চার বছর পর চার্জশিট

অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডে মেজর জিয়াসহ সম্পৃক্ত ১২ জন

পাঁচজনের তথ্য নেই * ‘স্লিপার সেল’র সদস্য হওয়ায় জড়িত সবার বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি

  যুগান্তর রিপোর্ট ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিজ্ঞানমনস্ক লেখক অভিজিৎ রায়
বিজ্ঞানমনস্ক লেখক অভিজিৎ রায়। ফাইল ছবি

বিজ্ঞানমনস্ক লেখক অভিজিৎ রায় হত্যায় ৪ বছর পর চার্জশিট চূড়ান্ত করেছে তদন্ত সংস্থা পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের (সাবেক আনসারুল্লাহ বাংলা টিম-এবিটি) শীর্ষ নেতা মেজর (বরখাস্ত) সৈয়দ জিয়াউল হকসহ ছয় দুর্ধর্ষ জঙ্গিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

জিয়াকে পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তদন্তে ১২ জনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলেও পাঁচজনের প্রকৃত নাম-ঠিকানা পাওয়া যায়নি বলে আপাতত অভিযোগপত্র থেকে তাদের বাদ দেয়া হয়েছে। পরে নাম-পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেলে সম্পূরক চার্জশিটের মাধ্যমে তাদের অভিযুক্ত করা হবে।

সোমবার চার্জশিট অনুমোদনের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে তদন্ত সংস্থা সিটিটিসি। অনুমোদনের পরই তা আদালতে জমা দেয়া হবে। সোমবার ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করে এসব তথ্য জানিয়েছে সিটিটিসির প্রধান ও ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম।

তিনি বলেন, তদন্তকালে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ১১ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। আর শাফিউর রহমান ফারাবীকে উসকানিদাতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সরাসরি জড়িত পাঁচ আসামির শুধু সাংগঠনিক নাম জানা গেছে। পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি বলে তাদের চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

পলাতক আসামিদের অদূর ভবিষ্যতে গ্রেফতার করা সম্ভব হলে সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করা হবে। তিনি বলেন, মূলত ভিন্নমত নিয়ে লেখালেখির কারণে তাকে জঙ্গিরা টার্গেট করে।

তদন্ত সংস্থা সূত্র বলছে, সরাসরি জড়িত ১১ জনের মধ্যে জঙ্গি কমান্ডার মো. মুকুল রানা ওরফে শরিফুল ইসলাম ওরফে হাদী ডিবির সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে। সে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নিয়েছিল। অন্য ১০ জনের মধ্যে তিনজন গ্রেফতার রয়েছে। পলাতক আছে আরও দু’জন। অন্য পাঁচজনের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

গ্রেফতার তিনজন (সরাসরি জড়িত) হল- মোজাম্মেল হুসাইন ওরফে সায়মন (সাংগঠনিক নাম শাহরিয়ার), আবু সিদ্দিক সোহেল (সাংগঠনিক নাম সাকিব, সাজিদ, শাহাব) ও আরাফাত রহমান (সাংগঠনিক নাম সিয়াম ওরফে সাজ্জাদ)। হত্যাকাণ্ডে উসকানিদাতা হিসেবে শাফিউর রহমান ফারাবীকেও এ মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।

পলাতক দু’জন হল- হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হক (সাংগঠনিক নাম সাগর, বড় ভাই) ও আকরাম হোসেন ওরফে আবির ওরফে আদনান ওরফে হাসিবুল ওরফে আবদুল্লাহ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মামলাটি প্রথমে তদন্ত করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ৩ বছর পর এ মামলার তদন্তভার নেয় সিটিটিসি ইউনিট। মামলাটি প্রথমে পেনাল কোডে রুজু হলেও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত আসামিরা সবাই এবিটির সদস্য। এ কারণে মামলার চার্জশিট সন্ত্রাসবিরোধী আইনে প্রস্তুত করা হয়েছে।

তদন্ত সংস্থার দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, ২০১৩ সাল থেকে ব্লগার, লেখক ও প্রকাশকদের টার্গেট করে হত্যার মিশনে নেমেছিল জঙ্গি সংগঠন এবিটি। এ লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি ‘স্লিপার সেল’ তৈরি করে হত্যার মিশন শুরু করে তারা। প্রতিটি ‘স্লিপার সেলে’ ৫-৬ জন করে সদস্য ছিল। তারা সরাসরি হত্যার মিশন বাস্তবায়ন করত।

এ সেলের বিশেষত্ব হল- একই সেলের সদস্য হলেও তারা একজন অপরজনকে চিনত না। এমনকি প্রকৃত নামও জানত না। শুধু সাংগঠনিক নাম জানত তারা। এ কারণেই ৪ বছর পরও জড়িত সব জঙ্গির প্রকৃত নাম-ঠিকানা জানা সম্ভব হয়নি।

এবিটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন এমন এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, এবিটির সাংগঠনিক কাঠামোতে কয়েকটি শাখা রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হল- শূরা, দাওয়াতি, সামরিক, প্রশিক্ষণ এবং আইটি। কাকে টার্গেট করে হত্যা করা হবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসে শূরা বোর্ড থেকে।

মাঠপর্যায়ে সিদ্ধান্ত ‘স্লিপার সেল’র মাধ্যমে বাস্তবায়ন করে সামরিক শাখার সদস্যরা। শূরা বোর্ডের অনুমোদন নিয়ে অভিজিৎকে হত্যা করা হয়েছিল। অভিজিৎ রায়ের বই প্রকাশের কারণে ফয়সল আরেফীন দীপনকে হত্যা করা হয়। প্রকাশক আহেমেদুর রশীদ টুটুলের ওপর হামলা করে এবিটি।

তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, এবিটির ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের সদস্যরা অভিজিতের বিস্তারিত প্রোফাইল তৈরি করে মেজর জিয়াকে অবহিত করে। ২০১৫ সালের ২২ ও ২৪ ফেব্রুয়ারি অভিজিৎকে অনুসরণ করতে বইমেলায় যায় সোহেল ও তার সহযোগীরা। এর আগে অভিজিতের ইন্দিরা রোডের বাসা রেকি করে তারা।

প্রথমে জিয়ার নির্দেশ ছিল অভিজিৎকে বাসায় খুন করা হবে। বাসা সঠিকভাবে রেকি করতে ব্যর্থ হওয়ায় ২৬ ফেব্রুয়ারি টিএসএসি এলাকায় অভিজিৎকে হত্যা করা হয়। জিয়ার নির্দেশে অভিজিৎকে রেকি করতে করতে ধানমণ্ডির একটি হোস্টেল পর্যন্ত গিয়েছিল সোহেল।

তদন্তের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা বলছেন, বইমেলায় ঘোরার সময় থেকেই অভিজিৎ ও তার স্ত্রী বন্যাকে অনুসরণ করছিল এবিটির সদস্যরা। একাধিক সিসিটিভি ফুটেজে তাদের দেখা গেছে। মেলা থেকে বেরিয়ে আসার পর অভিজিৎকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

এ সময় তার স্ত্রী ডা. রাফিদা আহমেদ বন্যাও গুরুতর আহত হন। ঘটনার পর বাংলাদেশে আসে এফবিআইর একটি প্রতিনিধি দল। পরে আদালতের অনুমতি নিয়ে এফবিআইর ল্যাবরেটরিতে ১৩ ধরনের আলামত পাঠায় মামলার তদন্ত সংস্থা।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×