইউনিট সংগ্রহ করে তালিকা তৈরি করছে। এর ভিত্তিতে আইন অনুসারে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তিনি বলেন, ফ্ল্যাট এবং প্লটেও কালো টাকা চলে যাচ্ছে। বিষয়টি দুদক অবহিত। সরকারের কাছে বেশকিছু সুপারিশ পাঠানো হয়েছে। সরকার এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে বলে দুদক প্রত্যাশা করে। তবে কালো টাকা বিনিয়োগ হলে কর্মসংস্থানে ভূমিকা রাখতে পারত।

ঋণখেলাপি প্রসঙ্গে চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন, বিষয়টি আমাদের নয়, ব্যাংকের। এজন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের অডিট রিপোর্ট দিতে হবে। অনেকে আছেন, যারা এনবিআরকে এক রকম ও ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে ভিন্ন রকম অডিট রিপোর্ট দেন। এসব জালিয়াতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির যে ব্যাখ্যা দিয়েছে, তা দুর্নীতি নয়। এমনকি টিআইবিও যে ব্যাখ্যা দিয়েছে তা-ও দুর্নীতি নয়। নিজের বিবেক যাতে সাড়া দেয় না, বিবেকের বিরুদ্ধে যা করা, তা-ই দুর্নীতি।

বিদ্যমান সিস্টেমে অনেকে দুর্নীতি করতে বাধ্য হচ্ছেন জানিয়ে ইকবাল মাহমুদ বলেন, দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চিহ্নিত করে তাদের আমলনামা সংগ্রহ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, দুর্নীতি কিছুটা কমলেও কাক্সিক্ষত মাত্রায় কমেনি। আর দুর্নীতি বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুশাসন, বিচারিক ব্যবস্থা, সমৃদ্ধি, উন্নয়ন এমনকি গণতন্ত্রকেও ম্লান করে দিচ্ছে। তিনি জানান, তিন বছরে ৬০০ জনের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে দুদক। ঘুষ নেয়া অর্ধশতাধিক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। ‘স্বামীর চেয়ে স্ত্রীরা বেশি সম্পদশালী’ প্রসঙ্গে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, সত্যি বলতে কী! নারীর কারণে অনেক মামলা আটকে আছে। স্বামীরা স্ত্রীর নামে সম্পদ দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছেন। আমরা খালি চোখেই বুঝতে পারছি স্ত্রীরা নির্দোষ, কিন্তু কিছুই করার থাকছে না। তাদের কাছে সম্পদের বিষয় জানতে চাইলে অধিকাংশ স্ত্রীই বলছেন- ‘তারা কিছুই জানেন না।’

এর আগে লিখিত বক্তব্যে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ জানান, কমিশন ১২ বছরে (২০০৭ থেকে ২০১৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত) ৫ হাজার ৮৯টি মামলা হয়েছে। একই সময়ে ৫ হাজার ৫২০টি মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে (বিলুপ্ত দুর্নীতি দমন ব্যুরো আমলের মামলাসহ)। ১০ বছরে (২০০৯ থেকে ২০১৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত) ১ হাজার ৩২১টি মামলায় আসামিদের বিচারিক আদালতে সাজা হয়েছে (বিলুপ্ত দুর্নীতি দমন ব্যুরো আমলের মামলাসহ)। কমিশনের মামলা সাজার হার ২০১৭ সালে ছিল ৬৮ ভাগ। এ সাজার হার ক্রমাগত বাড়ছে। কমিশন কেন্দ্রীয়ভাবে প্রতিটি মামলা মনিটরিং করছে। মামলার বাদী, সাক্ষী এবং প্রসিকিউটরদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হচ্ছে।

এছাড়া কমিশনের অনুসন্ধান/তদন্ত এবং প্রসিকিউশন কার্যক্রম ডিজিটালাইজড করার জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সহযোগিতায় একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। কমিশনের প্রত্যাশা শতভাগ মামলায় সাজা দেয়া। এক্ষেত্রে কমিশনের সক্ষমতার ঘাটতিকে আমরা অন্যসব আনুষঙ্গিক কারণের পাশাপাশি একটি কারণ হিসেবে মনে করি। আমরা আমাদের প্রতিষ্ঠানের ত্রুটি-বিচ্যুতি প্রকাশে ন্যূনতম কুণ্ঠাবোধ করি না। তিনি বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশনে মানুষ প্রতিনিয়তই অভিযোগ জানাচ্ছে। শুধু গত বছরই কমিশন প্রায় ১৮ হাজার লিখিত অভিযোগ পেয়েছে। এ বছরও নভেম্বর পর্যন্ত ১২ হাজার ২২৭টি অভিযোগ পাওয়া গেছে। ২০১৭ সালের ২৭ জুলাই থেকে ৩০ নভেম্বর ২০১৮ পর্যন্ত কমিশনের অভিযোগ কেন্দ্রের হটলাইন ১০৬-এ অভিযোগ জানাতে ১৯ লাখ ৪৪ হাজার ২২০টি ফোন কল এসেছে। এতে আমাদের মনে হয়- দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের দৃঢ় অবস্থান রয়েছে। মানুষ দুর্নীতিপরায়ণদের মন থেকে ঘৃণা করে। দুর্নীতি এমন অপরাধ, যা খুব বেশিদিন লুকিয়েও রাখা যায় না। এ অপরাধ তামাদি হয় না। এটি প্রকাশ হবেই।

ঘটনাপ্রবাহ : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×