প্রবৃদ্ধি সহায়ক ইস্যু ২

অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকেই

দক্ষ শ্রম পাঁচ ভাগ বাড়লে উৎপাদন বাড়ে চার ভাগ * দরকার মানবসম্পদের বিকাশে অগ্রাধিকার

  শাহ আলম খান ০৪ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকেই

ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে ‘সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট।’ বাংলায় এর অর্থ দাঁড়ায় যোগ্যরাই টিকে থাকে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরাও এর যোগসূত্র টেনে বলছেন, কোনো দেশে দক্ষ উদ্যোক্তা, দক্ষ শ্রমিক ও মধ্যবর্তী ব্যবস্থাপনা এবং সুদক্ষ দেশপ্রেমিক সরকারের সমন্বয় থাকলে বৈশ্বিক উত্থান-পতনের মধ্যেও সেদেশে ঊর্ধ্বগতির প্রবৃদ্ধি বজায় থাকবে।

তবে এ ক্ষেত্রে সেই অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকেই। যেখানে বেসরকারি খাত ও অন্য সংস্থাগুলো সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে। এর উদ্দেশ্য সর্বস্তরে দক্ষতা বৃদ্ধি করা।

এ প্রসঙ্গে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক যুগান্তরকে বলেন, দিনবদল হয়েছে। দক্ষতা উন্নয়নে দেশে প্রযুক্তি শিক্ষার প্রসার ঘটেছে। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আইটিতে ক্যারিয়ার গড়তে এগিয়ে আসছে। প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেদের দক্ষ করে তুলছে। বর্তমান সরকার তরুণদের জন্য এ প্লাটফর্ম তৈরি করে দিয়েছে। এ লক্ষ্যে তাদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ ও বিশ্বমানের প্রশিক্ষণের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে সারা দেশে ৬৪টি আইটি পার্ক গড়ে তোলার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর ফলে সেদিন বেশি দূরে নয়। যেদিন প্রযুক্তি শিক্ষায় শিক্ষিত এ দেশের তরুণরা একদিন বিশ্ব জয় করবে।

সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা মনে করেন, দক্ষতা এমন অমূল্য সম্পদ যা মূল্যায়নের বিচারে প্রতিষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবস্থান সর্বদাই এগিয়ে থাকে। এর সুবিধাও ভোগ করে দক্ষতা অর্জনকারী। তবে এ দক্ষতার মানদণ্ড ভিন্ন হয়ে থাকে। সাধারণ অর্থে শ্রমিকের কাজ করার ক্ষমতা বা উৎপাদন ক্ষমতাকে শ্রমের দক্ষতা বলা হয়। অর্থাৎ দ্রব্যের গুণগত মান অক্ষুণ্ণ রেখে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে একজন শ্রমিকের অধিক উৎপাদন করার ক্ষমতাকে শ্রমের দক্ষতা বলা হয়। আবার ব্যবস্থাপনাগত কৌশল দিয়ে অপচয় রোধ করাকেও কৌশলগত দক্ষতা বলা হয়। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা পরিষদের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, শ্রমের দক্ষতা বাড়লে শ্রমিকের উৎপাদন শক্তি বাড়ে। এতে সময় ও সম্পদের অপচয় রোধ হয় এবং দেশের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। এর ফলে বিভিন্ন পেশায় শ্রম সরবরাহ নিশ্চিত হয়। মজুরির হারেও সমতা আসে। কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা মেলে। ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত হয়, দামস্তরে সমতা আসে, শ্রমিকের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে এবং দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীলতা লাভ করে।

