নাগরিক সংলাপে বক্তারা

উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও সুশাসনের সমন্বয় করতে হবে

  যুগান্তর রিপোর্ট ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সালেহ,

রাজনৈতিক সংস্কৃতি পেছনে ফেলে অর্থনৈতিক উন্নতিতে কোনো লাভ হবে না। জিডিপি প্রবৃদ্ধি হলেও মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। একই সঙ্গে আয় ও বৈষম্যের মধ্যে ব্যবধান ব্যাপক হারে বাড়ছে। এ জন্য আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হওয়া প্রয়োজন। এ নির্বাচনে দুই ধরনের পরীক্ষা হবে। এছাড়া রাজনৈতিক দল গঠনের কোনো বিধি-বিধান না থাকায় যে যার মতো দল গঠন করছে। এতে রাজনৈতিক দলগুলো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাচ্ছে না। উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও সুশাসনের সমন্বয় করতে হবে। শনিবার রাজধানীতে এক নাগরিক সংলাপে বক্তারা এসব বলেন।

শেরেবাংলা নগরের এলজিইডি মিলনায়তনে ‘মিডল ইনকাম উইথ কোয়ালিটি অ্যান্ড ডিগনিটি : সিভিক ডায়লগ এন এজেন্ডা ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক নাগরিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্স সেন্টার (পিপিআরসি) এবং ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার্স অব কমার্স, বাংলাদেশ (আইসিসিবি) যৌথভাবে এ সংলাপের আয়োজন করে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবং পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংলাপে অংশ নেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা প্রফেসর ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ, ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন, ট্যারিফ কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর এমএ তসলিম, সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি আবুল কাসেম খান, আইসিসিবির সভাপতি মাহবুবুর রহমান, মেট্রোপলিটন চেম্বার্স এবং কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সাবেক সভাপতি নাসিম মঞ্জুর, পাঠাও-এর চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার ফাহিম আহমেদ, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম কাদের প্রমুখ। আইসিসিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট রোকেয়া আফজাল, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সাবেক সচিব রীতি ইব্রাহিম, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধি হলেও মানসম্মত কর্মসংস্থানের প্রকট সংকট রয়েছে। এর জন্য গভীর সংস্কার প্রয়োজন। তিনি বলেন, নির্বাচনী আয়োজনে দু’ধরনের পরীক্ষা রয়েছে। একটি হল- রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য জনগণের ভোটের পরীক্ষা। অন্যটি হল নির্বাচন ব্যবস্থাপনা বা পরিচালনার পরীক্ষা। এ দুই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।

তিনি বলেন, বর্তমানে অর্থনীতির যে অবস্থা তাতে ব্যবসা স্বাভাবিক গতিতে চললেও ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে দিক পরিবর্তন করতে হবে। নাগরিক সক্রিয়তার অন্যতম উপাদান বজায় রাখতে হবে। তিনি বলেন, অবকাঠামো খাতে যথেষ্ট বিনিয়োগ হলেও সুফল আসছে না। বরং চলাচলের গতি কমেছে, ধকল বাড়ছে। অর্থাৎ এ খাতে বিনিয়োগ হলেও ফলাফল আসছে না।

ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, কয়েক দিন আগে অর্থমন্ত্রী বললেন উন্নয়নের মহাসড়কে রয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু এসব কথা বাতুলতা মাত্র। কেন না, মহাসড়কে যেতে হলে একটি ফিটনেসসম্পন্ন গাড়ি, একজন দক্ষ চালক এবং কিছু নীতি ও রেগুলশন দরকার। এর কোনোটাই এখন বাংলাদেশে নেই। তিনি বলেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে। বিভিন্ন খাতে বিকৃত প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও সুশাসনের সমন্বয় করতে হবে। ব্যাংকিং খাতে ‘রকেট সাইন্সের’ দরকার নেই। কারা করছেন, কি করছেন সবাই জানে। শুধু কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া দরকার।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার বি. জে. (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, নির্বাচন কমিশন এখন আর আগের মতো কাজ করতে পারছে না। প্রতিষ্ঠানটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতায় ভুগছে। কদিন আগে সিইসি বলেছেন, তিনি মর্মাহত এবং বিব্রত। এমন কথা আমি আগে কখনও শুনিনি। এখানকার প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থা শক্তিশালী নয়। এ জায়গাটা দুর্বল। রাজনৈতিক দলগুলো যেভাবে চলছে, ইসিও সেভাবে চলছে। ফলে নির্বাচনের পরিবেশ এখন পর্যন্ত ভালো। কিন্তু দু’দিন পর তা থাকবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে। নির্বাচনই বা কি হবে সেটাও আমরা বলতে পারি। অথচ নেপাল, ভুটানের মতো দুর্বল ছোট দেশগুলোর নির্বাচন কমিশনও অনেক বেশি কার্যকর। আর ভারতের নির্বাচনসহ অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো আরও বেশি কার্যকর ও শক্তিশালী। রাজনৈতিক পরিবেশ ঠিক না থাকলে ৭ দশমিক ৮ শতাংশের প্রবৃদ্ধি কোনো কাজে আসবে না।

