ভেজাল মেশানো ‘মারাত্মক দুর্নীতি’

দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে ভেজাল নিরূপণের নির্দেশ

  যুগান্তর রিপোর্ট ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য
দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য। ফাইল ছবি

সারা দেশে কোনো কোনো কোম্পানির দুধ ও দুগ্ধজাত খাদ্যপণ্যে কী পরিমাণ ব্যাকটেরিয়া, কীটনাশক ও সিসা মেশানো রয়েছে, তা নিরূপণে বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ করে জরিপ চালাতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

আদেশ পাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউশন (বিএসটিআই), নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও কেন্দ্রীয় নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা সমন্বয় কমিটিকে হলফনামা আকারে প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে বলা হয়েছে।

একই সঙ্গে এই খাদ্যে ভেজাল মেশানো এবং ব্যাকটেরিয়া, কীটনাশক, অ্যান্টিবায়োটিক, সিসা, রাসায়নিকের উপস্থিতি পাওয়ার ঘটনায় কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান জড়িত কি না, তা অনুসন্ধান করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দুদক চেয়ারম্যানকে বলা হয়েছে। এ ছাড়া দুধ, দই ও দুগ্ধজাত পণ্যে ভেজাল মেশানোকে ‘মারাত্মক দুর্নীতি’ বলে মন্তব্য করেছেন আদালত। আদালত বলেছেন, ‘খাদ্যে ভেজাল মেশানো একটি সিরিয়াস করাপশন। এ ধরনের ভেজালে মানুষের কিডনি, লিভার নষ্ট হচ্ছে, ক্যান্সার হচ্ছে।’

এ বিষয়ে কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন আদালতের নজরে আনা হলে সোমবার বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি একেএম হাফিজুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

আদালতের দেয়া রুলে বলা হয়েছে, নিরাপদ দুধ, দই ও গো-খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে ও ভেজাল প্রতিরোধে বিবাদীদের ব্যর্থতা ও নিষ্ক্রিয়তা কেন বেআইনি ও অবৈধ ঘোষণা করা হবে না? পাশাপাশি দুধ-দই ও গো-খাদ্যে ভেজাল মেশানোর সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়ার নির্দেশ কেন দেয়া হবে না, তাও জানতে চাওয়া হয়েছে। খাদ্য সচিব, স্বাস্থ্য সচিব, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সচিব, কৃষি সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, কেন্দ্রীয় নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা সমন্বয় কমিটি, দুর্নীতি দমন কমিশন ও বিএসটিআই চেয়ারম্যানকে চার সপ্তাহের রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।

শুনানির একপর্যায়ে দুধ, দই ও দুগ্ধজাত পণ্যে ভেজাল মেশানোকে ‘মারাত্মক দুর্নীতি’ বলে মন্তব্য করেছেন আদালত। আদালত বলেছেন, ‘খাদ্যে ভেজাল মেশানো একটি সিরিয়াস করাপশন। এ ধরনের ভেজালে মানুষের কিডনি, লিভার নষ্ট হচ্ছে, ক্যান্সার হচ্ছে। বিচারক উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘মানুষ শুধু টাকার পেছনে ঘুরছে। দেশ ও দেশের মানুষ নিয়ে কেউ ভাবছে না। স্বাস্থ্যই যদি ঠিক না থাকে, তাহলে এত টাকা-পয়সা দিয়ে হবেটা কী?’ আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল একেএম আমিন উদ্দিন মানিক। দুদকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব।

মামুন মাহবুব সাংবাদিকদের বলেন, ‘দুধ, দই, গো-খাদ্যে ভেজাল মেশানো এবং তা বাজারজাত করাকে আদালত সিরিয়াস করাপশন বলেছেন। এ বিষয়ে অনুসন্ধান, তদন্ত করে ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে দুদককে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।’ আমিন উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আদেশের আগে প্রথমেই আদালত এ বিষয়ে সরকার ও দুদকের বক্তব্য জানতে চান। পরে আদালত অন্তর্বর্তী নির্দেশনাসহ রুল জারি করেছেন।’ আগামী ৩ মার্চ পরবর্তী আদেশের জন্য রেখেছেন।

আদালত ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারে প্রকাশিত প্রতিবেদনের প্রতিবেদককে প্রতিবেদনটি হলফনামা আকারে দাখিল করতে বলেছেন। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) আর্থিক সহায়তায় গো-খাদ্য, দুধ, দই ও বাজারে থাকা প্যাকেটের পাস্তুরিত দুধ নিয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠান জাতীয় নিরাপদ খাদ্য গবেষণাগার (এনএফএসএল) জরিপ চালায়। এনএফএসএল জরিপের জন্য দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গাভির দুধের ৯৬টি নমুনা সংগ্রহ করে। ঢাকাসহ তিন জেলার ছয়টি উপজেলাসহ ১৮টি স্থান থেকে দুধের পাশাপাশি অন্যান্য নমুনাও সংগ্রহ করা হয়। গাভির দুধ ও গো-খাদ্য সরাসরি খামার থেকে সংগ্রহ করা হয়।

ঢাকা শহরের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের দোকান ও আশপাশের উপজেলার দোকান থেকে দই সংগ্রহ করে এনএফএসএল। বিভিন্ন সুপার স্টোর থেকে সংগ্রহ করা হয় বাজারে প্রচলিত প্রায় সব ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত তরল দুধ ও আমদানি করা প্যাকেট দুধ।

গো-খাদ্যের ৩০টি নমুনা পরীক্ষা করে কীটনাশক (২ নমুনায়), ক্রোমিয়াম (১৬টি নমুনায়), টেট্রাসাইক্লিন (২২টি নমুনায়), এনরোফ্লোক্সাসিন (২৬টি নমুনায়), সিপ্রোসিন (৩০টি নমুনায়) ও আফলাটক্সিন (৪টি নমুনায়) গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি মাত্রা পাওয়ার কথা জানিয়েছে এনএফএসএল।

গাভির দুধের ৯৬টি নমুনার মধ্যে ৯ শতাংশ দুধে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি কীটনাশক, ১৩ শতাংশে টেট্রাসাইক্লিন, ১৫ শতাংশে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি মাত্রায় সীসা পেয়েছে তারা। ৯৬ শতাংশ দুধে বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়াও পাওয়া গেছে। প্যাকেটের দুধের ৩১টি নমুনার ৩০ শতাংশে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি হারে টেট্রাসাইক্লিন পাওয়ার কথাও জানিয়েছে এনএফএসএল। একটি নমুনায় সিসা মিলেছে। একই সঙ্গে ৬৬-৮০ শতাংশ দুধের নমুনায় বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া পাওয়ার কথা জানিয়েছে তারা।

দইয়ের ৩৩টি নমুনা পরীক্ষা করে একটিতে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি সিসা পাওয়ার কথা জানিয়েছে এনএফএসএল। ৫১ শতাংশ নমুনায় মিলেছে বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×