কিন্তু পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে শ্রমের উৎপাদনশীলতায় বাংলাদেশের অবস্থান নিচের দিকে। কারণ এখানে প্রবৃদ্ধি সহায়ক কোনো ইস্যুকে অগ্রাধিকার দিয়ে করণীয় নির্ধারণ করতে সরকারের যে ভিশনারি চিন্তা ও পরিকল্পনা করছে- তা আমলা দ্বারা প্রভাবিত হওয়ায় সেটি আর যথাযথ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। অন্যদিকে মননশীল উদ্যোক্তারও যথেষ্ট অভাব আছে। তারা শ্রমিককে দিয়ে যেনতেন উপায়ে কাজ আদায় করে নিতে চায়। কিন্তু শ্রমিকের দক্ষতা উন্নয়ন ঘটালে যে তার প্রতিষ্ঠানেরই লাভ সেদিকটি বিবেচনায় আনে না অধিকাংশ উদ্যোক্তা। ফলে শ্রমের অদক্ষতার কারণে অপচয়ও বাড়ছে, যা প্রবৃদ্ধি অর্জনের পথে বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে।

এ বিষয়ে ইউকে কমিশন ফর এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড স্কিলস (ইউকেসিইএস-২০১০) বিষয়ক গবেষণায় সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে, উচ্চ দক্ষতা উৎপাদনশীলতার ওপর ধনাত্মক প্রভাব ফেলে। অপরদিকে নিু দক্ষতার প্রভাব ঋণাত্মক হয়। এজন্য দক্ষতা অর্জনে গুরুত্বারোপ করে প্রশিক্ষণের ওপর সর্বোচ্চ জোর দিতে বলা হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতাপূর্ণ শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ পাঁচ শতাংশ বৃদ্ধি পেলে উৎপাদনশীলতা বাড়ে চার শতাংশ পর্যন্ত। এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে মজুরিও এক দশমিক পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে। কারণ উৎপাদন বাড়লে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের নিট মুনাফা বেড়ে যায়।

ইউকেসিইএস ২০১০-এর অপর এক গবেষণায় বলা হয়, প্রশিক্ষণের পর উৎপাদনশীলতার ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি ঘটে। যেখানে মজুরি বৃদ্ধি পায় তিন দশমিক তিন শতাংশ। আর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শ্রমিকের সঙ্গে অদক্ষ শ্রমিকের উৎপাদনশীলতার পার্থক্য আট শতাংশ পর্যন্ত ঘটে। এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিবিদ ব্যালট গবেষণায় দেখিয়েছেন, প্রশিক্ষণের কারণে উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধি মজুরি বৃদ্ধির চেয়ে তিন থেকে সাড়ে তিন শতাংশ বেশি হয়ে থাকে।

বাংলাদেশেও এ ধরনের জরিপ পরিচালিত হয়েছে। ২০১৭ সালে ব্র্যাকের উদ্যোগে ‘দি পাওয়ার অব অ্যাপ্রেন্টিসশিপস’ শীর্ষক এক জরিপে উল্লেখ করা হয়, দক্ষতা উন্নয়নের প্রশিক্ষণ নেয়ার পর কর্মসংস্থানে প্রবেশ করলে কিশোর-কিশোরীদের মাসিক গড় আয় বাড়ে প্রায় ছয়গুণ। এর ফলে তাদের সঞ্চয়ের প্রবণতা বাড়ে সাড়ে সাতগুণ। ক্রয়ক্ষমতা ও সঞ্চয় বেড়ে যাওয়ার কারণে তাদের খাদ্য খাতে ব্যয় ৯ শতাংশ বাড়াতে সক্ষম হয়।

