শাবি শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা নিয়ে ক্যাম্পাসে আলোড়ন

প্ররোচনা দেয়ার অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে * প্রতীকের মৃত্যু নিয়ে উচ্চ ক্ষমতার কমিটি করা হয়েছে- ভিসি

  ইয়াহ্ইয়া মারুফ, সিলেট ব্যুরো ১৬ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) শিক্ষার্থী তাইফুর রহমান
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) শিক্ষার্থী তাইফুর রহমান

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) শিক্ষার্থী তাইফুর রহমান প্রতীকের আত্মহত্যা নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে ক্যাম্পাসে। অনেকের দাবি তাকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেয়া হয়েছে।

বলাবলি হচ্ছে, অনার্সে প্রথম হওয়ার পর মাস্টার্সে খারাপ ফলাফল ও থিসিসের জন্য সুপারভাইজার না দেয়ায় এই মেধাবী ছাত্রকে হতাশাগ্রস্ত করে তোলা হয়েছে। এরই জেরে তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন বলে অভিযোগ। বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি (জিইবি) বিভাগের ২০১১-১২ সেশনের শিক্ষার্থী ছিলেন প্রতীক।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতীকের আত্মহত্যার জন্য শাবির জিইবি বিভাগের শিক্ষকদের দায়ী করেছেন তার বড় বোন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিউনিকেশন ডিসঅর্ডার বিভাগের শিক্ষক শান্তা তাওহিদা।

অনার্সে ১ম শ্রেণীতে ১ম হওয়া হওয়া সত্ত্বেও প্রতীককে মাস্টার্সে সুপারভাইজার না দেয়া এবং বিভিন্ন কোর্সে কম নম্বর দেয়ার অভিযোগ করেন শান্তা তাওহিদা।

এজন্য তিনি জিইবি বিভাগের সাবেক প্রধানসহ ৭ জন শিক্ষককে দায়ী করেছেন। সুপারভাইজার না দেয়ার বিষয়ে জিইবি বিভাগের তৎকালীন বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. আবুল কালাম আজাদ যুগান্তরকে বলেন, এ ক্ষেত্রে আমরা কিছু ক্রাইটেরিয়া ফলো করি। ঐ সেশনে একজন শিক্ষক একজন শিক্ষার্থী নিতে পারেন। যারা নিয়েছেন তাদের পর সে আর সুপারভাইজার খুঁজে পাননি।

বিভাগে জানানো হয়েছে কাউকে সুপারভাইজার করার জন্য বিভাগ সর্বসম্মতিক্রমে হয়তো চিন্তা করেছে কিন্তু কোনো টিচার রাজি হয়নি। এ ব্যাপারে জিইবি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক শামসুল হক প্রধান বলেন, সুপারভাইজার না দেয়া বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারছি না। আমি কিছুদিন হল বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্বে এসেছি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সঙ্গে আলাপে জানা যায়, বছরখানেক আগে প্রতীক একটি মেয়েকে নিয়ে বেড়াতে যায় এবং সেখানে দুর্ঘটনায় পড়ে মেয়েটি গুরুত্ব আহত হন। এর আগে অপর একটি মেয়ের সঙ্গেও তার সম্পর্ক ছিল, প্রায় দু’বছর আগে তা ভেঙে যায়। বছরখানেক আগে প্রতীকের বিরুদ্ধে তার ডিপার্টমেন্টে একটি তদন্ত হয়।

বিভাগের ৬ জন শিক্ষক ঐ তদন্ত করেন। তদন্ত কমিটির এক সদস্যের দাবি, প্রতীক বছরখানেক ধরে মানসিক রোগে ভুগছিল। সে দু’জন মানসিক ডাক্তারকেও দেখিয়েছিলেন।

প্রতীকের বিরুদ্ধে তদন্ত নিয়ে শাবির অধ্যাপক আজাদ বলেন, এর আগে সে অন্য একটা মেয়েকে নিয়ে দুর্ঘটনায় পড়েছিল এবং বিভাগের শিক্ষকদের সঙ্গে উচ্চবাচ্য করেছিল। যার কারণে বিভাগ তদন্ত করেছিল।

