রাজউকের বড় প্রকল্প: দফায় দফায় বাড়ছে সময় ও ব্যয়

তিন প্রকল্পে ব্যয় বেড়েছে ৮ হাজার কোটি টাকা * এর মূল কারণ অবহেলা ও লুটপাট

  মতিন আব্দুল্লাহ ২৪ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজউকের বড় প্রকল্প: দফায় দফায় বাড়ছে সময় ও ব্যয়
রাজউকের বড় প্রকল্প: দফায় দফায় বাড়ছে সময় ও ব্যয়। ফাইল ছবি

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) বড় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা কাটছে না। এসব প্রকল্পে দফায় দফায় সময় ও ব্যয় বাড়ছে। এতে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়ের পাশাপাশি জনগণের ভোগান্তি বাড়ছে। মহাজোট সরকার অপচয়, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং জনদুর্ভোগ লাঘবে সোচ্চার হলেও রাজউক যেন এসবের বাইরে। প্রকল্পের শুরু হয়ে কবে শেষ হবে, তার জবাব জানা নেই কারও।

রাজউকের চলমান পূর্বাচল ও হাতিরঝিল প্রকল্পে ব্যয় বেড়েছে ৫ হাজার ২৩৪ কোটি টাকা। আর গুলশান লেক প্রকল্পের ব্যয় ৪১৪ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হচ্ছে ২ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা। এ প্রকল্পের ব্যয় আরও ২ হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছিল রাজউক।

তবে গণমাধ্যমের কঠোর সমালোচনার মুখে সেখান থেকে সরে এসেছে সংস্থাটি। রাজউকের অন্যান্য প্রকল্পেও এভাবেই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সময় ও ব্যয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, রাজউকের স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম, দুর্নীতি এবং লুটপাটের লক্ষ্যে প্রকল্পগুলোর সময় ও ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে। প্রকল্প শুরুর পর নানা কলাকৌশলে প্রকল্প সংস্কার, সময় বৃদ্ধি ও ব্যয় বৃদ্ধি করা হচ্ছে। এতে লাভবান হচ্ছেন প্রকল্প পরিচালকসহ রাজউকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট অন্যরা।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মুহাম্মদ খান যুগান্তরকে বলেন, রাজউকের প্রকল্পগুলো যে ব্যয়ের আকার দিয়ে শুরু হচ্ছে, সেটা তার তিনগুণ আকার দিয়ে শেষ হচ্ছে। আর সময়ও দফায় দফায় বাড়ানো হচ্ছে।

এটার কিছু কারণ রয়েছে, এর মধ্যে অন্যতম হল- রাজউক একটি কন্ট্রোলিং অথরিটি। কিন্তু তারা প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ করছে। রাজউকের কাঠামো কন্ট্রোলিংয়ের আদলে করা। সে কারণে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে জনবল স্বল্পতাসহ বহুবিধ অসক্ষমতার মুখোমুখি হচ্ছে। আর বাইরের যেসব সংস্থাকে দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে, তাদের ওপর কন্ট্রোল করার ক্ষমতা না থাকায় সেসব কাজও সঠিক সময়ে বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, রাজউকের প্রকল্পগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শুরুতে প্রকল্পের যেসব কমপোনেন্ট থাকে, পরে অনেক বিষয় সংযুক্ত হয়। এতে প্রকল্পের ব্যয় ও সময় বাড়ানোর বিকল্প থাকে না। শুরুতে এত বড় আকার দিলে এসব প্রকল্প অনুমোদন পেত না। কিন্তু পরে সংশোধন করা সহজ। সেই সুযোগটা রাজউক নিচ্ছে। এর নেপথ্যে লুটপাটের চিন্তা তো থাকেই।

এ ব্যাপারে রাজউক চেয়ারম্যান আবদুর রহমান বলেন, জমি অধিগ্রহণ, মামলাসহ নানাবিধ যৌক্তিক কারণে রাজউকের প্রকল্পের আকার ও সময় বাড়ানো হয়ে থাকে। আগে প্রকল্পগুলো যে গতিতে চলছিল, তার তুলনায় এখন প্রকল্পের গতি অনেক বেশি।

