বিদায় কালজয়ী সুরস্রষ্টা

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের আজ দাফন মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে * শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাবেন সর্বস্তরের মানুষ

  হক ফারুক আহমেদ ২৩ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিদায় কালজয়ী সুরস্রষ্টা
সদ্যপ্রয়াত গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল

সব সময় বলতেন প্রকৃতি আমার শিক্ষাগুরু। জীবনের শুরুতে হাতে তুলে নিয়েছিলেন গিটার। মাত্র সাড়ে তেরো বছর বয়সে প্রথম গান লেখেন ‘ও মন ময়না, আয় ফিরে আয় না।’ অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা হয়ে পাকিস্তানিদের সঙ্গে লড়েছিলেন। যুদ্ধ শেষে আবারও সুরের জগতে ডুবে যান।

উপহার দেন ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’, মাঝি নাও ছাইড়া দে ও মাঝি পাল উড়াইয়া দে’, ‘সেই রেললাইনের ধারে’, ‘সুন্দর সুবর্ণ তারুণ্য লাবণ্য’, ‘ও মাগো আর তোমাকে ঘুম পাড়ানি মাসি হতে দেব না’, ‘আমার সারা দেহ খেয়গো মাটি’, ‘আমার বুকের মধ্যিখানে’, ‘আমার বাবার মুখে প্রথম যেদিন’, ‘আমি তোমারি প্রেমও ভিখারি’, ‘একাত্তরের মা জননী কোথায় তোমার মুক্তিসেনার দল’-এর মতো কালজয়ী সব গান।

কালজয়ী এই সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক, গীতিকার ও মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল আর নেই। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মঙ্গলবার ভোরে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহি ... রাজিউন)।

রাজধানীর আফতাবনগরে নিজ বাসায় তার হার্ট অ্যাটাক হয়। দ্রুত আয়েশা ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

হাসপাতালের ডাক্তাররা জানান, তিনি বাসাতেই হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতে ইসালমীর সাবেক আমীর গোলাম আযমের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছিলন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল।

বরেণ্য সুরকার, গীতিকার ও সঙ্গীত পরিচালক আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাষ্ট্রপতি এক শোকবার্তায় বলেন, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের মৃত্যু দেশের সাংস্কৃতিক জগতের জন্য একটি অপূরণীয় ক্ষতি। অসামান্য সৃষ্টিকর্মের জন্য চিরদিন মানুষ তাকে স্মরণ করবে।

শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী মহান মুক্তিযুদ্ধে ও সঙ্গীতাঙ্গনে বুলবুলের অসামান্য অবদানের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে বলেন, তার ইন্তেকালে দেশ একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং বিশিষ্ট সংগীত শিল্পী ও সুরকারকে হারাল। তার মৃত্যুতে আরও শোক জানিয়েছেন, জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ জানান, সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য আজ বেলা ১১টায় প্রয়াত আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হবে। সেখানে রাষ্ট্রীয়ভাবে গার্ড অব অনার প্রদান করা হবে এ মুক্তিযোদ্ধা শিল্পীকে।

দুপুর সাড়ে বারোটা পর্যন্ত শ্রদ্ধা জানানো হবে। জোহর নামাজের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর তার মরদেহ নেয়া হবে এফডিসি প্রাঙ্গণে। সেখানে শ্রদ্ধা জানানোর পর মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হবে।

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের ছেলে সামির আহমেদ জানান, বাবা অনেকদিন থেকেই অসুস্থ। তার হৃদযন্ত্রের ধমনিতে আটটি ব্লক ছিল। গত বছর মে মাসে রিং পরানো হয়। ইদানীং তার শরীর আরও খারাপ হয়ে যায়। মঙ্গলবার ভোর চারটার দিকে তিনি তার রেকর্ডিস্ট রোজনকে ফোন করে নিজেই অসুস্থতার কথা জানান।

এরপর সবাই তার কক্ষে ছুটে যান। অ্যাম্বুলেন্স খবর দেন। দ্রুত হাসপাতালে নেয়া হয়। ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. আশীষ চক্রবর্তী যুগান্তরকে বলেন, ‘আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলকে সকাল সোয়া ছয়টা নাগাদ হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। তখন চিকিৎসকরা প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তিনি আসলে বাসাতেই মারা গেছেন।’

গত বছরের ১৬ মে ফেসবুকে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল তার অসুস্থতার খবর জানিয়ে একটি পোস্ট দেন। তার চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছিলেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের মৃত্যুর সংবাদ শুনে শোকের ছায়া নেমে আসে দেশের সঙ্গীতাঙ্গনে।

তাৎক্ষণিকভাবে খবর পেয়ে শিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ, এন্ড্রু কিশোর, রুমানা ইসলাম, দিনাত জাহান মুন্নী, সালমা, সাব্বীর, গীতিকার আসিফ ইকবাল, কবীর বকুল, সঙ্গীত পরিচালক ইথুন বাবুসহ আরও অনেকেই তার বাসায় ছুটে যান।

কুমার বিশ্বজিৎ প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘আমাদের দেশাত্মবোধক গানে তিনি নিজেই একটা হৃৎপিণ্ড। তাকে হারানোর ক্ষতি কোনোভাবে পূরণ হবে না।’ জীবিত অবস্থায় নানা সময়ে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সময় কাটানো ও সাক্ষাৎকার নেয়ার সুযোগ হয় এ প্রতিবেদকের।

