শরিকদের ক্ষোভ প্রকাশ্যে

১৪ দলে টানাপোড়েন

আ’লীগের আচরণে সন্তুষ্ট নয় শরিকরা * ঐক্য এখনও আগের মতোই ‘অটুট’ -নাসিম

  হাসিবুল হাসান ১৩ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

১৪ দলে টানাপোড়েন

১৪ দলীয় জোটের নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগের সঙ্গে শরিকদের দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে। মন্ত্রিসভায় না রাখা নিয়ে যে চাপা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল, তা এখন প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে।

জোটের বৈঠক, দলের (শরিক দলসমূহ) বিবৃতি-বক্তৃতা এমনকি জাতীয় সংসদে দেয়া বক্তব্যেও ক্ষোভ প্রকাশ পাচ্ছে। এ নিয়ে পাল্টা বক্তব্যও দেয়া হচ্ছে। এমন অবস্থায় জোটের ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কার কথা জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও ‘মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের আদর্শিক’ এই জোটের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের দাবি ১৪ দলের ঐক্য এখনও ‘অটুট’ আছে।

২০০৪ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোট গঠিত হয়। এরপর বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ আন্দোলন এবং পরপর তিনটি নির্বাচন একসঙ্গে করে। এর মধ্যে প্রথম দুই সরকারের মন্ত্রিসভায় শরিক দলগুলোর একাধিক নেতাকে মন্ত্রী করা হলেও এবারের মন্ত্রিসভায় শরিকদের কাউকে রাখা হয়নি।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে দূরত্বের সূত্রপাত সেখান থেকেই বলে জানা গেছে। কারণ নতুন মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানে দেখা যায়নি শরিক দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের। এরপর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগের বিজয় সমাবেশেও ছিলেন না শরিকদের ‘হেভিওয়েট’ নেতারা। ঢাকা উত্তর সিটির উপনির্বাচনে কোনো ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়নি শরিকদের।

এমনকি চলমান উপজেলা নির্বাচন নিয়েও কোনো বোঝাপড়া হয়নি শরিকদের সঙ্গে। বরং নতুন সরকার গঠনের পর গত দুই মাসে ‘প্রকাশ্যে বিতর্কে’ জড়িয়েছেন আওয়ামী লীগ ও জোটের একাধিক নেতা।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, একাদশ জাতীয় সংসদে বিজয়ের পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায় থেকে শরিকদের ঘর গোছানোর পরামর্শ দেয়া হয়েছে। শরিক দলগুলো থেকে নির্বাচিত এমপিদের বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করারও পরামর্শ দেয় আওয়ামী লীগ।

তবে এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে একমত হতে পারেননি শরিক দলের নেতারা। জোটের একাধিক বৈঠকে আওয়ামী লীগ কেন জোর করে শরিকদের বিরোধী দলে বসাতে চায়- সে প্রশ্ন তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। বৈঠকে মোহাম্মদ নাসিমের কাছে এ বিষয়ে নিজেদের অপারগতার কথাও জানিয়েছিলেন জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু ও ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন।

এ বিষয়ে ন্যাপের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন রোববার যুগান্তরকে বলেন, ‘দেখেন এতদিন আমরা জোটে ছিলাম। সবাই জানে আমরা সরকারের পক্ষে। কিন্তু এখন যদি আওয়ামী লীগ বলে আমাদের বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে হবে। কিন্তু সেটা মানুষ কীভাবে নেবে, তা আগে দেখতে হবে।’ ১৪ দলের শরিকদের মধ্যে তাহলে কি বর্তমানে অনৈক্যের সৃষ্টি হয়েছে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটাকে অনৈক্য বলাটা ঠিক হবে না। তবে ঐক্যের শিথিলতা বলা যায়।’

সম্প্রতি সংসদে দেয়া বক্তব্যে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল- জাসদ সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘মহাজোট ১৪ দলের ঐক্যের শক্তিতে বিজয়ী হওয়ার পর ঐক্যকে কার্যকর রাখতে পারেনি। পরাজিত শক্তির পুনরুত্থান বন্ধে ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। সুতরাং ঐক্য নিয়ে বিভ্রান্তির কোনো সুযোগ নেই। মহাজোটে ১৪ দলকে অবহেলা করা হবে আত্মঘাতী।’

শুক্রবার জোটের সর্বশেষ বৈঠকে জোটের কার্যকারিতা নিয়ে শরিকরা প্রশ্ন তোলেন বলে জানা গেছে। বৈঠকে জাসদের (আম্বিয়া) কার্যকরী সভাপতি মাঈনউদ্দিন খান বাদল ১৪ দলের অস্তিত্ব নিয়ে কথা বলতে গিয়ে জোটের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিমের সঙ্গে কিছুটা রসিকতা করে বলেন, ১৪ দল তো এখন নিবিড় পরিচর্চা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চলে গেছে।

