ডাকসু গঠনতন্ত্র সংশোধন নিয়ে বৈঠক

সহাবস্থান নিশ্চিতের তাগিদ ছাত্র সংগঠনগুলোর

  ঢাবি প্রতিনিধি ১১ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ডাকসু গঠনতন্ত্র সংশোধন নিয়ে বৈঠক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনের জন্য ক্যাম্পাসে সহাবস্থান ও প্রচারণায় সমান সুযোগ নিশ্চিত এবং নতুন সম্পাদকীয় পদ সৃষ্টি করাসহ বেশকিছু প্রস্তাব দিয়েছে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এসব প্রস্তাব দেন সংগঠনগুলোর নেতারা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে এ বৈঠকের আয়োজন করে ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের জন্য গঠনতন্ত্র সংশোধনী/পরিমার্জনবিষয়ক সুপারিশ প্রণয়ন কমিটি। এর আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় ছাত্রনেতাদের প্রস্তাবের মধ্যে আরও উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- নিয়মিত শিক্ষার্থীদের ভোটার করা, নারী প্রতিনিধি পদের নাম যুগোপযোগী করা, ডাকসু সভাপতির (ভিসি) ক্ষমতা হ্রাস এবং সেক্রেটারিয়েট বডির (কার্যনির্বাহী পরিষদ) ক্ষমতা বৃদ্ধি।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল, অধ্যাপক ড. সুপ্রিয়া সাহা, অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা ও অধ্যাপক ড. মো. রহমত উল্লাহ। এছাড়া ক্যাম্পাসে ক্রিয়াশীল ১৩টি ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন- ঢাবি ছাত্রলীগের সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস ও সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন, ছাত্রদলের সভাপতি আল মেহেদী তালুকদার ও সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশার সিদ্দীকী, ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ফয়েজ উল্লাহ ও সাধারণ সম্পাদক রাজিব দাস, জাসদ ছাত্রলীগের সভাপতি চন্দ্রনাথ পাল ও সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান রাহাত, ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি সালমান সিদ্দিকী ও সাধারণ সম্পাদক তমা বর্মণ এবং ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি উম্মে হাবিবা বেনজির।

বৈঠকে অংশ নেয়া ছাত্র প্রতিনিধিরা আরও জানান, সময় স্বল্পতার কারণে সব সংগঠনের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে সোমবারের মধ্যে লিখিত প্রস্তাবনা দেয়ার জন্য বলা হয়েছে। ডাকসু নির্বাচনের উদ্যোগের অংশ হিসেবে সংবিধান সংশোধন কমিটিকে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে সব সংগঠনের সঙ্গে কথা বলে প্রস্তাব দিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এরপর সিন্ডিকেট বৈঠকে বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে বলে জানা যায়।

বৈঠকসূত্রে জানা যায়, ক্যাম্পাসে সহাবস্থান, নির্বাচনে প্রচার-প্রচারণা ও ক্যাম্পাসে সব সংগঠনের নেতাকর্মীর প্রচারণা নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেন ছাত্রদলের নেতারা। এছাড়া বাম সংগঠনের প্রতিনিধিরা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমফিল করা (নিয়মিত) শিক্ষার্থীদের ভোটার করা, দীর্ঘদিন পরে নির্বাচন হচ্ছে বিধায় একটি নির্দিষ্ট সেশন পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ প্রদান, সভাপতির (ভিসি) ক্ষমতা হ্রাস এবং সেক্রেটারিয়েট বডির (কার্যনির্বাহী পরিষদ) সদস্যদের ক্ষমতা বৃদ্ধিসহ নানা প্রস্তাব তুলে ধরেন।

