অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের অভিমত

মুদ্রানীতিতে শৃঙ্খলা আনতে তদারকি বাড়াতে হবে

ঋণের টাকা যাতে পাচার না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে * খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমাতে হবে

  হামিদ বিশ্বাস ১২ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মুদ্রানীতিতে শৃঙ্খলা আনতে তদারকি বাড়াতে হবে

মুদ্রানীতিতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য তদারকি বাড়াতে হবে। নির্বাচনের পর বাজারে টাকার চাহিদা বাড়বে। এ চাহিদা মেটাতে গিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সতর্ক থাকতে হবে। চাহিদার নামে ঋণের টাকা যাতে কোনোক্রমেই পাচার না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

রাজধানীর হোটেল লেকশোরে আগামীর মুদ্রানীতি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় সোমবার এমন মতামত দিয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার ও ব্যবসায়ীরা।

এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরসহ সাবেক গভর্নর, অর্থনীতিবিদসহ আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের সব মহাব্যবস্থাপক, নির্বাহী পরিচালক ও আর্থিক খাতের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে মুদ্রানীতি প্রণয়ন কমিটি।

চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতির মেয়াদ ৩১ ডিসেম্বর শেষ হয়েছে। এ মাসেই দ্বিতীয় মেয়াদের মুদ্রানীতি প্রণয়ন করা হবে, যা জুন পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। মুদ্রানীতির মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে টাকার জোগান, ঋণ বিতরণ, বৈদেশিক মুদ্রার জোগান- এসব খাতে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে।

মতবিনিময় সভায় অর্থনীতিবিদরা বলেন, নির্বাচনের পর এ মুদ্রানীতিতে বিশেষ করে ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা থাকবে অনেক। তারা ঋণের সুদের হার কমাতে এবং ঋণের জোগান বাড়াতে চাইবে। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সতর্ক থাকতে হবে। ব্যাংকিং খাতে এখন তারল্য সংকট রয়েছে। এ কারণে এরই মধ্যে আমানতের সুদের হারের পাশাপাশি ঋণের সুদের হার বাড়তে শুরু করেছে। নির্বাচনের পর একটি ব্যবসাবান্ধব মুদ্রানীতি প্রয়োজন। সেটি করতে হলে বাজারে তারল্যের জোগান বাড়াতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, মুদ্রানীতিতে খুব বেশি পরিবর্তন হয় না। একটা ধারাবাহিকতার মাধ্যমে এটি প্রণয়ন করা হয়। মুদ্রানীতি মূলত ডিমান্ড আর সাপ্লাইয়ের ব্যাপার। অর্থাৎ ঋণ চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা। এখানে চাহিদায় অনেক সমস্যা আছে। খতিয়ে দেখতে হবে- কিসের চাহিদা, কোথায় যাচ্ছে টাকা। উৎপাদনশীল নাকি অনুৎপাদনশীল খাতে যাচ্ছে ঋণ। মনিটরিং জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ কমাতে হবে। সুশাসনের বিকল্প নেই। এটি ছাড়া মুদ্রানীতি সফল হবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, এত খেলাপি ঋণ নিয়ে মুদ্রানীতি সফল হবে না। খেলাপি ঋণ কমাতে হবে। ঋণমান বাড়াতে হবে। বলা হয়, ঋণ প্রবৃদ্ধি ভালো। কোন কোন খাতে ঋণ যাচ্ছে, কোনো অনুৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ বেশি কি না খতিয়ে দেখতে হবে। শিল্প খাতে ঋণ বেশি যেতে হবে। তাহলে কর্মসংস্থান বাড়বে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পেও নজর দিতে হবে।

রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ যুগান্তরকে বলেন, এবারের মুদ্রানীতি সংকোচন বা সংযত নয়- সম্প্রসারণমূলক চাই। পদ্মা সেতুসহ দক্ষিণ বঙ্গের ব্যাপক উন্নয়নের কারণে ঋণ চাহিদা বাড়বে। মুদ্রানীতিতে যেন সে প্রস্তুতি থাকে।

রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতাউর রহমান প্রধান যুগান্তরকে বলেন, সংকোচন নয়, এবার উদার মুদ্রানীতি চাই। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হওয়ায় কোনো দোদুল্যমানতা নেই। সুতরাং ঋণের চাহিদা বাড়বে। তার সুযোগ যেন মুদ্রানীতিতে রাখা হয়, সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

সূত্র জানায়, এরই মধ্যে মুদ্রানীতি নিয়ে তিন দফায় প্রস্তুতি বৈঠক হয়েছে। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও পরিচালনা পর্ষদের মতামত নিয়ে খসড়া মুদ্রানীতি তৈরি করা হবে। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করবেন গভর্নর ফজলে কবির। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. আখতারুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, নতুন মুদ্রানীতি এখনও আলাপ-আলোচনা পর্যায়ে আছে। এরই মধ্যে কয়েক দফা প্রস্তুতি বৈঠক হয়েছে। মতামত নেয়া অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতির ওপর মতামত নেয়ার কথা ছিল। কিন্তু কোরাম সংকটের কারণে সভা বাতিল করায় সেটি সম্ভব হয়নি।

গত বছরের ৩১ জুলাই চলতি অর্থবছরের মুদ্রানীতি ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে প্রথমার্ধের জন্য বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হয়েছিল ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। যদিও জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত পাঁচ মাসে বেসরকারি খাতে ৩ দশমিক ৮৯ শতাংশ ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

২০১৭-১৮ অর্থবছরের একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ। মূলত তারল্য সংকটের কারণে অর্থবছরের প্রথমার্ধে লক্ষ্য অনুযায়ী বিনিয়োগ করতে পারেনি ব্যাংকগুলো। এ অবস্থায় বছরের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি অপরিবর্তিত থাকতে পারে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×