যাত্রীকল্যাণ সমিতির প্রতিবেদন

এক বছরে সড়কে নিহত ৭২২১

রেল, নৌ ও আকাশপথ মিলিয়ে মৃত্যু ৭৭৯৬ জনের * ৪১ শতাংশ মৃত্যু গাড়িচাপায় * বেপরোয়া গতি, অসতর্কতা, চলন্ত অবস্থায় ফোন ব্যবহার অন্যতম প্রধান কারণ

প্রকাশ : ২৬ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  যুগান্তর রিপোর্ট

২০১৮ সালে পাঁচ হাজার ৫১৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় সাত হাজার ২২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১৫ হাজার ৪৬৬ জন। আগের বছর দেশে চার হাজার ৯৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় সাত হাজার ৩৯৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ওই বছর আহত হয়েছিলেন ১৬ হাজার ১৯৩ জন।

সড়ক, রেল, নৌ ও আকাশ পথ মিলিয়ে গত বছর মোট ছয় হাজার ৪৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় সাত হাজার ৭৯৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ১৫ হাজার ৯৮০ জন। বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির ‘২০১৮ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে’ এ তথ্য উঠে এসেছে।

জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে শুক্রবার এ প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তিনি জানান, দেশের জাতীয়, আঞ্চলিক ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সড়ক দুর্ঘটনার সংবাদের আলোকে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

মোজাম্মেল হক বলেন, বিদায়ী বছরের ৩ এপ্রিল রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনায় কলেজছাত্র রাজীবের বিচ্ছিন্ন হাত দুই বাসের মাঝে আটকে থাকার ছবি দেশের মানুষের হৃদয় কাঁদিয়েছে। এর রেশ কাটতে না কাটতেই ২০ এপ্রিল রাস্তা পার হতে গিয়ে গৃহকর্মী রোজিনা পা হারান। পরে হাসপাতালে মারা যান। ২৯ জুলাই কুর্মিটোলায় শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী বাসচাপায় নিহত হওয়ার পর সারা দেশে প্রতিটি স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নেমে আসে। ২৭ আগস্ট চট্টগ্রামের সিটি গেট এলাকায় বাসে অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে বিতর্কের জেরে রেজাউল করিম রনি নামে এক যাত্রীকে বাস থেকে ফেলে হত্যা করা হয়। ২৮ আগস্ট রাস্তা পার হাওয়ার সময় কুষ্টিয়ায় বাসের ধাক্কায় মায়ের কোল থেকে পরে শিশু আকিফা নিহত হয়।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত বছর ২৩ জুন একদিনে ৬২ জনের প্রাণহানির ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। উদ্বেগজনক হারে প্রাণহানিতে ২৫ জুন মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী সড়ক নিরাপত্তায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেন। এ ছাড়া নতুন সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে নিরাপদ সড়কের অঙ্গীকার করা হয়।

মোজাম্মেল হক বলেন, ২০১৮ সালে রেলপথে ৩৭০টি দুর্ঘটনায় ৩৯৪ জন নিহত ও ২৪৮ জন আহত হয়েছেন। নৌপথে ১৫০টি দুর্ঘটনায় ১২৬ জন নিহত ও ২৩৪ জন আহত হয়েছেন। নিখোঁজ রয়েছেন ৩৮৭ জন। আকাশপথে পাঁচটি দুর্ঘটনায় গত বছর ৫৫ জন নিহত ও ৩২ জন আহত হয়েছেন।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, গত বছর সড়কে যাদের প্রাণ গেছে, তাদের ৭৮৭ জনই নারী। শিশু ৪৮৭ জন। নিহতদের মধ্যে এক হাজার ২৫২ জন চালক ও শ্রমিক, ৮৮০ শিক্ষার্থী, ২৩১ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ১০৬ শিক্ষক ও ৩৪ সাংবাদিক রয়েছেন। সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনায় পড়েছে ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান।

এ ধরনের বাহনের দুর্ঘটনায় পড়ার হার মোট দুর্ঘটনার ২৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ, মোটরসাইকেল ২৫ দশমিক ৩০ শতাংশ, বাস ১৮ দশমিক ৯২, অটোরিকশা ৯ দশমিক ৬১, নছিমন-করিমন ৫ দশমিক ৮০ শতাংশ। ৪১ দশমিক ৫৩ শতাংশ মৃত্যু হয়েছে গাড়িচাপায়, ২৯ দশমিক ৭২ শতাংশ ক্ষেত্রে দুই বাহনের মুখোমুখি সংঘর্ঘে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, আর গাড়ি খাদে পড়ে ১৬ দশমিক ১৮ শতাংশ মৃত্যু ঘটেছে।

সমিতির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, সড়ক-মহাসড়ক ও রাস্তা-ঘাটের নির্মাণ ক্রটি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, যাত্রী ও পথচারীদের অসতর্কতা, চলন্ত অবস্থায় মোবাইল বা হেড ফোন ব্যবহার, মাদক সেবন করে যানবাহন চালানো, মহাসড়ক ও লেভেল ক্রসিংয়ে ফিডার রোডের যানবাহন উঠে পরা, রাস্তায় ফুটপাত না থাকা বা ফুটপাত বেদখলে থাকা, যানবাহনে অতি পণ্য বা যাত্রী বহন এবং সড়কে ছোট যানবাহনের সংখ্যা বাড়ায় দুর্ঘটনা বাড়ছে।

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বেশ কিছু সুপারিশও তুলে ধরেছে সংগঠনটি। সেখানে বলা হয়েছে- ট্রাফিক আইন, মোটরযান আইন ও সড়ক ব্যবহার বিধিবিধান সম্পর্কে স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সাধারণের মধ্যে ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে। একই সঙ্গে টিভি-অনলাইন, সংবাদপত্র ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সড়ক সচেতনতামূলক বা দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে।

জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশ থেকে হাট-বাজার অপসারণ, ফুটপাত দখলমুক্ত করা, রোড সাইন (ট্রাফিক চিহ্ন) স্থাপন করা, জেব্রাক্রসিং দেয়া, চালকদের পেশাগত প্রশিক্ষণ ও নৈতিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা, যাত্রীবান্ধব সড়ক পরিবহন আইন ও বিধিবিধান প্রণয়ন, গাড়ির ফিটনেস ও চালকদের লাইসেন্স দেয়ার পদ্ধতিগত উন্নয়ন-আধুনিকায়ন, জাতীয় মহাসড়কে কম গতি ও দ্রুত গতির যানের জন্য আলাদা লেনের ব্যবস্থা করা এবং লাইসেন্স নবায়নের সময় চালকদের জন্য ডোপ টেস্টের ব্যবস্থা করার কথা এসেছে তাদের সুপারিশে।

সংসদে পাস হওয়া সড়ক পরিবহন আইন দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানানোর পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে সড়ক নিরাপত্তা তহবিল গঠনের সুপারিশ করেছে যাত্রীকল্যাণ সমিতি।

মোজাম্মেল হক বলেন, গত কয়েক বছরে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে যানবাহনের সংখ্যানুপাতে দুর্ঘটনার সংখ্যা ‘অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে’ রাখা সম্ভব হয়েছে। সরকার নির্বাচনী অঙ্গীকারের প্রতিফলন ঘটিয়ে সড়ক নিরাপত্তায় যথাযথ পদক্ষেপ নিলে আগামীতে সড়ক দুর্ঘটনা আরও নামিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আমরা মনে করি।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান সংবাদ সম্মলনে উপস্থিত ছিলেন।