নিজের সঙ্গীতের শুরুর দিককার কথা নিয়ে ২০০৭ সালে এক সাক্ষাৎকারে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল বলেছিলেন, ‘আমার শৈশব কেটেছে ঢাকার আজিমপুর কলোনিতে। বাবা ওয়াফিজউদ্দীন আহমেদের সঙ্গে রেডিওতে গান শুনতাম।

গুনগুন করে গাইতাম, সুর তুলতাম। একটু বড় হওয়ার পর গিটার কিনি। বুলবুল নামে এক বড় ভাইয়ের কাছ থেকে বাজানো শিখি। এরপর নিজে নিজে বেইজ গিটার, পিয়ানো বাজানো শিখলাম। এভাবেই আমার সঙ্গীতচর্চা চলতে লাগল। সত্যি বলতে আমার কোনো গুরু ছিল না।

প্রকৃতি আমার শিক্ষাগুরু। সেখান থেকেই আমি শিখেছি। আমি জীবনে প্রথম গান লিখেছিলাম সাড়ে তেরো বছর বয়সে। গানটা ছিল- ‘ও ময়না আয় ফিরে আয় না।’ সেই সময়ের স্মৃতিচারণে আরও বলেন, নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীসহ আরও কয়েকজনকে নিয়ে একটি দল গঠন করেছিলাম।

আমরা রাত বারোটার পর হারমোনিয়াম হাতে পাড়া-মহল্লায় ঘুরে বেড়াতাম। গণসঙ্গীত, দেশাত্মবোধক গান গাইতাম। ২১ ফেব্রুয়ারির সকালবেলা প্রভাতফেরিতে যেতাম। এমনকি আবদুল লতিফ ভাইরা যখন গণসঙ্গীত পরিবেশন করতেন তখন আমরা তাদের গানগুলো শুনতাম, গাইতাম।’

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণে তিনি বলেন, ‘পনেরো বছর বয়সে আমি যুদ্ধে গিয়েছিলাম। সেক্টর-২ এ যুদ্ধ করেছি। দু’বার আর্মিদের হাতে ধরা পড়ি। জেলে ছিলাম প্রায় চার মাস। আমাকে যুদ্ধে যেতে প্রথম সাহস জোগায় আমার ভাই টুলটুল। তিনি যুদ্ধে যান ২৬ মার্চ।

এরপর আমিও মাকে বলে যুদ্ধে যাই। প্রথমে যাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। কাজ ছিল পাকিস্তানিদের বাঙ্কার খোঁজা। আমার সঙ্গে ছিল বন্ধু মানিক, মাহবুব। সেখানে আমি ধরা পড়ে যাই। আরও একবার ধরা পড়ি ঢাকায়। ছাড়া পাওয়ার পর আমি আর সারোয়ার মিলে নিউমার্কেটে গ্রেনেড চার্জ করি। ঈদের সময় পাকিস্তানিদের গাড়িতে আরেকবার গ্রেনেড ছুড়লাম।

যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের সঙ্গীতজীবন নিয়ে বলেন, ‘একটা সময়ে ব্যান্ড গঠন করেছিলাম ‘আফটার মেথ’ নামে। এরপর ’৭৬ সালে বিটিভিতে ঢুকি। শুরুর সাতটা বছর শুধুই দেশাত্মবোধক গান করেছি। চলচ্চিত্রে আমার সুর করা প্রথম গান ছিল নাগরদোলা ছবির ‘ও আমার মন কান্দে।’

এরপর ’৭৯ সালে ‘নয়নের আলো’ ছবি দিয়ে পরিপূর্ণভাবে চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনা শুরু করি। ‘আমার বুকের মধ্যখানে’সহ অনেকগুলো গান হিট হল। তবে আমি সঙ্গীত পরিচালক হওয়ার আগে সত্য সাহা, আলাউদ্দীন আলী, আলম খানের সহকারী হিসেবে কাজ করেছি।’

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের লেখা গানে শিল্পী সৈয়দ আবদুল হাদী, এন্ড্রু কিশোর, সাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লা, সামিনা চৌধুরীসহ কয়েক প্রজন্মের শিল্পীরা কণ্ঠ দিয়েছেন। তার লেখা ও সুর করা উল্লেখযোগ্য আরও গানের মধ্যে- একতারা লাগে না আমার দোতারাও লাগে না, আমার সারাদেহ খেয়ো গো মাটি, আমার বুকের মধ্যখানে, আমি তোমারি প্রেমও ভিখারি, ও আমার মন কান্দে, আইলো দারুণ ফাগুনরে, আমার একদিকে পৃথিবী একদিকে ভালোবাসা, আমি তোমার দুটি চোখে দুটি তারা হয়ে থাকব, আমার গরুর গাড়িতে বৌ সাজিয়ে, পৃথিবীর যত সুখ আমি তোমারই ছোঁয়াতে যেন পেয়েছি, তোমায় দেখলে মনে হয়, কত মানুষ ভবের বাজারে, বাজারে যাচাই করে দেখিনি তো দাম, আমার জানের জান আমার এই বুকে বইছে যমুনা, প্রেম কখনও মধুর, কখনও সে বেদনাবিধুর, অনন্ত প্রেম তুমি দাও আমাকেসহ আরও অনেক গান।

দেশের সঙ্গীত জগতে অবদানের জন্য আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ২০১০ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন। এছাড়া সঙ্গীতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননা এবং পুরস্কার লাভ করেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর গোলাম আযমের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছিলেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। ২০১২ সালের আগস্টে বুলবুল ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেয়ার পরের বছর খুন হন তার ছোট ভাই আহমেদ মিরাজ।

ঘটনাপ্রবাহ : আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল আর নেই

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×