বিদেশি গণমাধ্যমে বাংলাদেশে নির্বাচনের খবর

শেখ হাসিনাই আবার ক্ষমতায় আসছেন

রক্তক্ষয়ী প্রচারের পরও পরিস্থিতি আ’লীগের অনুকূলে * এবারের নির্বাচনে নেই ভারত ইস্যু * চাঙা অর্থনীতিতে সুবিধায় আওয়ামী লীগ

  যুগান্তর ডেস্ক ২৯ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবারও ক্ষমতায় আসছেন বলে বিদেশি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মার্কিন ম্যাগাজিন টাইমের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ হিসেবে তুলে আনায় শেখ হাসিনা আবার ক্ষমতায় আসছেন। দুই মেয়াদে তার সরকারের ব্যাপক উন্নয়নযজ্ঞের ফলে এবারের নির্বাচনেও ভোটাররা আওয়ামী লীগকেই বেছে নেবেন।

যুক্তরাজ্যের দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, রক্তক্ষয়ী নির্বাচনী প্রচারের পরও পরিস্থিতি শেখ হাসিনার অনুকূলে রয়েছে। চলমান পরিস্থিতিকে বিরোধীদলীয় নেতারা দেশটির ৪৭ বছরের ইতিহাসে ‘সবচেয়ে বেশি শ্বাসরুদ্ধকর’ বলছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এদিকে এবারের নির্বাচনী প্রচারে বরাবরের মতো ‘ভারত ইস্যু’ দেখা যায়নি বলে ভারতের ইংরেজি দৈনিক দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থনীতির উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও আর্থিক খাতে চাঙা ভাব আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে সুবিধাজনক অবস্থানে রেখেছে। এর ফলে শেখ হাসিনার তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসা বেগবান হয়েছে।

শুক্রবার ও বৃহস্পতিবার এসব প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। শুক্রবার প্রভাবশালী মার্কিন ম্যাগাজিন টাইমের প্রতিবেদনে বলা হয়, রোববারের নির্বাচনের মাধ্যমে রেকর্ড চতুর্থবারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন শেখ হাসিনা। দুই মেয়াদে তার সরকারের ব্যাপক উন্নয়নযজ্ঞের ফলে এবারের নির্বাচনেও ভোটাররা শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগকেই বেছে নেবেন।

প্রতিবেদনে ভঙ্গুর গণতন্ত্রের বিনিময়ে বাংলাদেশের অসাধারণ অর্থনৈতিক সফলতা নিয়ে শেখ হাসিনার সমালোচকদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে বলেও জানিয়েছে টাইম।

বিশিষ্ট আইনজীবী ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মুখোমুখি হয়েছেন শেখ হাসিনা। তবে শেখ হাসিনার আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন না। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দুর্নীতির দায়ে সাজা ভোগ করছেন। আদালত তাকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করেছেন।

২০১৪ সালে দেশটির নির্বাচন বয়কট করেছিল বিএনপি। খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বিএনপি। এবার শেখ হাসিনার চ্যালেঞ্জার হিসেবে ড. কামাল আবির্ভূত হয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতির অধ্যাপক আলী রিয়াজ টাইম ম্যাগাজিনকে বলেন, উন্নয়ন বলতে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বোঝায় না, এর একটি বৃহৎ অর্থ রয়েছে; যার মধ্যে মানবাধিকার, আইনের শাসন, জবাবদিহিতা এবং সুশাসনও রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে এসবের অনুপস্থিতি রয়েছে।

এদিকে বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনপূর্ব কয়েক মাসে শেখ হাসিনার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী খালেদা জিয়াসহ বিরোধীপক্ষের অসংখ্য নেতাকর্মী কারাগারে আছেন কিংবা গুম হয়েছেন।

আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা ও মুক্তমত প্রকাশের সংগঠনগুলো অভিযোগ তুলেছে, নির্বাচন পর্যবেক্ষণ কাজে বাংলাদেশে যাওয়ার জন্য ভিসা দিতে অপ্রয়োজনীয়ভাবে দেরি করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইন্সটিটিউট নামের গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক শাহাব এনাম খান বলেন, বিশ্বের অতি ধনী ব্যক্তিদের তালিকায় উঠে আসার হার বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি। এর অর্থ এই নয় যে, নিু আয়ের মানুষেরা সুবিধা পাচ্ছেন।

শাহাবের মতে, আগস্টে অনিরাপদ গাড়ি চালনার বিরুদ্ধে আন্দোলনের বিষয়টি দেখা যায়। এ ধরনের অনেক বিষয় নিষ্পত্তিমূলক সিদ্ধান্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আইনশৃঙ্খলার নামে জননিরাপত্তার বিষয়গুলোর পাশাপাশি বিচার ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা আছে কিনা, তা নির্ধারক হয়ে উঠবে।

মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের তথ্য অনুযায়ী, শত শত মানুষকে জোর করে তুলে নেয়া হয়েছে বা গোপন জেলখানায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এছাড়া মাদক ব্যবসার অভিযোগে ৪৫০ জন পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়, আগের নির্বাচনগুলোয় বিএনপি প্রথাগতভাবে ভারত বিরোধিতায় নেতৃত্ব দিয়েছে। ২০১৪ সালে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করার পর দিল্লি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারকে পুনর্র্নির্বাচনে কোনো চাপ দেয়নি। উল্টো হাসিনার জয়কে স্বীকৃতি দিয়েছে। বিএনপির অনেকে ওই নির্বাচন বর্জন করাকে ‘গুরুতর ভুল’ বলে মনে করেছেন।

ভারতের একজন কূটনীতিক ঢাকায় ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, এটা খুবই চমকপ্রদ যে নির্বাচনী প্রচারের সময় দুটি প্রধান দল ভারতের কথা উল্লেখ করেনি। হিযবুত তাহরির মতো একটি ইসলামী গোষ্ঠী ভারতবিরোধী কিছু বক্তব্য দেয়া ছাড়া বিএনপি বা আওয়ামী লীগের কোনো নেতা নির্বাচনী প্রচারে ভারতবিরোধী অনুভূতি নিয়ে কোনো কথা বলেননি। জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বিগত নির্বাচনগুলোয় শেখ হাসিনাকে ‘ভারতমুখী’ বলে প্রচার চালাতেন। খালেদা জিয়া এখন দুর্নীতির অভিযোগে কারাবন্দি রয়েছেন।

ভারতীয় ওই কূটনীতিক আরও বলেন, ‘আমি মনে করি, তারা (বিএনপি) হয়তো বুঝতে পেরেছে ভারতকে দূরে সরিয়ে রেখে বিএনপির কোনো লাভ হয়নি।’

সাবেক কূটনীতিক ও খালেদা জিয়ার পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা সাবিহ উদ্দিন আহমেদ এ ব্যাপারে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, ‘এবার ভারত কোনো ইস্যু নয়। দিল্লির মসনদে বিজেপি নাকি কংগ্রেস বসল, সেটা নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। একইভাবে ভারত সরকারেরও উচিত নয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নাকি বিএনপি জিতল, সেটা নিয়ে ভাবা।’

পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউট অব বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, ‘আমি মনে করি, শেখ হাসিনা ভূরাজনৈতিক অভিযাত্রা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে করেছেন এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সমান সমান অংশীদারত্ব রয়েছে।’

নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করলেও নয়াদিল্লি এটিকে ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ আখ্যা দিয়ে তার শুভকামনা বজায় রেখেছে। তবে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য ভারত তিনজন নির্বাচন পর্যবেক্ষককে পাঠাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মতো পশ্চিমা দেশগুলোর মতো নয়, ভারত শুধু ‘অবাধ ও সুষ্ঠু’ নির্বাচন চাওয়া ছাড়া কোনো বক্তব্য দেয়নি।

শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্রমশ বেড়েছে। দেশের বিভিন্ন কোম্পানিগুলো আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে।

ভিয়েলল্যাটেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান ডেভিড হাসানাত বলেছেন, বর্তমানে আমাদের দেশে রাজনৈতিক স্থিরতা রয়েছে এবং এটি বজায় রাখতে হবে। রাজনৈতিক স্থিরতা আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতিতে সাহায্য করে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, বছরের পর বছর ধরে হওয়া উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিষয়টি সম্পাদন করেছে শাসক দল আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনার সরকার প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে।

আশা করা হচ্ছে, এবারের নির্বাচনেও ক্ষমতায় আসবেন শেখ হাসিনা। এর ফলে অর্থনৈতিক নীতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব হবে এবং বিদেশি বিনিয়োগের নিয়মিত প্রবাহ রক্ষায় তা সহায়ক হবে। কিন্তু একই সময়ে বিরোধীদের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়নের অভিযোগের মুখেও পড়েছে বর্তমান সরকার।

কন্ট্রোল রিস্ক নামের একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের ভারত ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সহযোগী পরিচালক প্রত্যুষ রাও ব্লুমবার্গকে বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী যদি আসন্ন নির্বাচনে হেরে যান, তবে বর্তমান প্রশাসনের অনেকের বিরোধীদের পাল্টা গ্রেফতার ও মামলার মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা আছে।

শেখ হাসিনার কথা উল্লেখ করে প্রত্যুষ বলেন, স্পষ্টতই তিনি নার্ভাস। হাসিনার জন্য এটি অস্তিত্বের যুদ্ধ। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে ব্লুমবার্গ বলছে, আসন্ন নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত দেশের জন্য ইতিবাচক। কারণ বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।

সিঙ্গাপুরভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ক্রল’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেশমি খুরানা ব্লুমবার্গকে বলেন, প্রধান বিরোধী দল বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়া বাংলাদেশের জন্য সার্বিকভাবে ভালো খবর।

ধারণা করা হচ্ছে, শেখ হাসিনাই নির্বাচনে জিততে চলেছেন। তবে ২০১৪ সালে যেখানে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করেছিল, এবার বিএনপি কিছুটা প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করেছে।

ঘটনাপ্রবাহ : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×