চাকরিতে প্রতিবন্ধী কোটা বহাল আছে: মন্ত্রিপরিষদ সচিব

প্রকাশ : ২২ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  যুগান্তর রিপোর্ট

ছবি-যুগান্তর

মন্ত্রিসভার অনুমোদন নিয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর সরকারি চাকরিতে সব ধরনের কোটা বাতিল করা হলেও প্রতিবন্ধীদের কোটা বহাল আছে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম এ তথ্য জানিয়ে বলেছেন, প্রশাসনিক আদেশ দিয়ে আইন কখনও অতিক্রম করা যায় না, বিভিন্ন জায়গায় প্রতিবন্ধীদের জন্য যেভাবে কোটা ছিল, ‘সেভাবেই আছে’। তবে প্রতিবন্ধীদের কোটা কার্যকর করা নিয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি তার কথায়।

সোমবার প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে তার কার্যালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন-২০১৩’ এবং ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা বিধিমালা-২০১৫’ এর আলোকে প্রতিবন্ধীবিষয়ক জাতীয় কর্ম-পরিকল্পনার খসড়া অনুমোদন পায়।

পরে সচিবালয়ে সংবাদ ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছে জানতে চাওয়া হয়- কর্ম-পরিকল্পনায় প্রতিবন্ধীদের কোটা নিয়ে আলোচনা হয়েছে কিনা? জবাবে শফিউল আলম বলেন, ‘আলোচনা হয়নি। তবে আইনে যে কোটা আছে সেটা বাদ দেয়া হয়নি। প্রশাসনিক আদেশ দিয়ে আইন কখনও সুপারসিড হয় না।’

প্রতিবন্ধীদের জন্য কত শতাংশ কোটা আছে- জানতে চাইলে শফিউল আলম বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন কোটা ছিল।’

গত বছর পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে নিয়োগে ৫৬ শতাংশ পদ বিভিন্ন কোটার জন্য সংরক্ষিত ছিল। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য ৩০ শতাংশ, নারী ১০ শতাংশ, জেলা ১০ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ৫ শতাংশ, প্রতিবন্ধী ১ শতাংশ বরাদ্দ ছিল। কোটা সংস্কার দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে কোটা ব্যবস্থা পর্যালোচনায় মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে কমিটি করে দেয় সরকার।

কমিটি প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর চাকরিতে কোটা বাতিল করে পুরোপুরি মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের সুপারিশ করলে গত বছরের ৩ অক্টোবর মন্ত্রিসভা তাতে সম্মতি দেয়। পরদিন প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটা সংশোধন করে পরিপত্র জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

পরে ৪০তম বিসিএসের নিয়োগ প্রক্রিয়াও কোটা না রাখার সিদ্ধান্ত নেয় পিএসসি। তাহলে প্রতিবন্ধীদের কোটা কীভাবে থাকছে- এ প্রশ্নে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘(কোটা) যা ছিল তাই আছে।’

রাষ্ট্রপতির ৭৫ হাজার শব্দের ভাষণ অনুমোদন : একাদশ জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের খসড়া অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। শফিউল আলম বলেন, সংবিধানের ৭৩(২) ধারা অনুযায়ী, সাধারণ নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম অধিবেশনের সূচনায় এবং প্রতি বছরের প্রথম অধিবেশনের শুরুতে রাষ্ট্রপতি সংসদে ভাষণ দেন।

২০১৯ সালের জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে দেয়ার জন্য রাষ্ট্রপতির ভাষণে যেসব বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে সেগুলো তুলে ধরে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘দেশের সার্বিক পরিস্থিতি ও সামষ্টিক অর্থনীতির চিত্র, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারের গৃহীত কার্যক্রম, রূপকল্প-২০২১ এবং রূপকল্প-২০৪১ বাস্তবায়নে বিভিন্ন খাতে গৃহীত কর্মসূচির রূপরেখা, দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গৃহীত পদক্ষেপ ও সাফল্য, কৃষির উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারের সাফল্য, দেশি ও বিদেশি কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা ও গ্রামীণ অর্থনীতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে আইসিটি প্রযুক্তির উন্নয়নকল্পে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের বিষয় থাকবে।’

তিনি জানান, রাষ্ট্রপতির ভাষণে আরও যে বিষয় থাকবে তা হল- তথ্য ও গণমাধ্যমের উন্নয়ন; আইনশৃঙ্খলা, জননিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা, আইন প্রণয়ন ও বিচারিক কার্যক্রম, জনপ্রশাসনের উন্নয়নে গৃহীত কার্যক্রম, বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অর্জিত সাফল্য, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিকাশ ও মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে গৃহীত কার্যক্রম, প্রশাসনিক নীতি, কৌশল, উন্নয়ন দর্শন এবং অগ্রযাত্রার দিকনির্দেশনা।

প্রসঙ্গত, রাষ্ট্রপতির ভাষণ দুটি ফর্মে তৈরি হয়। একটি মূল ভাষণ এবং আরেকটি পড়ার জন্য সংক্ষিপ্ত ভাষণ। মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, মূল ভাষণ ৭৫ হাজার শব্দের। সংক্ষিপ্ত ভাষণে প্রায় ছয় হাজার শব্দ আছে। বড় ভাষণটি টেবিলে থাকবে। মূল ভাষণের ইংরেজি করা হয়েছে।

