উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার এক-তৃতীয়াংশ

বরিশালে পানি শোধনাগার নির্মাণে ব্যাপক দুর্নীতি

  আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল ব্যুরো ০২ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বরিশাল ম্যাপ
বরিশাল ম্যাপ

বরিশালে ৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দুটি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (পানি শোধনাগার) সক্ষমতার এক-তৃতীয়াংশ পানিও উৎপাদন করতে পারছে না। এর ওপর একটি প্লান্টের এক-তৃতীয়াংশ এরই মধ্যে চলে গেছে নদীগর্ভে। প্লান্ট দুটি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর হওয়ার আগেই এ দুরবস্থার কারণ খুঁজতে গিয়ে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে এসেছে। দেখা গেছে, প্রতি পদে হয়েছে অনিয়ম, দুর্নীতি। শেষ পর্যন্ত প্লান্ট দুটি নগরের সাড়ে ছয় লাখ অধিবাসীর কতটুকু কাজে দেবে প্রশ্ন উঠেছে তা নিয়েও।

প্লান্ট দুটির পানি সংশোধন/উৎপাদন ক্ষমতা দৈনিক সোয়া তিন কোটি লিটার। বর্তমানে সাকুল্যে কোটি লিটার পানি উৎপাদন করতে পারছে।

২০০৯-১০ অর্থবছরে প্লান্ট দুটি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ব্যয় ধরা হয় ৫৬ কোটি টাকা। এর বাইরে জমি অধিগ্রহণের জন্য দেয়া হয় আলাদা বরাদ্দ। সিটি কর্পোরেশন নগরীর বেলতলা ও রূপাতলীতে এর স্থান নির্ধারণ করে। সে অনুযায়ী কাজ শুরু করে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর। কথা ছিল নির্মাণ শেষে তারা প্লান্ট হস্তান্তর করবে সিটি কর্পোরেশনের কাছে। নির্মাণ শুরু হওয়ার কিছু দিনের মধ্যেই কীর্তনখোলা নদীর ভাঙনের মুখে পড়ে বেলতলা প্লান্ট।

তার পরও কাজ চালিয়ে যায় প্রকৌশল অধিদফতর। এ নিয়ে পত্রিকায় বহু লেখালেখি হলেও গুরুত্ব দেয়নি কেউ। ২০১৬ সালের জুনে নির্মাণ শেষের পরপরই ভাঙতে থাকা নদী ঢুকে পড়ে বেলতলা প্লান্ট এলাকায়। বিলীন হয়ে যায় প্লান্টের পন্ড ওয়ান ও ইনটেক ওয়ানের বড় অংশ। রাস্তাসহ পুরো প্রকল্পের প্রায় ৩৫ শতাংশ চলে যায় নদীগর্ভে। চালু হওয়ার আগেই বেশির ভাগ কার্যক্ষমতা হারায় এ প্লান্টটি।

বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নদীর পারে এ ধরনের বড় প্রকল্প নির্মাণে সরকারের ইন্সটিটিউট অব ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট থেকে সক্ষমতা সনদ নেয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে নেয়া হয়নি। ফলে ভবিষ্যতে কী হবে বা না হবে তার বিচার বিশ্লেষণ ছাড়াই পানিতে ফেলা হয় এসব টাকা।

নগর ভবনের পানি সরবরাহ শাখার এক প্রকৌশলী বলেন, ‘প্রথমে নদীর পানি পাম্প করে রিজার্ভার ট্যাংক পন্ড ওয়ানে নেয়া হয়। এখানেই শুরু হয় বিশুদ্ধকরণের প্রথম পর্যায়। এরপর দ্বিতীয় ধাপে রাসায়নিক দিয়ে বিশুদ্ধ এবং তৃতীয় ধাপে তা তোলা হয় ওভারহেড ট্যাংকে। কিন্তু বেলতলা প্লান্টের রিজার্ভার ও ইনটেক ওয়ানের বেশির ভাগ নদীগর্ভে তলিয়ে যাওয়ায় পাম্প করে পানি তোলা যাচ্ছে না।

বর্তমানে ভাঙা অংশ দিয়ে নদীর পানি সরাসরি ঢুকছে রিজার্ভারে। এ জন্য অপেক্ষা করতে হয় জোয়ারের। জোয়ারে উঁচু হওয়ার পরই কেবল পানি ঢোকে। ফলে যেখানে ২৪ ঘণ্টা চালু থাকা এবং দৈনিক এক কোটি ৬০ লাখ লিটার পানি শোধন হওয়ার কথা সেখানে বর্তমানে দিন রাত মিলিয়ে ৬-৭ ঘণ্টার বেশি চালানো যাচ্ছে না প্লান্টটি। উৎপাদন নেমে এসেছে ২৫ থেকে ৩০ লাখ লিটারে। এর ওপর এখনও যেভাবে নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে, তাতে ২-৩ বছরের মধ্যেই প্লান্টটি পুরোপুরি নদীতে তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।’

রূপাতলী প্লান্টটি পরিচালনার জন্য বিদ্যুতের যে সাবস্টেশন স্থাপন করা হয়েছে, সেটির ক্ষমতা ২৫০ কেভিএ। অথচ প্লান্টের তিন স্তর একসঙ্গে চালাতে দরকার ন্যূনতম ৪৫০ কেভিএ বিদ্যুতের। পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা না থাকায় এখানে একসঙ্গে চালানো যায় না সব স্তর। ফলে এক কোটি ৬০ লাখ লিটারের স্থলে এ প্লান্ট ৬০ থেকে ৭০ লাখ লিটার পানি উৎপাদন করতে পারছে। প্রশ্ন উঠেছে, বেলতলা প্লান্টে যেখানে ৪৫০ কেভিএ সাবস্টেশন বসানো হয়েছে, সেখানে রূপাতলী প্লান্টে কেন বসানো হল ২৫০ কেভিএ সাবস্টেশন? এখানে কি কোনো দুর্নীতি হয়েছে, নাকি লোড ক্যালকুলেশন করাই হয়নি?

