প্রশাসনে নিয়োগ ও পদোন্নতি

গোয়েন্দা প্রতিবেদন পর্যালোচনা করবে যৌথ কমিটি

  উবায়দুল্লাহ বাদল ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রশাসনে নিয়োগ ও পদোন্নতি
ছবি-যুগান্তর

প্রশাসনে নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার (গোয়েন্দা) প্রতিবেদন তৈরিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনার উদ্যোগ নেবে সরকার। এক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যৌথ কমিটি গঠনের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।

সরকারের বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রত্যাশীদের বিষয়ে একটি সমন্বিত প্রতিবেদন দেবে এ কমিটি। প্রশাসনে নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অনিয়ম, হয়রানি ও বঞ্চনা কমিয়ে আনতেই এ পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

জানা গেছে, বিগত কয়েক দফা পদোন্নতিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী ও ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক অনেক কর্মকর্তা ও ব্যক্তি পদোন্নতিবঞ্চিত হন। তাদের অনেকে বিষয়টি তৎকালীন জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামসহ সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে জানান।

পরে খোঁজ নিয়ে তারা জেনেছেন এসব কর্মকর্তার ক্ষেত্রে বিশেষ সংস্থার প্রতিবেদনে ‘বিরূপ’ মন্তব্য ছিল। এ নিয়ে তৎকালীন জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফ ক্ষোভ প্রকাশ করে পদোন্নতির বিষয়ে সুপারিশকারী কর্তৃপক্ষ এসএসবি (সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড) সংশ্লিষ্টদের প্রতি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ায় নির্দেশ দেন। কিন্তু বিষয়টির কোনো অগ্রগতি নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

শুধু তাই নয়, বিসিএসের মাধ্যমে সরকারি চাকরির নিয়োগেও এ ধরনের হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও প্রতিবেদনে ‘বিরূপ মন্তব্য’সহ নানা কারণে ৩৬তম বিসিএসের এখনও নিয়োগ পাননি শতাধিক প্রার্থী। নিয়োগ না পাওয়া এসব প্রার্থী ও তাদের পরিবার চরম হতাশায় মানবেতর দিনাতিপাত করছেন।

কারও কারও চলে গেছে চাকরির বয়সসীমা। তাদের দ্রুত নিয়োগ দেয়ার ব্যবস্থা নিতে গত বছরের নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ চেয়ে তার কার্যালয়ে আবেদন করেছেন নিয়োগবঞ্চিত ৭৭ জন উত্তীর্ণ প্রার্থী। প্রায় প্রতিটি বিসিএসে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে নেতিবাচক মন্তব্য থাকায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রার্থী চাকরি পাননি।

বিষয়টি অবগত আছেন জানিয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন সোমবার নিজ দফতরে যুগান্তরকে বলেন, ‘এসব ক্ষেত্রে যারা তথ্য সংগ্রহ করেন, তাদের অনেক সময় ভুল তথ্য দেয়া হয়। অন্য কারণেও ভুল তথ্যে প্রতিবেদন তৈরি হচ্ছে।

ইতিমধ্যে কয়েকজন সংসদ সদস্য এ বিষয়ে অভিযোগ জানিয়েছেন। ভুক্তভোগীদের অনেককে পুনঃতদন্ত চেয়ে আবেদন করার পরামর্শ দিয়েছি। আমার ইচ্ছা আছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যারা এসব তথ্য সংগ্রহ করেন তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করা।

জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি যৌথ কমিটি করা যেতে পারে। যাতে করে আরও নিখুঁতভাবে এসব কাজ করা যায়। কারণ গোয়েন্দা সংস্থার ভুল তথ্যের কারণে একজন যোগ্য প্রার্থীর জীবনই নষ্ট হচ্ছে। তাদেরও জবাবদিহিতার মধ্যে আনা দরকার।’ বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন।

