নীতিমালা হচ্ছে অধিদফতরে

নিজ জেলায় পদায়ন চান খাদ্য কর্মকর্তারা

কার্যকর হলে বদলি বাণিজ্য কমবে -খাদ্যমন্ত্রী

প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  উবায়দুল্লাহ বাদল

নিজ জেলায় পদায়ন চান খাদ্য কর্মকর্তারা। পাশাপাশি একই কর্মস্থলে কমপক্ষে ৩ বছর কাজ করার সুযোগ চান।

এছাড়া দক্ষতা বাড়াতে বিদেশেও প্রশিক্ষণ নিতে চান খাদ্য অধিদফতরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা। উল্লিখিত বিষয়সহ ৫টি প্রস্তাব খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের কাছে হস্তান্তর করেছে বাংলাদেশ খাদ্য কর্মকর্তা সমিতি। খাদ্য অধিদফতরের প্রস্তাবিত বদলি-পদায়ন নীতিমালায় এসব প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করার দাবি করেন তারা। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

সূত্র আরও জানায়, খাদ্য অধিদফতরের গুরুত্বপূর্ণ পদ ও মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন পদে বদলি ও পদায়নে লাখ লাখ টাকার বাণিজ্যের অভিযোগ বহুদিনের। লোভনীয় জায়গায় পদায়ন পেতে মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের কর্তাব্যক্তিদের দফতরে ভিড় লেগেই থাকে। প্রভাবশালীদের তদবিরে অতিষ্ঠ সংশ্লিষ্টরা। এই বদলি-পদায়ন বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে নতুন একটি নীতিমালা করছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। স্টেকহোল্ডারদের মতামত নিয়ে শিগগিরই তা চূড়ান্ত করে কার্যকর করা হবে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা নীতিমালা চূড়ান্ত করতে সংশ্লিষ্টদের মতামত চেয়েছি। খাদ্য কর্মকর্তা সমিতি কিছু প্রস্তাব দিয়েছে। এগুলো যাচাই-বাছাই করা হবে। আরও যারা আছেন, তাদের প্রস্তাব বা মতামত পাওয়া সাপেক্ষে শিগগিরই নীতিমালা চূড়ান্ত করে কার্যকর করা হবে। এটি কার্যকর হলে বদলি-পদায়নে যে বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে তা বন্ধ হবে।’

মঙ্গলবার খাদ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে প্রস্তাবিত নীতিমালায় উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকদের (টিসিএফ) নিজ জেলায় পদায়নের বিধানসহ ৫টি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ খাদ্য কর্মকর্তা সমিতি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- একই কর্মস্থলে কমপক্ষে ৩ বছর থাকার সুযোগ দিতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতিবঞ্চিত টিসিএফদের সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক বা সমমানের পদে চলতি দায়িত্ব দিতে হবে।

খাদ্য অধিদফতরের প্রস্তাবিত ১০টি এলএসডি প্রথম শ্রেণীতে উন্নীত করতে হবে। টিসিএফদের বিদেশ প্রশিক্ষণে পাঠাতে হবে। এছাড়া টিসিএফদের পেনশন মঞ্জুরির ক্ষমতা খাদ্য অধিদফতরের মহাপরিচালককে দিতে হবে। বর্তমানে এই ক্ষমতা মন্ত্রণালয়ের হাতে। প্রস্তাব প্রসঙ্গে বাংলাদেশ খাদ্য কর্মকর্তা সমিতির সভাপতি হুমায়ুন কবির যুগান্তরকে বলেন, ‘খাদ্য বিভাগের মাঠপর্যায়ের কোনো কর্মকর্তা একই কর্মস্থলে বেশিদিন থাকতে পারেন না। এক বছর হলেই কোনো কারণ ছাড়াই তাকে অন্যত্র বদলি করা হয়। আর কর্মকর্তাদের নিজ জেলায় পদায়ন করা হলে স্বল্প খরচে সাংসারিক ব্যয়নির্বাহ করতে পারবেন। এছাড়া বর্তমানে ক্যাডার কর্মকর্তারা শুধু বিদেশে প্রশিক্ষণের সুযোগ পাচ্ছেন। অথচ মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন নন ক্যাডার কর্মকর্তারা। কাজেই প্রশিক্ষণ কাজে লাগাতে চাইলে টিসিএফদের বিদেশে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।’

মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, খাদ্য অধিদফতরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিশেষ করে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ডিসি-ফুড), খাদ্য পরিদর্শক, গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পদে পদায়ন-বদলিতেই বেশি অনিয়ম-দুর্নীতি হয়। এমনকি মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ঘন ঘন বদলি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি বদলিতে লাখ লাখ টাকার অবৈধ লেনদেন হয়। এর মধ্যে গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন পেতেই সবচেয়ে বেশি টাকার লেনদেন হয়। এসব টাকার ভাগ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পর্যন্ত যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, আগে খাদ্য অধিদফতরের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন হতো মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিদের সন্তুষ্টির ওপর। কয়েক বছর ধরে মাঠপর্যায়ের পদগুলোও বদলি-পদায়ন হয় মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে।

এক্ষেত্রে খাদ্য অধিদফতরের মতামত তেমন পাত্তা পায় না। বর্তমান খাদ্যমন্ত্রী দায়িত্ব নেয়ার পরপরই এ বিষয়ে কঠোর হতে শুরু করেন। তারই অংশ হিসেবে বদলি-পদায়নকে একটি নিয়মের আওতায় আনতে বিধিমালা তৈরির পরিকল্পনা করেন। এ লক্ষ্যে গঠন করেন কমিটি। কমিটি এরই মধ্যে নীতিমালার খসড়া তৈরি করেছে। বর্তমানে খাদ্য অধিদফতরের মাঠপর্যায়ে বদলি-পদায়ন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। নীতিমালা তৈরির আগ পর্যন্ত মাঠপর্যায়ে সব ধরনের বদলি ও পদায়ন বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

খাদ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক আরিফুর রহমান অপু এ বিষয়ে যুগান্তরকে বলেন, আমরা চাই খাদ্য অধিদফতরের বদলি-পদায়ন সব কিছুতেই স্বচ্ছতা থাকুক। সেই চাওয়া থেকেই কর্মকর্তাদের বদলি-পদায়ন একটি নিয়মের আওতায় আনতে নীতিমালা হচ্ছে। অধিদফতরের সব কর্মকর্তাই এই নীতিমালার আওতায় থাকবেন। নীতিমালা অনুযায়ী অধিদফতরের মাঠপর্যায় থেকে শুরু করে সব কর্মকর্তার বদলি-পদায়ন হবে। নীতিমালাটি কার্যকর হলে বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতি যেমন বন্ধ হবে, তেমনি সৎ, দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা অগ্রাধিকার পাবেন।

সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত নীতিমালার খসড়ায় প্রথমবারের মতো খাদ্য পরিদর্শক, সহকারী পরিদর্শকসহ বিভিন্ন পদে গ্রেডেশন করার প্রস্তাব করা হয়েছে। জ্যেষ্ঠতা, সততা ও কর্মদক্ষতাকে প্রাধান্য দিয়ে এই গ্রেডেশন করা হবে। পাশাপাশি ধারণক্ষমতার ভিত্তিতে খাদ্যগুদামগুলোরও গ্রেডিং করা হবে। এগুলোকে তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হবে- এ, বি, সি গ্রেড। কর্মকর্তাদের গ্রেডেশন তালিকা থেকে নির্দিষ্টসংখ্যক ‘এ’ গ্রেডের খাদ্যগুদামে পদায়ন পাবেন। একইভাবে ‘বি’ ও ‘সি’ গ্রেডের খাদ্যগুদামে পদায়ন পাবেন। গ্রেডেশন অনুযায়ী দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তাদের বড় খাদ্যগুদামে পদায়ন করা হবে। গ্রেডিংয়ের ভিত্তিতে গুদামে পদায়ন করা হলেও প্রতি দুই বছর পর মনিটরিংয়ের ভিত্তিতে গ্রেডেশন তালিকা পরিবর্তন হবে। এ ব্যাপারেও নীতিমালায় সুস্পষ্ট করা হবে। একই সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত গুদাম কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের মধ্যে রাখা হবে।