আপনি (মোহাম্মদ নাসিম) ডাক্তার দেবী শেঠীর ভূমিকায় বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। জাতীয় পার্টি (জেপি) মহাসচিব শেখ শহিদুল ইসলাম আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতাদের বৈঠকে উপস্থিত না থাকার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘তাহলে কি ১৪ দলের শরিকরা জোর করে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আছে। নাকি আওয়ামী লীগ জোর করে শরিকদের সঙ্গে রেখেছে- এটা জানা দরকার।’

এর আগের (১৩ ফেব্রুয়ারি) বৈঠকে নির্বাচন নিয়ে ১৪ দলের অন্যতম শরিক জাসদ (আম্বিয়া) সভাপতি শরীফ নূরুল আম্বিয়ার সাম্প্রতিক বক্তব্যের সমালোচনা করেন কয়েকজন নেতা।

তরিকত ফেডারেশনের সভাপতি নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী বলেন, ১৪ দলের শরিক হয়েও সম্প্রতি একটি টেলিভিশনের টকশোতে শরীফ নূরুল আম্বিয়া নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে কিনা তা নিয়েও সংশয় জানিয়েছেন তিনি। এতে মানুষের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে এক ধরনের সন্দেহ দেখা দিয়েছে।

নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারীর এমন বক্তব্যে সমর্থন জানান ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম এবং জাসদের আরেক অংশের সভাপতি হাসানুল হক ইনু। এ সময় মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ১৪ দলের মূল ‘প্রিন্সিপালটা’ সবাইকে মেনে চলতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ১৪ দলের অন্যতম শরিক জাতীয় পার্টি (জেপি) মহাসচিব শেখ শহিদুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ১৪ দলের মধ্যে যে সমস্যাগুলো হচ্ছে তা আমি গত (শুক্রবারের) বৈঠকেই বলেছি।

জোটের শরিকদের যে পরিমাণ গুরুত্ব দেয়া উচিত সেটা হচ্ছে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, ১৪ দলীয় জোট একটা আদর্শিক জোট। ১৪ দলের প্রয়োজনীয়তা ও প্রাসঙ্গিকতা এখনও রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘অ্যাটিচ্যুড’ সব সময় ১৪ দলের ঐক্যের সপক্ষে। কিন্তু এটা তার দলের নেতাদের মধ্যে সেভাবে সংক্রমিত হয় না। এটাই হল মুশকিল।

একই বিষয়ে ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য আনিসুর রহমান মল্লিক যুগান্তরকে বলেন, এখন ১৪ দলের ইউটিলিটি থাকুক আর না থাকুন, যে ২৩ দফা কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলাম সেখানে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর কথাই ছিল এটা আদর্শিক জোট।

আজকে হয়তো অনেকেই অনেক কথা বলছেন। কেউ কেউ বলছেন আদর্শিক না। এটাই তো হয় আমাদের দেশে। পার হয়ে গেলে আর পাটনীর কথা কেউ মনে রাখে না। এ সময় তিনি ২০১৩ সালের ৫ মের মতিঝিলের ঘটনা তুলে ধরে হেফাজতে ইসলাম নিয়ে আওয়ামী লীগ ও সরকারের বর্তমান অবস্থানের সমালোচনা করেন।

তবে ১৪ দলের শরিকদের মধ্যে ঐক্য এখনও আগের মতোই ‘অটুট’ রয়েছে বলে মনে করেন জোটের আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও জোটের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম। সম্প্রতি জোটের বৈঠক শেষে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যে আদর্শ লক্ষ্য সামনে রেখে ১৪ দল গঠিত হয়েছিল তা এখন পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। তাই ১৪ দলের প্রয়োজনীয়তা এখনও শেষ হয়ে যায়নি।

কোনো পদ-পদবি বা লঘুকরণের জন্য ১৪ দল সংগঠিত হয়নি। যত দিন পর্যন্ত ১৪ দলের এই লক্ষ্য অর্জিত না হবে ততদিন পর্যন্ত ১৪ দল কাজ করে যাবে। ১৪ দল পাহাড়ের মতো ঐক্যবদ্ধ আছে। দুঃসময় ও সুসময় সব সময়ই ১৪ দল শেখ হাসিনার পাশে আছে থাকবে। চোখের মণির মতো তাকে রক্ষা করবে।

--
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×