জানা গেছে, জনপ্রশাসনে প্রায় প্রতিটি পদোন্নতির ক্ষেত্রে বঞ্চনার অভিযোগ উঠে। তবে প্রতিবারই কর্তৃপক্ষের দাবি, তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা বিচারাধীন অথবা চাকরির গোপন প্রতিবেদনে বিরূপ মন্তব্য থাকায় পদোন্নতি দেয়া সম্ভব হয়নি।

এ প্রসঙ্গে পদোন্নতিবঞ্চিত বিসিএস ১৯৮৫ ব্যাচের একজন উপসচিব জানান, প্রশাসনে পদোন্নতি বঞ্চনার প্রধান হাতিয়ার গোয়েন্দা প্রতিবেদন। প্রতিবেদনে ‘বিরূপ মন্তব্য’ রয়েছে এমন অজুহাতে অপছন্দের কর্মকর্তাদের বঞ্চিত করা হয়। এটা সবাই জানেন কিন্তু কিছুই করার নেই।

একাধিকবার পদোন্নতি বঞ্চিত হয়েছেন উল্লেখ করে এ কর্মকর্তা আরও জানান, কি কারণে তাকে বঞ্চিত করা হয়েছে সংশ্লিষ্টরা কোনো জবাব দিতে পারেননি। তাদের একটাই জবাব- ‘প্রতিবেদনে নেতিবাচক তথ্য রয়েছে।’

পদোন্নতির মতো বিসিএসের নিয়োগেও এমন হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। পিএসসির সুপারিশ পাওয়া ৩৬তম বিসিএসের ৭৭ চাকরিবঞ্চিত প্রার্থী নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ চেয়ে আবেদন করেন। বঞ্চিতরা জানান, পিএসসির সুপারিশপ্রাপ্তদের তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই শেষে গত বছরের ৩১ জুলাই ২ হাজার ৩২৩ জনের মধ্যে ২ হাজার ২০২ জনকে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

নানা কারণে প্রথম দফায় ১২১ জনের নিয়োগ স্থগিত রাখা হয়। এর মধ্যে জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) ‘বিরূপ মন্তব্য’ থাকাসহ নানা কারণে ৬৮ জন বাদ পড়েন। এদের বেশিরভাগেরই বাবা-মাসহ নিকটাত্মীয়দের কেউ না কেউ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলের সমর্থক বা জড়িত।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গত কয়েক বছর ধরে মাঠপর্যায় থেকে পিএসসির সুপারিশপ্রাপ্তদের মা-বাবা, দাদা-নানা, চাচা-ফুফাসহ সব নিকটাত্মীয়দের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ কারণে অনেক নিরপরাধ প্রার্থীও অন্যায়ের শিকার হচ্ছেন।

এছাড়া এসবির প্রতিবেদন না পাওয়ায় ১৪ জন, স্বাস্থ্য পরীক্ষায় উপস্থিত না হওয়ায় ১২ জন, জাতীয় পরিচয়পত্রে গরমিল থাকায় ১২ জন, মুক্তিযোদ্ধার ওয়ারিশান সনদ না থাকায় ১১ জন ও মামলাসহ নানা কারণে আরও ৪ জন এ দফায় নিয়োগ পাননি।

এরপর জাতীয় পরিচয়পত্র ও মুক্তিযোদ্ধার ওয়ারিশান সনদসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাওয়ায় ১৯ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় দফা আরও ১৯ জনকে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। শুধু ৩৬তম বিসিএসেই নয়, এর আগের বিসিএসগুলোতেও এ ধরনের অভিযোগে নিয়োগ পাননি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রার্থী।

পিএসসির সুপারিশপ্রাপ্তদের একজন যুগান্তরকে বলেন, তাকে ৩৬ বিসিএসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্যাডারে নিয়োগের সুপারিশ করেছিল পিএসসি। কিন্তু গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ‘বিরূপ মন্তব্য’ থাকায় তাকে এখনও নিয়োগ দেয়া হয়নি। অথচ তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি হল শাখা ছাত্রলীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন। তার পরিবার ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতি করায় তদন্তকারী কর্মকর্তাকে ‘সন্তুষ্ট’ না করায় এমন প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন চাকরিবঞ্চিত এ প্রার্থী।

--
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×