অযত্ন-অনাদরে ছিল শিশু সাফায়েত

জ্বর শরীরে শিশুটিকে মারধর করেন বাবা

  যুগান্তর রিপোর্ট ০৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অযত্ন-অনাদরে ছিল শিশু সাফায়েত

অকালে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়া আড়াই বছর বয়সী শিশু নূর সাফায়েত অনাদর-অযত্নে ছিল। মাদকাসক্ত বাবার ঘর ছেড়ে মা চলে যাওয়ার পর শিশু সাফায়েতকে দেখার তেমন কেউ ছিল না।

সাফায়েত তার সাড়ে তিন বছরের ভাই সুরায়েতের সঙ্গে বাসাতেই খেলত। তাদের বাবা নুরুজ্জামান কাজলের সঙ্গে মা মালিহা আক্তার প্রিয়ার সম্পর্কের অবনতির শিকার হয়েছে শিশুটি।

স্বামীর বেপরোয়া মাদক গ্রহণের কারণে কোলের দুই সন্তানকে রেখে ঘরত্যাগ করেন মালিহা। একবারও খোঁজ নিতে আসেননি দুই সন্তান কেমন আছে। তারা কী খাচ্ছে। বুধবার রাজধানীর বাংলামোটরে ছয় ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস অভিযানের পর শিশুসন্তানের লাশ নিয়ে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করা বাবা কাজল জিজ্ঞাসাবাদে নানা তথ্য দিয়েছেন।

কাজল জানান, সন্তানের মা ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার পর বাচ্চাদের তিনিই দেখাশোনা করতেন। শিশুরা বাসাতেই থাকত। কদিন আগে ছোট ছেলে সাফায়েত জ্বরে আক্রান্ত হয়। তাকে ডাক্তার দেখানো হয়নি। তিনি অকপটে স্বীকার করেন, জ্বরের মধ্যেই মঙ্গলবার রাতে সাফায়েতকে মারধর করেন তিনি।

কারণ দুই ভাই মিলে বাসায় চিৎকার করছিল। কাজল আরও বলেন, তার স্ত্রী মালিহা চলে যাওয়ার পর থেকেই শিশুরা তাকে সব সময়ই আঁকড়ে ধরে থাকে। সন্তানদের সামনেই নেশা করতেন। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে নেশাদ্রব্য গ্রহণ করে আসছেন।

নিয়মিত মরণব্যাধি ইয়াবা নিতেন তিনি। এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মারুফ হোসেন সরদার যুগান্তরকে বলেন, অকালে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়া শিশু সাফায়েতের বাবা নুরুজ্জামান কাজল জিজ্ঞাসাবাদে অসংলগ্ন তথ্য দিচ্ছেন।

তিনি বলেন, দুই শিশুর কেউ সুস্থ নয়। সুরায়েত নামে যাকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, সে-ও অপুষ্টির শিকার। শিশু দুটি যেভাবে বেড়ে ওঠার কথা, সে ধরনের আলো-বাতাস, øেহ, মায়া-মমতা কিছুই পায়নি। বদ্ধঘরে নোংরা পরিবেশে সারাক্ষণ ছিল তারা। তাদের খোঁজখবর নেয়ার লোক ছিল না। তাদের বাবার ভয়ে কেউ শিশুদের কাছে আসত না। মাদকাসক্ত কাজলের সঙ্গে স্বজনদেরও রয়েছে দূরত্ব।

বাংলামোটরের রুদ্ধশ্বাস অভিযানে উদ্ধার সুরায়েতের কাছেও পুলিশ বিভিন্ন তথ্য জানার চেষ্টা করেছে। শিশুটি জানায়, ঘটনার আগের রাতে বাবা তাকেও মেরেছে। তার ভাই সাফায়েত জ্বরে ভুগছিল। বাবা তাকেও মারধর করে। রাতে তার বাবা ভাংচুর করেছে বাসার আসবাবপত্র।

বুধবার লাশ উদ্ধারের ঘটনার পর বাসাটির ভেতরে গেলে একধরনের ধ্বংসস্তূপের চিত্র দেখা যায়। ঘরের সব আসবাবপত্র ছিল ভাঙা। মেঝেতে পড়েছিল ঘরের জিনিসপত্র। জিজ্ঞাসাবাদে কাজলকে পুলিশ প্রশ্ন করেছিল, সাফায়েতের অসুস্থতা ও জ্বরের পরও কেন ডাক্তারের কাছে নেয়া হয়নি?

জবাবে কাজল বলেন, আর কয়েকদিন পরই ডাক্তারের কাছে নিতেন। শিশুটিকে হত্যা করা হয়েছে- এর উত্তরে কাজল বলেন, না হত্যা করিনি। তবে আগের রাতে মেরেছি। তখন খুব জ্বর ছিল বাবুর গায়ে। সকালে গায়ে হাত দিয়ে দেখি, বাবু আর নড়াচড়া করছে না। অনেকবার নাকের কাছে হাত দিয়েছি। কোনো শ্বাস-প্রশ্বাস নেই। তারপর হতভম্ব হয়ে যান বলে জানান কাজল।

অভিযোগ রয়েছে, বাংলামোটর লিংক রোডের ১৬ নম্বর বাসায় আড়াই মাস ধরে দুই শিশুসন্তানকে জিম্মি করে রেখেছিলেন বাবা নুরুজ্জামান কাজল। তার স্ত্রী, মা এবং তিন ভাইসহ সব স্বজনকে পাঁচ ইউনিটের ওই বাসা থেকে তিনি বের করে দেন। এ ব্যাপারে একবার জিডিও করা হয়েছিল বলে জানান সাফায়েতের মা মালিহা। পুলিশের রমনা বিভাগের এসি ইহসানুল ফেরদৌস বলেন, শিশুটির বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে পরিবারের যে ধরনের দায়িত্ব ছিল, তা পালন করা হয়নি। অকালে শিশুটির চলে যাওয়ার কারণ জানতে তার বাবা কাজলকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আমরা সব ধরনের বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছি।

তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর : শিশু সাফায়েত হত্যা মামলায় তার বাবা নুরুজ্জামান কাজলের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর হাকিম ধীমান চন্দ্র মণ্ডল আসামির জামিন নাকচ করে রিমান্ডের এ আদেশ দেন।

আসামিকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিলেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শাহবাগ থানার এসআই চম্পক চক্রবর্তী। পরে উভয়পক্ষের শুনানি শেষে আদালত আসামির জামিন নাকচ করে আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে যে কোনো তিন কার্যদিবস রিমান্ডের আদেশ দেন।

এদিন বিকাল ৩টার দিকে আদালতের এজলাসে আসামিকে নিয়ে আসা হয়। এর কিছুক্ষণ পরই আসামি সাংবাদিকদের বলেন, আমি হত্যা করেনি। বাচ্চার জ্বর ছিল। বাচ্চা ঘুমের মধ্যেই মারা গেছে।

এর আগে বুধবার রাজধানীর বাংলামোটরে রুদ্ধশ্বাস ৬ ঘণ্টা অভিযানের পর শিশু সাফায়েতের লাশ নিয়ে আত্মসমর্পণ করেন বাবা নুরুজ্জামান কাজল। এ ঘটনায় শিশুর মা মালিহা আক্তার প্রিয়া স্বামীর বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় হত্যা মামলা করেন।

ঘটনাপ্রবাহ : বাংলামোটরে বাবার হাতে ছেলে খুন

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×