এ প্রসঙ্গে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম যুগান্তরকে বলেন, রাজউকের বড় বড় প্রকল্পের সময় ও ব্যয় বাড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। আমি সব প্রকল্পের কার্যক্রম খোঁজখবর নিতে শুরু করেছি। দ্রুত সময়ের মধ্যে রাজউকের প্রকল্পগুলো শেষ করা এবং অহেতুক ব্যয় বৃদ্ধি যাতে না হয়, সেদিকে খেয়াল রেখে কাজ করছি।

পূর্বাচল : ঢাকা শহরকে পূর্বদিক সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ১৯৯৫ সালে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। দফায় দফায় প্রকল্পের সময় বাড়িয়ে ২৪ বছরেও প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। এ সময়ের মধ্যে প্রকল্পের ৬০ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি করছে রাজউক।

আর সংশোধিত মেয়াদকাল অনুযায়ী ২০২০ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পের বাকি কাজ শেষ করা সম্ভব বলে অভিমত প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের। তারা বলছেন, প্রকল্পের অবৈধ দখলদার হটানোসহ অন্যান্য কার্যক্রমে গতি আনতে নৌবাহিনীর প্রকৌশল বিভাগকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এ প্রকল্পের প্রথম আকার ছিল ৩ হাজার ৩১১ কোটি টাকা। দফায় দফায় প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোয় আকার দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৭৮২ কোটি টাকা। এ প্রকল্পে সর্বমোট প্রকল্প ব্যয় বাড়ানো হয়েছে ৪ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা।

ঢাকার জিরো পয়েন্ট থেকে মাত্র ১৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত পূর্বাচল প্রকল্প শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীবেষ্টিত। প্রকল্পটি ৬ হাজার ২৭৭ একর নিয়ে অবস্থিত। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার ৪ হাজার ৫৭৭ একর এবং গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার ১ হাজার ৫০০ একর জমি অধিগ্রহণ করে প্লট, সড়ক এবং অন্যান্য অবকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। এছাড়া খিলক্ষেত এলাকার ১৫০ একর জমি অধিগ্রহণ করে ‘কুড়িল-পূর্বাচল’ ৩০০ ফুট সংযোগ সড়ক তৈরি করা হয়েছে।

হাতিরঝিল : ২০০৭ সালের জুলাইয়ে শুরু হয় হাতিরঝিল প্রকল্পের উন্নয়ন কাজ। এ প্রকল্পের ছয়বার সময়, তিনবার ব্যয় ও চারবার প্রকল্প সংশোধন করা হয়েছে। সর্বশেষ সময়কাল অনুযায়ী চলতি বছরের জুনের মধ্যে প্রকল্পের সব কাজ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু এখনও শেষ হয়নি ম্যানেজমেন্ট ভবন নির্মাণকাজ। আর তেজগাঁও বউবাজার লিং রোডের জন্য জমি অধিগ্রহণ কাজ এখনও শেষ হয়নি।

শুরুতে এ প্রকল্পে ব্যয় ছিল ১ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা। দফায় দফায় প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে প্রকল্পের আকার দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা। প্রকল্পের কাজের গতি বলে দিচ্ছে, বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হচ্ছে না। আর এ সময়ের মধ্যে হাতিরঝিল প্রকল্পের কাজ শেষ না হলে আবারও প্রকল্পের সময় বৃদ্ধি করতে হবে। আর প্রকল্পের সময় বাড়লে ব্যয় বাড়ারও আশঙ্কা রয়েছে। ৩১১ দশমিক ৭৯ একর জায়গাজুড়ে হাতিরঝিল প্রকল্প।

এ প্রকল্পে ১৭ কিলোমিটার সড়ক, ২টি ইউলুপ, ৪টি ব্রিজ, ৩টি ভায়াডাক্ট এবং ৪টি ওভারপাস তৈরি রয়েছে। বেগুনবাড়ী খাল এ প্রকল্পকে দৃষ্টিনন্দন করেছে। দফায় দফায় হাতিরঝিল প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৬৩ কোটি টাকা।