প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া তদন্ত করা যায় কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সবকিছু আমাদের জানা ছিল না। ১ম শ্রেণীতে ১ম একজন শিক্ষার্থী সুপারভাইজার না পাওয়ার বিষয়ে সাবেক এই বিভাগীয় প্রধান বলেন, সুপারভাইজারের স্বাক্ষর নিয়ে বিভাগে জমা দিতে হয়। কিন্তু সে সেটাও করেনি। সার্বিক বিষয়ে ডিপার্টমেন্টের পক্ষ থেকে বিবৃতি দিয়ে জানানো হবে বলেও জানান অধ্যাপক আজাদ।

প্রতীকের বন্ধু ফাহমিদ হোসেন ভূঁইয়া জানান, প্রতীক কয়েকদিন ধরে ব্যক্তিগত কিছু সমস্যা নিয়ে হতাশায় ছিল এবং বন্ধুদের সঙ্গেও যোগাযোগ কমিয়ে দিয়েছিল।

কয়েকটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানান কোতোয়ালি থানার এসআই আকবর হোসেন ভুইয়া। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ডিপার্টমেন্ট, বান্ধবী ও পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব এবং মানসিক দুরবস্থার ব্যাপারগুলো তদন্তে গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া হচ্ছে।

এসআই আকবর জানান, নীল রঙের কাপড় দিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করেছি। বাসার সামনে তার বান্ধবীকেও পেয়েছি। এ সময় তার গলায় একটি হেডফোন ছিল। তার কাছে ৩টি মোবাইলও ছিল। প্রযুক্তির সহায়তায় আমরা মোবাইলগুলোও খতিয়ে দেখব।

ঘটনার বিষয়ে ভিসি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে জানান, প্রায় এক বছর আগের কথা, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের পরপরই তার ফ্যামিলি থেকে প্রতীকের সুপারভাইজার না পাওয়ার বিষয়টি আমাকে জানানো হয়। আমি তখন তার ডিপার্টমেন্টকে বিষয়টি অবগত করি।

এরপর আমার সঙ্গে প্রতীক বা তার পরিবারের কেউ যোগাযোগ করেনি এবং পরবর্তীতে ফলাফল কী হয়েছিল এই ব্যাপারেও আমাকে অবগত করা হয়নি। ভিসি আরও জানান, প্রতীকের মতো একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার মর্মাহত।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার মৃত্যু নিয়ে যে সব আলোচনা হচ্ছে তা খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। আশা করি তদন্তের মাধ্যমে আসল ঘটনা বেরিয়ে আসবে।

প্রতীকের বাবা তৌহিদুজ্জামান সিলেটের কোতোয়ালি থানায় অপমৃত্যুর মামলা করেছেন বলে জানান থানার এসআই আকবর হোসেন ভূইয়া। এ ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রিকালচার অ্যান্ড মিনারেল সায়েন্স অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বেলাল উদ্দীনকে প্রধান করে কমিটি করা হয়। কমিটির অপর সদস্যরা হলেন গণিত বিভাগের অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল ইসলাম ও সহকারী প্রক্টর সামিউল ইসলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের জিইবি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, অনার্সে ১ম হওয়া ঐ শিক্ষার্থী মাস্টার্সে যৌথভাবে ৭ম স্থান অধিকার করে।

মাস্টার্স ১ম সেমিস্টারে তার রেজাল্ট ৩.৫৮ হলেও ২য় সেমিস্টারে তার রেজাল্ট ৩.৩৩ হয়। সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে লাশ গ্রহণকালে প্রতীকের বাবা তৌহিদুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, সব বিষয় আমার জানা নেই। এসব বিষয়ে আমার মেয়ে শান্তা তাওহিদা ভালো জানে, সে দেশে আসছে। আর তদন্ত যেহেতু হচ্ছে তাই আপাতত কিছু বলারও নেই।

সোমবার বিকালে নগরীর কাজলশাহ এলাকার একটি বাসা থেকে পুলিশ প্রতীকের ফ্যানে ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×