গাজীপুরের আতঙ্ক ‘লিটন বাহিনী’

প্রতিপক্ষরা আমাকে হেয় করতে এই মিথ্যা অভিযোগ সাজিয়েছে -লিটন মিয়া * কেউ অভিযোগ করেনি, করলে ব্যবস্থা নিতাম -ওসি

  গাজীপুর প্রতিনিধি ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গাজীপুরের আতঙ্ক ‘লিটন বাহিনী’

গাজীপুরের সাবেক এসপি হারুন-অর-রশিদ আতঙ্কে দুই বছর আত্মগোপনে ছিলেন লিটন বাহিনী প্রধান লিটন মিয়া।

এসপি হারুনের বদলি ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সুযোগে সদলবলে এলাকায় ফেরেন তিনি। উল্টো এখন লিটন বাহিনীর আতঙ্কে স্থানীয়রা।

জমি দখল, ভাড়ায় জমি দখলের কাজ করা থেকে শুরু করে সিন্ডিকেট করে শতাধিক গার্মেন্টের ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণসহ সব কাজের কাজী এই লিটন বাহিনী।

সদর উপজেলার গিলাগাছিয়ার বাসিন্দা প্রয়াত কৃষক আজিম উদ্দিনের ছেলে লিটনের বাড়ি কাপাসিয়া উপজেলার মৈশাধামনা গ্রামে হলেও থাকেন উত্তরায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে।

চলাফেরা করেন দামি প্রাডো গাড়িতে। বাবা আজিম উদ্দিনের দিন অর্থকষ্টে পার হলেও তারই পুত্রধন লিটনের অর্থ-বিত্তের কমতি নেই। এলাকায় নিজেকে এক্সপোর্ট-ইমপোর্টের ব্যবসায়ী পরিচয় দিলেও বাস্তবে সেরকম কিছু-ই চোখে পড়েনি।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে লিটন মিয়া জানান, ‘আমার প্রতিপক্ষরা আমাকে হেয় করতে মিথ্যা অভিযোগ সাজিয়েছে। যারা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে তারা আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে। একসময় যারা মহিষের গাড়ি চালাত, তারাও এখন কোটি টাকার মালিক বনেছেন।’ দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার বিষয়ে লিটন মিয়া জানান, চার বছর আগে গাজীপুর-৩-এর সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট রহমত আলীর সঙ্গে কাজ করতাম। পরে কোন্দলের কারণে আমি নীরব হয়ে যাই।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, লিটন বাহিনীর মূল কাজ হচ্ছে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার বিতর্কিত জমি ও বাড়ি দখল, যাত্রার নামে জুয়া-হাউজি, নগ্ন নৃত্যানুষ্ঠানের আয়োজন করে অর্থ উপার্জন করা। অভিযোগ আছে, গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতার ছত্রছায়ায় তিনি এসব করে বেড়াচ্ছেন। কথা হয় লিটন বাহিনীর আক্রমণের শিকার গাজীপুর সদরের মনিপুরের আবু সাঈদের সঙ্গে।

তিনি জানান, ২০১৪ সালে পৈতৃকসূত্রে ৫৪ শতাংশ জমিতে নির্মিত আমার বাড়ির দখল নেয় লিটন বাহিনী। আবদুল হক, শাহজালালসহ প্রায় শতাধিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাড়িতে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়।

কেড়ে নেয় আমার পুকুরের মাছ ও গাছ-গাছালি। জয়দেবপুর থানায় লিখিত অভিযোগ করেও কাজ হয়নি। পরে আদালতে যাই। গত বছর উচ্চ আদালতের নির্দেশে জমি ও বাড়ি ফিরে পাই। এখনও হুমকি দেয়া হচ্ছে।

আবু সাঈদের ভগ্নিপতি ইউনুস আলী সিকদার জানান, আমারও ১৭ শতাংশ জমি দখল করে ওরা। মনিপুর মধ্যপাড়া এলাকার মাসুদ রানা জানান, গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় লিটন বাহিনীর জব্বার, শফিকুল, কছুমুদ্দিন, নছুমুদ্দিন, সুলতানসহ প্রায় ৭০-৮০ জন সন্ত্রাসী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তার মাছ চাষ প্রকল্পে হানা দিয়ে অন্তত ৫০ হাজার টাকার মাছ ছিনিয়ে নেয়।

লিটনের সহযোগী কালা জব্বার এই চাষ প্রকল্পে অংশীদার হতে চেয়েছিল, রাজি না হওয়ায় লুটে নিল আমার মাছ। আমার চাচী সুজিয়া বেগম বুধবার জয়দেবপুর থানায় লিখিত অভিযোগ করলেও পুলিশ ব্যবস্থা নেয়নি।

এ প্রসঙ্গে জয়দেবপুর থানার ওসি আসাদুজ্জামান জানান, মাসুদ রানা থানায় কোনো অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া যায়। সদরের বিকেবাড়ী এলাকার স্থানীয় ব্যবসায়ী রুবেল রানা জানান, গত বছর লিটন মিয়া তার কাছ থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা ধার নেয়। টাকা আদায়ের জন্য আমাকে মামলা পর্যন্ত করতে হয়েছে ওর বিরুদ্ধে।

গত ২২ জানুয়ারি সন্ধ্যায় সদর উপজেলার মনিপুর থেকে হোতাপাড়া যাওয়ার পথে বাবুল হোসেন সিকদার (৪০) নামের এক ব্যবসায়ীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করে লিটন বাহিনী। আগে থেকেই তাকে হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিল। বাবুল হোসেন পরে যুগান্তরকে বলেন, ঘটনার পর তার ভাই ওসমান গনি জয়দেবপুর থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ বাদীকে বসিয়ে রেখে পুলিশ বাবুলদের বিরুদ্ধে লিটন মিয়ার সাজানো মামলা নেয়। ওই মামলায় ওসমান গণিকে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেফতারও করা হয়। পরে তিনি জামিন পান। এ প্রসঙ্গে জয়দেবপুর থানার ওসি আসাদুজ্জামান আগে মামলা নেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, কোনো আসামি যদি থানায় উপস্থিত হয় তাহলে আমরা কী করতে পারি? লিটন বাহিনীর নির্যাতনের শিকার গাজীপুর সদরের মনিপুর ক্যাবল ভিশনের মালিক মহসিন আলম কবিরাজ জানান, বেশ কয়েকবার বাহিনী তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে অনেক ক্ষতি করেছে। এ নিয়ে পুলিশের তৎকালীন আইজি একেএম শহিদুল হকের সঙ্গে দেখা করি। আইজি তাৎক্ষণিকভাবে গাজীপুরের তৎকালীন এসপি হারুন-অর-রশিদকে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন। তার পর থেকে লিটন বাহিনী গাঢাকা দেয়। লিটন বাহিনীর উৎপাত নিয়ে কথা হয় জয়দেবপুর থানার ওসি আসাদুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, লিটন মিয়া অত্যধিক বাড়াবাড়ি করছে। তবে তার বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ করছে না। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নিতাম। এছাড়া ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে অস্থিরতার কথা স্বীকার করলেও এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এ ব্যাপারে গাজীপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) শামসুন্নাহার যুগান্তরকে বলেছেন, এরকম কোনো বাহিনীর কথা আমার জানা নেই। তিনি এ ব্যাপারে খোঁজ নেয়ার কথা জানান।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×