ঝুলে গেল মুক্তিযোদ্ধার তালিকা প্রকাশ

আদালতের নির্দেশনা থাকায় হচ্ছে না -মন্ত্রী * এখন ভাতা পাচ্ছেন ১ লাখ ৮৭ হাজার ২৯৩ মুক্তিযোদ্ধা

  উবায়দুল্লাহ বাদল ১৬ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়

ফের ঝুলে গেল প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার তালিকা প্রকাশ। আদালতের নির্দেশে আটকে যায় তালিকা প্রকাশের কার্যক্রম। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) অনুমোদন ছাড়া এবং গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের বাদ দিয়ে ২৬ মার্চের আগেই এ তালিকা প্রকাশের ঘোষণা দিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

এ নিয়ে জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) চিঠিও দেয়ার কথা ছিল। শেষ পর্যন্ত মন্ত্রণালয় থেকে এ ধরনের চিঠি পাঠানো হয়নি ডিসি-ইউএনওদের। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বুধবার মোবাইল ফোনে যুগান্তরকে বলেন, ‘ঘোষণা অনুযায়ী ২৬ মার্চের আগেই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার তালিকা প্রকাশ করা হচ্ছে না। আদালতের নির্দেশনা থাকায় এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।’

এর আগে ১৯ ফেব্রুয়ারি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী নিজ দফতরে যুগান্তরকে বলেছিলেন, ‘গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা হতে হলে উপজেলা যাচাই-বাছাই কমিটির সুপারিশ লাগে। ওই সুপারিশ জামুকার অনুমোদনের পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে গেজেট জারি করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, এটাই নিয়ম। কিন্তু সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, যাচাই-বাছাই কমিটির সুপারিশ নেই, জামুকার অনুমোদন নেই, কেউ একজন আবেদনে লিখে দিয়েছে, পরে সেটাই গেজেট হয়ে গেছে। এক কথায় বেআইনিভাবে যাদের গেজেট হয়েছে, তাদেরটাই স্থগিত হবে। ২৬ মার্চের আগেই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রকাশ হবে।’

স্থগিত হওয়া ব্যক্তিরা নিয়ম মেনে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে ফের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন বলেও জানান মন্ত্রী।

এ ধরনের অমুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা কত জানতে চাইলে মোজাম্মেল হক বলেন, ‘এ মুহূর্তে বলা সম্ভব নয়। এ জন্য তথ্য যাচাই-বাছাই করতে কিছু ক্যাটাগরি নির্দিষ্ট করে চিঠি তৈরি হচ্ছে। শিগগিরই তা ডিসি ও ইউএনওদের কাছে পাঠানো হবে। তাদের কাছ থেকে প্রতিবেদন পাওয়ার পরই সঠিক সংখ্যা জানা যাবে।’

২৪ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী ২৬ মার্চের আগেই মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রকাশের কথা বলেছিলেন।

সূত্র জানান, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সরকারে একই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান মোজাম্মেল হক। মুক্তিযোদ্ধার তালিকা ও গেজেট প্রকাশের সুপারিশকারী কর্তৃপক্ষ জামুকার চেয়ারম্যানও পদাধিকার বলে তিনিই। নতুন করে জামুকা গঠিত না হওয়ায় এ সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগও নেই।

এছাড়া তালিকা যাচাই-বাছাই কমিটির কাজে ক্ষুব্ধ একাধিক মুক্তিযোদ্ধা আদালতে রিট করেন। রিটের শুনানিতে ৫০ বছরেও মুক্তিযোদ্ধার তালিকা না হওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন হাইকোর্ট। এসব কারণে আপাতত তালিকা প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নেয় মন্ত্রণালয়।

জানতে চাইলে মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব এসএম আরিফ-উর-রহমান বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধার তালিকা প্রকাশ বড় কাজ। অল্প সময়ে করতে গেলে নানা ভুলত্রুটি হতে পারে। সময় নিয়ে হলেও একটি নির্ভুল তালিকা প্রকাশের চেষ্টা করছে সরকার।’