তবে দক্ষতার ঘাটতির কারণে বাংলাদেশি শ্রমিকদের আয় অন্য দেশের তুলনায় কম। সেটি দেশে কিংবা প্রবাসে একই চিত্র। এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের অভিবাসন বিষয়ক প্রতিবেদন মতে, ২০১৫ সালে একজন প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকের মাথাপিছু আয় ছিল দুই হাজার ৭৮ দশমিক ৯৫ ডলার। অন্যদিকে একজন ভারতীয় অভিবাসীর মাথাপিছু আয় পাঁচ হাজার ১৯৪ দশমিক ২৪ ডলার, ফিলিপাইনের চার হাজার ৯৫০ ডলার, নেপালের তিন হাজার ৩০০ ডলার ও পাকিস্তানের একজন অভিবাসীর মাথাপিছু আয় হচ্ছে তিন হাজার ২৪১ দশমিক ৯৪ ডলার। অথচ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার অন্তত এক কোটি বাংলাদেশি প্রবাসে কাজ করছে। কিন্তু প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে মাত্র দুই শতাংশ পেশাজীবী হওয়ায় রেমিটেন্স কম আসছে। বাকিরা স্বল্প দক্ষ ৫২ শতাংশ, ৩১ শতাংশ দক্ষ, ১৪ শতাংশ আধাদক্ষ।

অন্যদিকে অদক্ষতার কারণে অপচয়ের বিভিন্ন দৃষ্টান্তও আছে ভূরি ভূরি। এর মধ্যে ‘বাংলাদেশ : শিল্প খাতে জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা উন্নয়নে সুযোগ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক জরিপ তথ্যে এর একটি বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে। এতে দাবি করা হয়, দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাংলাদেশি কোম্পানিগুলো ১৬ শতাংশ পর্যন্ত জ্বালানির ব্যবহার কমাতে পারে, পাশাপাশি জ্বালানির খরচ ২১ শতাংশ এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন ১৮ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। দেখানো হয়, এ প্রকল্পে অংশ নেয়া ৩৬টি কারখানার মাধ্যমে বার্ষিক গড়ে এক লাখ ৪৫ হাজার মার্কিন ডলার করে ৫২ লাখ ডলারের জ্বালানি খরচ সাশ্রয় করা সম্ভব, যদি সার্বিক ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো যায়। এছাড়া দক্ষতা উন্নয়নে ইতিমধ্যে বিজিএমইএ ‘ট্রিস’ নামে একটি প্রকল্প চালু করেছে। এর মাধ্যমে প্রতি বছর ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫২৭ কিলোওয়াট আওয়ার পাওয়ার সঞ্চয় হচ্ছে। বাজার মূল্যে এর আর্থিক পরিমাণ হবে এক কোটি ৯ লাখ ৭২ হাজার ১৬৮ টাকা।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় শ্রমশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধি ও অপচয় রোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর এর অনুপস্থিতির কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার অনেক কম। দক্ষিণ কোরিয়ায় ২০১৭ সালে শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ছিল ৬২ দশমিক ৬৩ শতাংশ। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এ হার সবচেয়ে বেশি ছিল ভিয়েতনামে (৭৮ দশমিক ২২ শতাংশ)। অথচ তিন দশক ধরে বাংলাদেশে এটা ৫৬ থেকে ৫৮ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে উদ্যোক্তা আবদুস সালাম মুর্শেদী যুগান্তরকে বলেন, সস্তা শ্রমের ওপর এক সময় বাংলাদেশে শিল্পের বিকাশ হলেও এখন দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে উদ্যোক্তাদের টিকে থাকতে হবে। পণ্য বৈচিত্র্যকরণ, বাজার সম্প্রসারণ ও নিজস্ব ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। এজন্য দরকার দক্ষতা অর্জন। সেটা শ্রমশক্তি এবং ব্যবস্থাপনা উভয় জায়গাতেই দরকার আছে। এক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে শিল্পের অগ্রগতি একটা সময়ে গিয়ে আর বেশিদূর এগিয়ে নেয়া যাবে না। কাজেই এ অবস্থায় শ্রমিকের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে তোলার জন্য সরকার ও মালিকদের উদ্যোগ নিতে হবে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি আবুল কাসেম খান বলেন, বাংলাদেশের বেকার সমস্যা সমাধান ও জনসংখ্যাতাত্ত্বিক সুবিধা কাজে লাগাতে দক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরিতে কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

 
×