প্লান্ট দুটিতে পানি শোধনে রাসায়নিক মেশানোর পর করা হয় ফ্লু কেশন। এতে রিজার্ভারে সৃষ্টি হয় ঢেউ। পরিশোধনের এ পর্বে পানি যে পার্টিকেল বোর্ডে ধাক্কা খায় তার সাপোর্টিং ক্ল্যামসহ অন্যান্য যন্ত্রাংশ নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে এমএস শিট ও পাইপ। প্রাক্কলন অনুযায়ী এগুলো জিআই শিট ও পাইপ দিয়ে নির্মাণের কথা। এগুলোতে এরই মধ্যে মরিচা পড়েছে। এ ছাড়া পার্টিশন বোর্ডের ক্ষেত্রে এ দুটি প্লান্টে লাগানো হয়েছে প্লাস্টিক। অথচ প্রাক্কলন অনুযায়ী ফাইবার লাগানোর কথা।

ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক প্রকৌশলী বলেন, ‘পানি শোধনে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশে এমএস শিট বা পাইপ ব্যবহারের নজির পৃথিবীর কোথাও নেই।’ এ ছাড়া নিুমানের যন্ত্রাংশ ও উপাদান দিয়ে তৈরির ফলে এখনই প্লান্ট দুটির এয়ার ভাল্ব ঠিকমতো কাজ করছে না। নিুমানের সুইচ ভাল্বের কারণে লিক করছে পানি। চেম্বার ও ট্যাংকের সুইচ ভাল্বের পাশাপাশি পাইপলাইনের জয়েন্টও লিক করছে।

ট্রিটমেন্ট প্লান্টের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে নগরভবনের পানি সরবরাহ শাখার নির্বাহী প্রকৌশলী ওমর ফারুক বলেন, ‘প্লান্ট দুটি বর্তমানে পরীক্ষামূলকভাবে চালাচ্ছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর। পরিদর্শন পর্যায়ে যেসব ত্রুটি ধরা পড়েছে তা মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রাও তারা পূরণ করতে পারছে না। এই দুটি প্লান্ট আমাদের কতটুকু উপকারে আসবে তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।’

নির্বাহী প্রকৌশলী আরও বলেন, ‘প্লান্ট নির্মাণ প্রশ্নে নতুন কোনো ওভারহেড ট্যাংক নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল না। ফলে প্লান্ট থেকে উৎপাদিত পানি সংরক্ষণের সুযোগ একেবারেই সীমিত। প্লান্ট থেকে সরাসরি সার্ভিস লাইনে সংযোগ থাকলেও হয়তো পরিস্থিতি সামাল দেয়া যেত। কিন্তু সেটাও করা হয়নি। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে উৎপাদন ব্যয় আর উৎপাদনের বিপরীতে আয় নিয়েও টেনশনে আছি। বর্তমান পরিস্থিতিতে সিটি মেয়র যে সিদ্ধান্ত দেবেন আমরা সে অনুযায়ী কাজ করব।’

অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মঈনুল হাসান বলেন, ‘কিছু ত্রুটি যে নেই তা নয়, তবে প্লান্ট চালুর পর আমরা সেসব ত্রুটি দূর করার উদ্যোগ নিয়েছি। নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর (বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায়) এ দুটি প্রায় দুই বছর বসে ছিল। ফলে কিছু জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। তবে প্লান্ট দুটি বর্তমানে চালু আছে এবং বিশুদ্ধ পানিও সরবরাহ করতে পারছি।’

কম উৎপাদন বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা তো এখনই বলা যাবে না। আমাদের উৎপাদনের যে ক্ষমতা তা ধারণের মতো রিজার্ভার নেই সিটি কর্পোরেশনের।’ প্রকল্পের অনিয়ম দুর্নীতি বিষয়ে তিনি বলেন, ‘২০১৬ সালের জুন মাসে নির্মাণ শেষ হয়। আর আমি এখানে দায়িত্ব নিয়েছি ২০১৭ সালের অক্টোবরে। অতএব প্রকল্পের সব বিষয়ে আমি বিস্তারিত বলতে পারব না।’

বিষয়টি নিয়ে আলাপকালে সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ বলেন, ‘জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ প্রাক্কলন অনুসারে সবকিছু বুঝিয়ে দিলেই কেবল আমি এ দুটি ওয়াটার প্লান্টের দায়িত্ব নেব। আমাকে তো উল্টোপাল্টা কিছু বোঝানো যাবে না। নদীতে ভেঙে যাওয়া আর লক্ষ্যমাত্রার এক-তৃতীয়াংশ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন প্লান্ট আমায় বুঝিতে দেবেন, আর আমি তা মেনে নেব- সেটা হবে না।’ তিনি বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেয়ার পর ব্যক্তিগত উদ্যোগে খোঁজখবর নিয়ে এসব ত্রুটি-অনিয়মের বিষয়গুলো উদঘাটন করেছি। সরকার তথা জনগণের কোটি কোটি টাকা নিয়ে ছিনিমিনি খেলার সুযোগ কাউকে দেয়া হবে না।’

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×