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় বলছে, নতুন যে তালিকা প্রকাশ করা হবে সেখানে বেশ কিছু সংস্থার তৈরি তালিকা অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে না। যেমন- মুক্তিযোদ্ধার ভারতীয় তালিকা, কল্যাণ ট্রাস্ট প্রণীত শহীদ বেসামরিক গেজেট, সশস্ত্র বাহিনী শহীদ গেজেট, বিজিবির শহীদ গেজেট, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার গেজেট, খেতাবপ্রাপ্তদের গেজেট, মুজিবনগর, বিসিএস ধারণাগত জ্যেষ্ঠতা প্রাপ্ত কর্মকর্তা, বিসিএস গেজেট, সেনা-বিমান ও নৌ বাহিনী গেজেট, নৌ-কমান্ডো গেজেট, বিজিবি গেজেট, পুলিশ বাহিনী গেজেট, আনসার বাহিনী গেজেট, স্বাধীন বাংলা বেতার শব্দসৈনিক গেজেট, বীরাঙ্গনা গেজেট, স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল, ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ইউনিয়ন গেরিলা বাহিনী, লাল মুক্তিবার্তা, লাল মুক্তিবার্তায় স্মরণীয় ও বরণীয় যারা, মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতীয় তালিকা (সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী), ভারতীয় তালিকা (পদ্মা), ভারতীয় তালিকা (মেঘনা), যুদ্ধাহত পঙ্গু বিজিবি, যুদ্ধাহত বিজিবি, সেক্টর অনুযায়ী ভারতীয় তালিকা, বিশ্রামগঞ্জ হাসপাতালে দায়িত্ব পালনকারী ও যুদ্ধাহত সেনা গেজেটে প্রকাশিত মুক্তিযোদ্ধা।

জানা গেছে, সরকারিভাবেই মুক্তিযোদ্ধার ৫টি তালিকা রয়েছে। এতে সবচেয়ে ছোট তালিকায় ৭০ হাজার ৮৯৬ এবং বড় তালিকায় দুই লক্ষাধিক মুক্তিযোদ্ধার নাম রয়েছে। নতুন আবেদনকারীর সংখ্যা ১ লাখ ৩৪ হাজার। এসব আবেদন যাচাই-বাছাই করে তালিকা চূড়ান্ত করতে ৪৭০টি উপজেলা কমিটি গঠন করে সরকার।

এর মধ্যে আইনি জটিলতায় ১১০টি কমিটি এখনও প্রতিবেদন দিতে পারেনি। এসব উপজেলায় নতুন কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বাকি ৩৬০টি কমিটির প্রতিবেদন পাওয়া গেলেও তাতে প্রচুর অসঙ্গতি ও ভুলত্রুটি রয়েছে। পরে এসব অসঙ্গতি দূর করে প্রতিবেদন দিতে গঠন করা হয়েছে উপকমিটি। তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ১১০ উপজেলায় নতুন করে ৭ সদস্যের বাছাই কমিটি করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, ‘আমরা সব উপজেলার প্রতিবেদন পাইনি। যেগুলো পেয়েছি তার বেশিরভাগই মনগড়া। যেভাবে রিপোর্ট করার কথা, যে ছক দেয়া হয়েছিল, সে অনুযায়ী মাত্র ২-৩ শতাংশ পেয়েছি। ৯৭ ভাগ ক্ষেত্রে শুধু মতামত দিয়েছে, কারণ বলা হয়নি। প্রতিবেদন ত্রুটিপূর্ণ হওয়ায় অনুমোদিত হয়নি।’

তবে তালিকা চূড়ান্ত না হলেও এ মুহূর্তে গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ২ লাখ ৩১ হাজার ৩৮৫। এর মধ্যে ভাতা পাচ্ছেন ১ লাখ ৮৭ হাজার ২৯৩ জন। তাদের প্রত্যেকে মাসে ১০ হাজার টাকা সম্মানী পাচ্ছেন। বীর শ্রেষ্ঠদের পরিবারকে মাসিক ৩৫ হাজার, বীর উত্তমদের মাসিক ২৫ হাজার, বীর বিক্রমদের ২০ হাজার ও বীর প্রতীকদের মাসিক ১৫ হাজার টাকা সম্মানী দেয়া হচ্ছে। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকটি ক্যাটাগরিতে সর্বোচ্চ ৪৫ হাজার ও সর্বনিম্ন ২৫ হাজার এবং শহীদ পরিবারকে ৩০ হাজার টাকা ভাতা দেয়া হচ্ছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×