তিনি আরও বলেন, এ দেশে রাজনৈতিক দলগুলো চলে বেসরকারি খাতের মতো। সংবিধানেও রাজনৈতিক দল নিয়ে তেমন কিছু বলা নেই। ফলে অসংখ্য রাজনৈতিক দল গড়ে উঠছে। তবে পলিটিক্যাল ইন্সটিটিউশন বলে কোনো কিছু গড়ে উঠছে না। এতে রাজনৈতিক অবস্থা পিছিয়ে পড়ছে। রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে পিছিয়ে রেখে অর্থনৈতিক উন্নয়ন করলে লাভ হবে না।

মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, সাধারণত প্রবৃদ্ধি বাড়লে বৈষম্য বৃদ্ধি পায়। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, এক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কিছু নেই। বর্তমানে দশমিক ৪৮ শতাংশ আয়বৈষম্য বিপজ্জনক অবস্থানের কাছাকাছি আছে। বিশ্বব্যাংকের সুশাসন ইনডেক্সের নিচের দিকে আমরা আছি। এর মধ্যে দুর্নীতি, রাজনৈতিক সহিংসতা, রেগুলেটরি কোয়ালিটি সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে। এক্ষেত্রে নজর দিতে হবে। তরুণদের দক্ষতা কাজে লাগানো জরুরি। বাজার উপযোগী শিক্ষায় নজর দিতে হবে।

ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ বলেন, নির্বাচন জনগণের চোখে অবশ্যই সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হওয়া প্রয়োজন- যা নির্বাচিত সরকারকে বৈধতা দেবে। দ্রুত প্রবৃদ্ধির জন্য বৈষম্য অবধারিত নয়। সুশাসন ও উন্নয়নে সমীকরণের পরিবর্তন দরকার। কেননা মধ্যবিত্ত শ্রেণী বাড়ছে। নতুন আকাক্সক্ষা বাড়ছে। কম খরচে বেশি সুবিধা পাওয়ার সুযোগ কমে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক বৈষম্য ক্রমাগত বাড়ছে- যা স্বাধীনতা চেতনার পরিপন্থী। আবুল কাশেম খান বলেন, বিদ্যুৎ প্রাপ্তিতে সমস্যা, অবকাঠামোসহ বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে। এছাড়া আমলাদের মানসিকতার পরিবর্তন দরকার।

নাসিম মঞ্জুর বলেন, এখন আবার শুনছি ব্যাংক ঋণের সুদ হার বাড়ানো হবে। এটা ঠিক হবে না। জমির সমস্যা তো রয়েছেই। এছাড়া কর ব্যবস্থার সংস্কার জরুরি।

আবদুল মজিদ বলেন, সরকার রাষ্ট্রকে অধিগ্রহণ করে ফেলেছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যে কারণে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। এছাড়া জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশ হতে পারতো। কিন্তু জিডিপির আড়াই থেকে তিন শতাংশ লোপাট হয় যাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও সাম্প্রদায়িকতা রয়েছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে এখন আর কেউ শিক্ষার্থী নেই, সবাই পরীক্ষার্থী। এ ব্যবস্থার পরিবর্তন করতে হবে।

ঘটনাপ্রবাহ : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×