গুলশান লেক : যানজট নিরসনের কথা বলে গুলশান-বনানী-বারিধারা লেকের উন্নয়ন প্রকল্প ব্যয় ৪১৪ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে প্রায় ৫ হাজার (৪ হাজার ৮৮৬ কোটি) টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব করেছিল রাজউক। কিন্তু গণমাধ্যমের কঠোর সমালোচনার মুখে প্রস্তাবিত প্রকল্পের সংশোধিত প্রকল্পের আকার করা হচ্ছে ২ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা। প্রসঙ্গত, ২০১০ সালে গৃহীত ৪১৪ কোটি টাকার প্রকল্পে লেক খনন ও ওয়াকওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল।

সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাবনার সঙ্গে গুলশান-বনানী-বারিধারা এলাকার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট যুক্ত করে যানজট নিরসনের প্রস্তাবনা রয়েছে। এক্ষেত্রে লেকগুলো কার্যকর প্রবহমান করতে ৮০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হবে। এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে গুলশান-বনানী ও বারিধারা লেকের ২২২ একর আয়তন বেড়ে দাঁড়াবে ৩০০ একর।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, এখন পর্যন্ত রাজউক ২৬০ কোটি টাকা লেক খনন ও উন্নয়ন কাজে খরচ করেছে। অথচ গুলশান-বনানী-বারিধারা লেকের কোনো উন্নয়নই দৃশ্যমান নয়। এলাকাবাসীর অভিযোগ, সড়ক-ফুটপাত উন্নয়ন ও লেক খননের নামে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও প্রকৌশলীরা যোগসাজশ করে সব নয়ছয় করছেন। খনন কাজ না করেও বিল উঠিয়ে নিচ্ছেন। এসব কাজের কোনো হিসাব রাখছেন না সংশ্লিষ্টরা।

ড্যাপ প্রকল্প : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ডামাডোলের কারণে সংশোধিত ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) প্রণয়নের মাঠপর্যায়ের কাজ সঠিকভাবে করতে পারেনি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। এ কারণে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের নির্ধারিত সময় সংশোধিত ড্যাপের গেজেট প্রকাশ করা হয়নি। সব কাজ শেষ করে জুনের মধ্যে সংশোধিত ড্যাপের গেজেট প্রকাশ করার লক্ষ্যে তৃতীয় দফায় ৬ মাসের সময় বাড়ছে। এ প্রস্তাবনা রাজউক থেকে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

২০১৫ সালের মার্চে শুরু হয়েছে সংশোধিত ড্যাপ প্রণয়ন কার্যক্রম। প্রথমে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সংশোধিত ড্যাপ চূড়ান্ত হওয়ার কথা থাকলেও পরে সময় বাড়িয়ে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়। এ সময়েও সংশোধিত ড্যাপ প্রণয়নের কাজ শেষ করতে না পারায় জুন পর্যন্ত সময়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে রাজউক। সংশোধিত ড্যাপ প্রণয়নের সময় বাড়লেও প্রকল্প ব্যয় বাড়েনি। ড্যাপ প্রকল্প বাস্তবায়নের ব্যয় বরাদ্দ ৩৭ কোটি টাকা।

এবার ড্যাপ প্রণয়ন হচ্ছে ২০১৬ থেকে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত ২০ বছরের জন্য। স্ট্রাকচার প্ল্যানের (১৯৯৫-২০১৫) পলিসির আলোকে রাজউকের আওতাধীন ১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার (৫৯০ বর্গমাইল) এলাকাব্যাপী প্রণীত ড্যাপ গেজেট আকারে প্রকাশিত হয় ২০১০ সালের ২২ জুন। এর মেয়াদ ধরা হয় ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত। সংশোধিত ড্যাপ কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরনো ড্যাপ বাতিল হয়ে যাবে। এর আগে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের আর্থিক সহযোগিতায় রাজউক রিভাইজড ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যান (২০১৬-২০৩৫) প্রণয়ন করেছে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×