কাজ ফেলে না রাখার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর : দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির পাশাপাশি জনবান্ধব প্রশাসন গড়া এবং কোনো কাজ ফেলে না রাখতে সহকর্মীদের নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে মন্ত্রিসভার নতুন সদস্যদের এমন নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী কী নির্দেশনা দিয়েছেন, জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, প্রধানমন্ত্রী বরাবর যে কথাগুলো বলে আসছেন, প্রথম হলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স। সব জায়গায় সুশাসন কায়েম করা। ‘আর সততা ও দক্ষতা- এগুলোর সঙ্গে কাজ করা। জনবান্ধব জনপ্রশাসন তৈরি করা। মানে কাজ ফেলে রাখা যাবে না, কাজ দ্রুত করতে হবে। বাংলাদেশকে একচল্লিশের (২০৪১ সালে উন্নত বাংলাদেশ) জায়গায় নিয়ে যেতে হলে আমাদের স্পিডে কাজ করতে হবে। এটা ম্যাসেজ আর কি।’

নবম ওয়েজ বোর্ডের মন্ত্রিসভা কমিটি পুনর্গঠন : নতুন সরকার গঠন হওয়ায় সংবাদপত্র ও বার্তা সংস্থার কর্মীদের বেতন বাড়াতে নবম মজুরি বোর্ডের সুপারিশ পর্যালোচনায় আগের মন্ত্রিসভা কমিটি পুনর্গঠন করেছে সরকার। সোমবার তার কার্যালয়ে নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে প্রধান করে সাত সদস্যের কমিটি করা হয় বলে সাংবাদিকদের জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব।

তিনি বলেন, ‘সরকারের শেষ সময় কমিটি করা হয়েছিল, মন্ত্রী পরিবর্তন হয়ে যাওয়ায় কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। পুনর্গঠিত কমিটিতে কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন, তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুন্নুজান সুফিয়ানকে সদস্য করা হয়েছে। নবম মজুরি বোর্ডের সুপারিশ পর্যালোচনায় গত ৩ ডিসেম্বর ওই সময়ের সংস্কৃতিমন্ত্রীকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের কমিটি করে দিয়েছিল মন্ত্রিসভা।

ওই কমিটিতে শিল্পমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তথ্যমন্ত্রী এবং শ্রম প্রতিমন্ত্রীকে রাখা হয়েছিল। আগের কমিটির সদস্যদের মধ্যে শুধু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল নতুন মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন। আগের কমিটির চারজন সদস্য মন্ত্রিসভায় না থাকায় ওই কমিটির সভা করা যায়নি বলে নতুন তথ্যমন্ত্রী হাসান মাহমুদ রোববার এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছিলেন।

এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, আগের কমিটির কার্যপরিধি ঠিক রাখা হয়েছে। সেই হিসেবে আগামী ২৮ জানুয়ারির মধ্যে নবম বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে। তবে পুনর্গঠিত কমিটি চাইলে সময় বাড়াতে পারবে।

প্রস্তাবিত নতুন কাঠামোতে পাঁচটি শ্রেণীতে ১৫টি বেতনক্রম নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে জানিয়ে শফিউল আলম এর আগে বলেছিলেন, প্রথম তিন গ্রেডে ৮০ শতাংশ এবং শেষের তিন গ্রেডে ৮৫ শতাংশ বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

এর আগে ২০১৩ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সাংবাদিকদের মূল বেতন ৭৫ শতাংশ বাড়িয়ে অষ্টম মজুরি কাঠামো ঘোষণা করে সরকার, যা ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর ধরা হয়। আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মো. নিজামুল হককে প্রধান করে গত ২৯ জানুয়ারি ১৩ সদস্যের নবম ওয়েজ বোর্ড গঠন করা হয়।

এরপর গত ১১ সেপ্টেম্বর সংবাদপত্র ও বার্তা সংস্থার কর্মীদের জন্য মূল বেতনের ৪৫ শতাংশ মহার্ঘ্য ভাতা ঘোষণা করে সরকার, যা গত ১ মার্চ থেকে কার্যকর করার কথা বলা হয়। বিচারপতি নিজামুল হক গত ৪ নভেম্বর সচিবালয়ে তখনকার তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর কাছে প্রতিবেদন জমা দেন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি অধিগ্রহণ আইন-২০১৯’র খসড়া অনুমোদন : বাসস জানায়, মন্ত্রিসভার বৈঠকে পার্বত্য চট্টগ্রাম (ভূমি অধিগ্রহণ) রেগুলেশন (সংশোধন) আইন-২০১৯’র খসড়া অনুমোদন দেয়া হয়েছে। গত সরকারের শেষ সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের ভূমি অধিগ্রহণে সমতলের জনগণের সঙ্গে সমতা বিধানের জন্য যে অধ্যাদেশটি জারি করা হয়েছিল সেটাকেই আইন আকারে আনা হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলম বলেন, ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের ব্যাপারে আগে সমতল এবং পাহাড় এ দুটির মধ্যে একটা ব্যবধান ছিল। সেখানে পাহাড়ের ভূমি অধিগ্রহণে ১৫ শতাংশ এবং সমতলের ভূমি অধিগ্রহণে ৩০০ শতাংশ দেয়া হতো। এই বৈষম্য হ্রাস করার লক্ষ্যেই সরকার গত মেয়াদের শেষ পর্যায়ে উভয়ের জন্যই ৩০০ শতাংশ ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করে এই সংক্রান্ত অধ্যাদেশটি জারি করেছিল। সেটিকেও এখন আইনে পরিণত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।