বৈঠক শেষে গঠনতন্ত্র সংশোধনী কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, ক্রিয়াশীল ছাত্র সংঠনের প্রতিনিধিরা আলোচনায় অংশ নিয়ে একটি ক্ষেত্রে সমঝোতায় এসেছে। তা হল- নির্বাচনে ‘নিয়মিত শিক্ষার্থীরা’ প্রার্থী ও ভোটার হতে পারবেন। তবে নিয়মিত শিক্ষার্থী বলতে কী বোঝায়, এ নিয়ে সংযোজন-বিয়োজন, মতপার্থক্য থাকতে পারে। তিনি আরও বলেন, এখন যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে বদ্ধপরিকর এবং সেহেতু কীভাবে একটি সুন্দর নির্বাচন জাতিকে উপহার দিতে পারি, সে লক্ষ্যে গঠিত কমিটি কাজ করছে। এ কমিটিকে দশ কর্মদিবসের মধ্যেই মতবিনিময় সভার প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে ছাত্র সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। বিদ্যমান গঠনতন্ত্রের কোথায় কোথায় সংশোধন করা দরকার, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট মতামত দিয়েছেন তারা।

ড. মিজানুর রহমান বলেন, যেহেতু ১৯৯৮ সালে সর্বশেষ ডাকসু ও হল সংসদের গঠনতন্ত্র পর্যালোনা করা হয়েছে, তাই নতুন করে বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের জন্য গঠনতন্ত্র সংশোধনী/পরিমার্জন কমিটির সুপারিশমালা ভিসি সিন্ডিকেটে উপস্থাপন করবেন। এই কমিটি মতামত ও পরামর্শের ভিত্তিতে ভোটার ও প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা নির্ধারণের সুপারিশ করবে। আমরা মূলত গঠনতন্ত্র ও নির্বাচনের আইনি দিকটি দেখব।

বৈঠক শেষে ঢাবি ছাত্রলীগ সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস সাংবাদিকদের বলেন, আমরা বৈঠকে আমাদের প্রস্তাবগুলো তুলে ধরেছি। আমরা চাই সব সংগঠন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক। ক্যাম্পাসে সহাবস্থানের বিষয়ে তিনি বলেন, ক্যাম্পাসে সহাবস্থান আছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা যদি তাদের (ছাত্রদল) মতাদর্শ গ্রহণ করে, তবে তারা ক্যাম্পাসে আসতে পারবে, কেউ তাদের বাধা দিচ্ছে না।

ছাত্রদল সভাপতি আল মেহেদী তালুকদার বলেন, ক্যাম্পাসে সহাবস্থান নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ব্যবস্থা করবে। সহাবস্থান নিশ্চিত না হলে তারা নির্বাচনে অংশ না-ও নিতে পারেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের সমস্যাগুলো কমিটির কাছে তুলে ধরেছি। কমিটির আহ্বায়ক আমাদের উত্থাপিত বিষয়গুলো ভিসি ও প্রশাসনের কাছে তুলে ধরার আশ্বাস দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান অবস্থা নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট নই। এখানে কোনো সহাবস্থান নেই। আমরা আশা করি, প্রশাসন দ্রুত সহাবস্থান নিশ্চিত করবে। তিনি বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে ডাকসু নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই। ডাকসু বিশ্ববিদ্যালয়ের অলংকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরনো গৌরব ফিরিয়ে আনতে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

এছাড়া ছাত্র ফেডারেশন, ছাত্র ইউনিয়ন এবং সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের নেতারা যৌথ বিবৃতিতে জানান, ছাত্র অধিকারবিষয়ক সম্পাদক, সামাজিক বিনোদনের পরিবর্তে সাংস্কৃতিক সম্পাদক এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক পদ সৃষ্টি করতে হবে। ডাকসুর বর্তমান গঠনতন্ত্রে সভাপতির (ভিসি) একচেটিয়া ক্ষমতা পরিবর্তনেরও প্রস্তাব রাখেন তারা। এছাড়া ডাকসু ও হল সংসদের সভাপতি ও নির্বাহী কমিটির অন্যান্য সদস্যের ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা, সুষ্ঠু নির্বাচন এবং সব ভোটারের নিরাপদে ভোটদান নিশ্চিত করতে হলের পরিবর্তে বিভিন্ন একাডেমিক ভবনে বুথের ব্যবস্থা করা, নির্বাচন সুষ্ঠু করার জন্য নিরপেক্ষ পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট নির্বাচন কমিশন গঠন করা, ক্ষেত্রবিশেষে নতুন নতুন সম্পাদকের পদ সৃষ্টি করার দাবিও ছিল তাদের।

