চট্টগ্রাম বন্দরে নিলাম গুদাম

নতুনটি দখলে নিয়েও ছাড়ছে না পুরনোটি

নানা বাহানায় সময় ক্ষেপণ করছে চট্টগ্রাম কাস্টমস * বছরে ১ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং বঞ্চিত বন্দর

  মজুমদার নাজিম উদ্দিন, চট্টগ্রাম ব্যুরো ২৩ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নতুনটি দখলে নিয়েও ছাড়ছে না পুরনোটি

বারবার তাগাদা দেয়ার পরও চট্টগ্রাম বন্দরের সংরক্ষিত এলাকায় অবস্থিত পুরনো অকশন শেড বা নিলাম গুদামের দখল ছাড়ছে না চট্টগ্রাম কাস্টমস।

প্রায় ৫ একর আয়তনের এই গুদাম ছেড়ে দেয়ার শর্তে বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজস্ব অর্থায়নে ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি নতুন নিলাম গুদাম নির্মাণ করে দেয় কাস্টমসকে। প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে এর দখল বুঝে নেয় কাস্টমস। কিন্তু এতদিনেও নানা বাহানায় পুরনোটি ছাড়েনি।

এ নিয়ে বেকায়দায় পড়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। পুরনো গুদামের স্থানে নতুন ইয়ার্ড তৈরি করে সেখানে প্রতিবছর অন্তত এক লাখ টিইইউএস কনটেইনার পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের পরিকল্পনা নিয়েছিল বন্দর।

কিন্তু তা বাস্তবায়ন করতে পারছে না। এ অবস্থায় কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছতে পারছে না দেশের প্রধান এই সমুদ্রবন্দর। কাস্টমস কর্তৃপক্ষ নতুন গুদামে নিলাম শাখার দাফতরিক কার্যক্রম শুরু করলেও নিলামযোগ্য পণ্য এখানে স্থানান্তর না করায় বিশাল অঙ্ক ব্যয়ে নির্মিত এ গুদামটি কার্যত কোনো কাজে আসছে না। অনেকটা অব্যবহৃতই পড়ে আছে এটি।

বিপরীতে বন্দরের ভেতরে দিন দিন বেড়ে চলেছে নিলামযোগ্য পণ্য ও কনটেইনারের পরিমাণ। যার কারণে প্রায়ই ব্যাহত হচ্ছে বন্দরের স্বাভাবিক কাজকর্ম। আর এতে আমদানি-রফতানি সেবাদানকারী এ দুই প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

একটি সূত্র দাবি করেছে, কাস্টমসের একটি অসাধু চক্রের অনীহাই পুরনো গুদামের মালামাল নতুন গুদামে না নেয়ার মূল কারণ। অভিযোগ রয়েছে, পুরনো পণ্যের হিসাব দেয়ার ভয়ে কাস্টমস কর্মকর্তাদের একটি অংশ নতুন গুদামে মালামাল নিতে রাজি নন। এ কারণে নানা অজুহাত দেখিয়ে আসছেন তারা।

বন্দর সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম কাস্টমসের পুরনো নিলাম গুদামটির অবস্থান বন্দরের সংরক্ষিত এলাকায় এবং জেটির খুব কাছাকাছি। এ কারণে বন্দর কর্তৃপক্ষ কনটেইনার ইয়ার্ড হিসেবে এটি ব্যবহারের আগ্রহ প্রকাশ করে।

পরে উভয়পক্ষের সমঝোতা হয়- বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজ অর্থায়নে সংরক্ষিত এলাকার বাইরে একটি নতুন নিলাম গুদাম নির্মাণ করে দেবে। সে অনুযায়ী বন্দর স্টেডিয়ামের কাছে ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচ একর জায়গায় নতুন নিলাম গুদাম নির্মাণ করা হয়। ২০১৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর এটি উদ্বোধন হয় এবং বুঝে নেয় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এখন পর্যন্ত পুরনো গুদাম খালি করেনি তারা।

বন্দরের পরিবহন বিভাগের পরিচালক এনামুল করিম যুগান্তরকে বলেন, ‘পুরনো গুদাম থেকে নতুন গুদামে নিলামযোগ্য মালামাল স্থানান্তর করতে আমরা প্রতি মাসেই কাস্টমসকে চিঠি দিয়ে আসছি।

কিন্তু কিছু মালামাল নিয়ে মামলা আছে- এমন কথা বলে কাস্টমস সেগুলো সরিয়ে নিচ্ছে না। তাই আমরা পুরনো গুদামটির দখলও বুঝে পাচ্ছি না। পুরনো নিলাম গুদামটি ভেঙে নতুন ইয়ার্ড তৈরি করে কনটেইনার হ্যান্ডলিং বাড়ানোর পরিকল্পনা থাকলেও কাস্টমস নিলামযোগ্য মালামাল সরিয়ে না নেয়ায় বন্দর ওই স্থানে কিছুই করতে পারছে না।’

তবে কিছু পণ্য তারা নতুন গুদামে নিয়েছে। এ অবস্থায় গত বছরের ১৫ মার্চ বন্দরের বোর্ড রুমে তৎকালীন নৌপরিবহনমন্ত্রীর সভাপতিত্বে বন্দর ও কাস্টমসের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের সভা হয়।

ওই সভায় সিদ্ধান্ত হয়, এক মাসের মধ্যে যে কোনো উপায়ে পণ্য স্থানান্তর করতে হবে, যাতে বন্দর ওই স্থানে দ্রুত ইয়ার্ড নির্মাণের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে। ওই সভায় জানানো হয়, সেখানে নতুন ইয়ার্ড নির্মিত হলে বন্দর প্রতিবছর এক লাখ টিইইউএস কনটেইনার পণ্য বেশি হ্যান্ডলিং করতে পারবে।

এরপরও পুরনো গুদাম না ছাড়ায় গত বছরের ৪ অক্টোবর কাস্টমসকে আবারও চিঠি দেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। এতে বলা হয়, পুরনো গুদামে নিলাম ও ধ্বংসযোগ্য ১৯০টি গাড়ি পড়ে আছে, যার মধ্যে ৮৬টির আমদানি সময়কাল ১৫ বছরের ঊর্ধ্বে। এর মধ্যে যেসব গাড়ি বিআরটিএ’র রুট পারমিট পাওয়ার যোগ্য নয়, সেগুলো ধ্বংস করে অবশিষ্ট গাড়ি নতুন গুদামে স্থানান্তর করা যায়।

অন্যদিকে বন্দরের ভেতরে নিলামযোগ্য কনটেইনারভর্তি পণ্য ও অন্যান্য পণ্যের পরিমাণ বছর বছর বাড়ছে। বিভিন্ন ইয়ার্ডে প্রায় ৬ হাজার টিইইউএস কনটেইনার নিলামযোগ্য পণ্য রয়েছে, যা মোট কনটেইনারের ধারণক্ষমতার ৮ ভাগের এক ভাগ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কাস্টমসের নিলাম শাখার উপকমিশনার তপন চন্দ্র দে যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা নতুন নিলাম গুদামে কার্যক্রম শুরু করেছি। কিন্তু এখানে নিরাপত্তাজনিত সমস্যাসহ নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

গুদাম নির্মাণের সময় লাগানো বৈদ্যুতিক তার ও বাল্বগুলো কে বা কারা খুলে নিয়ে গেছে। শেডগুলো অন্ধকারেই থাকে। এছাড়া কনটেইনার এনে রাখার মতো হ্যান্ডলিং যন্ত্রপাতি এই গুদামে নেই।

তাই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও বন্দরের ভেতর থেকে নিলামযোগ্য কনটেইনার এনে এখানে রাখা যাচ্ছে না।’ তিনি জানান, ‘নতুন গুদামের তিনটি শেডের মধ্যে একটিতে কাস্টমসের কিছু পুরনো মালামাল রয়েছে। বাকি দুটি শেড খালি।’

বন্দর কর্তৃপক্ষের একাধিক কর্মকর্তা জানান, কাস্টমস কর্মকর্তাদের একাংশ পুরনো গুদাম থেকে নতুন গুদামে মালামাল স্থানান্তর করতে চান না। নিলাম শাখায় থাকা পণ্যের স্টক রেজিস্ট্রারের সঙ্গে বর্তমানে থাকা পণ্যের সামঞ্জস্য করতে না পারার শঙ্কায় ভুগছেন তারা।

এছাড়া নিলাম শাখাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট, যেখানে কাস্টমসের কিছু কর্মকর্তাও রয়েছেন।

তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে কাস্টমসের এক কর্মকর্তা বলেন, বন্দরের ভেতরের পুরনো গুদামে নিলামযোগ্য যেসব পণ্য রয়েছে, এর মধ্যে অনেক পণ্য নিয়ে মামলা রয়েছে। এ কারণে এগুলো স্থানান্তর করা যাচ্ছে না।

এছাড়া নতুন গুদাম ব্যবহারের জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষ ভাড়া দাবি করছে কাস্টমসের কাছে, সমঝোতায় এটি ছিল না। জানতে চাইলে নিলাম শাখার উপকমিশনার তপন চন্দ্র দেও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×