এদিকে ঢাবি ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান তার কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ডাকসুর গঠনতন্ত্র যুযোপযোগী করার লক্ষ্যে কমিটি গঠন করা হয়েছে। গঠনতন্ত্রের কোনো সংশোধনী প্রয়োজন আছে কি না, সেই বিষয়ে সভাটি হয়েছে। গঠনতন্ত্র যাদের ভোটার বলে চিহ্নিত করবে, তারাই ভোটার হবে। ৩১ মার্চের মধ্যেই নির্বাচন করার প্রয়াস রয়েছে। সেভাবেই আমরা এগোচ্ছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে সহাবস্থানের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রভোস্ট কমিটি সব হলে সহাবস্থান আছে বলে অবহিত করেছেন। সব শিক্ষার্থী ক্লাস-পরীক্ষা ও অন্যান্য কার্যাবলি সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে করতে পারছে।

সর্বশেষ ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৯ সালের ৬ ডিসেম্বর। এরপর ২৯ বছর ধরে বন্ধ আছে ডাকসু নির্বাচন। সম্প্রতি ৩১ মার্চের মধ্যে ডাকসু নির্বাচনের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এরই মধ্যে খসড়া ভোটার তালিকা (শিক্ষার্থীদের ডাটাবেজ) প্রকাশ করা হয়েছে। ডাকসু নির্বাচনের প্রধান অংশীদার বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন নিয়ে ১৬ সেপ্টেম্বর ক্যাম্পাসে পরিবেশ পরিষদের বৈঠক হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গঠনতন্ত্র সংশোধনের বৈঠক ডাকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

এর আগে ২০১৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩১ শিক্ষার্থীর রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ১৭ জানুয়ারি এক রায়ে ৬ মাসের মধ্যে ডাকসু নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেন উচ্চ আদালত। ওই নির্দেশনার পর গত ২৮ ফেব্র“য়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় ৩১ মার্চের মধ্যে নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ঠিক করা হয়। আদালতের নির্দেশনার ৭ মাসেও নির্বাচনের দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে উকিল নোটিশ দেন রিটকারীদের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ।

পরে ৩১ অক্টোবর ‘ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে’ হলভিত্তিক শিক্ষার্থীদের ডাটাবেজ প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তালিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি আবাসিক হলের সঙ্গে সংযুক্ত ও আবাসিক মিলিয়ে ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন শিক্ষার্থীর নাম রয়েছে। এর মধ্যে ১৪ হাজার ৫০৯ জন ছাত্রী ও ২৩ হাজার ৯৮৪ জন ছাত্র।

প্রক্টরিয়াল টিমের প্রহরায় ছাত্রদলের বৈঠকে যোগদান : এদিকে বৈঠকে যোগদানের জন্য ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে প্রক্টরিয়াল টিমের প্রহরায় সিনেট ভবনে নিয়ে আসা হয়। বেলা ১১টায় আলোচনা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ছাত্রদল নেতাদের আসতে বিলম্ব হওয়ায় সাড়ে ১১টায় তা শুরু হয়। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. একেএম গোলাম রব্বানীর নেতৃত্বে সহকারী প্রক্টর ও প্রক্টরিয়াল টিমকে তাদের ঘিরে নিয়ে আসতে দেখা যায়। এ বিষয়ে প্রক্টর বলেন, তারা আমাদের সহযোগিতা চেয়েছিল। আমরা সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেছি।

ঘটনাপ্রবাহ : ডাকসু নির্বাচন

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×