বরিশালে পাউবোর জমিতে ঘরবাড়ি ইটভাটা বাজার

  আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল ব্যুরো ১৮ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বরিশালে পাউবোর জমিতে ঘরবাড়ি ইটভাটা বাজার

বরিশালে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কয়েকশ’ একর জমি বেদখল হয়ে গেছে। আশির দশকে গড়ে উঠা পাউবোর পাম্প হাউস ও রাবার ড্যামের জায়গা অবৈধ দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে। শুধু জমি নয়, পাম্প স্টেশন ও রাবার ড্যামের যন্ত্রপাতিরও কোনো হদিস নেই। এসব জায়গায় যে স্থাপনা ছিল সেটা এখন বোঝাই মুশকিল। এসব জমিতে অবৈধভাবে ঘরবাড়ি, ইটভাটা ও হাটবাজার গড়ে উঠেছে।

পাউবোর গাফিলতি ও নজরদারির অভাবে এমন হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে সেই অভিযোগ মানতে নারাজ সংস্থাটির কর্মকর্তারা। কিছু জায়গায় জটিলতা থাকলেও অন্য সব স্থাপনা সংস্থার দখলেই রয়েছে বলে তাদের দাবি। পাউবোর সব সম্পত্তি সংরক্ষণ ও উদ্ধারে কেন্দ্রীয়ভাবে গঠিত টাস্কফোর্সের প্রধান কাজী তোফায়েল হোসেন বলেছেন, বেদখল সম্পত্তির ব্যাপারে খোঁজখবর এবং তদন্ত শুরু হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সেচ কাজে সহযোগিতা ও ফসলি জমিতে সঠিকভাবে পানি সরবরাহের লক্ষ্যে ১৯৭৮ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় ৭৮টি পাম্প স্টেশন ও পাম্প হাউস নির্মাণ করে পাউবো। এসব পাম্প হাউসের অধীনে এক হাজার ৪৭৮টি স্লুইচ গেট ও কয়েকটিতে রাবার ড্যাম বসানো হয়। বড় নদীসংলগ্ন খালগুলোতে বসানো এসব পাম্প হাউসের মাধ্যমে জোয়ার-ভাটা ও পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ফসলি জমিতে সেচ সুবিধা দেয়া হতো। পাম্প হাউসে দায়িত্ব পালনের জন্য পাম্প চালক ও নিরাপত্তা কর্মী নিয়োগ দেয়া হয়।

পাউবো সূত্র জানায়, গড়ে তিন থেকে পাঁচ একর জমিতে গড়ে উঠে একেকটি পাম্প হাউস। এ হিসাবে ৭৮টি পাম্প হাউসে জমির পরিমাণ প্রায় ৪০০ একর। আশির দশকে গড়ে উঠার পর থেকেই ধীরে ধীরে অকার্যকর হতে শুরু করে এসব পাম্প ও রাবার ড্যাম। নদী-খালে পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। পাম্প হাউসগুলো অকার্যকর হয়ে যাওয়ায় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে উঠা এসব প্রকল্পের ব্যাপারে আগ্রহ হারায় পাউবো। অবসরে চলে যাওয়া পাম্প চালক ও নিরাপত্তারক্ষীদের শূন্য পদে আর নিয়োগ দেয়া হয়নি। ফলে একপর্যায়ে পুরোপুরি অরক্ষিত হয়ে পড়ে সরকারি জমিতে গড়ে উঠা এসব পাম্প হাউস। এ সুযোগে বেদখল হতে শুরু করে এসব জমি। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে একটি পাম্প হাউসের অস্তিত্বও খুঁজে পাওয়া যাবে না। শুধু বেদখলই নয়, অসাধু জরিপ কর্মকর্তাদের সহায়তা আর ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে সরকারি এসব জমির ওপর মালিকানা প্রতিষ্ঠার ঘটনা পর্যন্ত ঘটেছে। বরিশাল সদর উপজেলার চরদাড়িয়াল এলাকায় বিকেপি-১ পাম্পের মোট জমির পরিমাণ তিন একর ৭৬ শতাংশ। এ জমিতে ইটভাটা গড়ে উঠেছে। তবে এ ইট ভাটার মালিক কে সেটাই পরিষ্কার নয়। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আবুয়াল হোসেন অরুণ বলেন, এ জমির মালিক কে সেটা নিয়ে জটিলতা রয়েছে। শুনেছি জমি নিয়ে না কি পাউবোর সঙ্গে মামলা চলছে। সদরের বামনীকাঠির বিকেপি-২ পাম্প হাউসের জমিতে বাজার গড়ে তোলা হয়েছে। স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র পাম্প হাউসের প্রায় দুই একর জমিতে বাজার গড়ে তুলে রমরমা ব্যবসা চালাচ্ছে।

কড়াপুর ইউনিয়নের ধর্মাদী এলাকার কেপি-৪ পাম্প হাউসের প্রায় দেড় একর জমি দখল করে ঘরবাড়ি তুলে বসবাস করছেন মিজানুর রহমান। ক্ষমতাসীন দলের পরিচয় দেয়া মিজান জানান, জমি লিজ নিয়েছি। তবে লিজের কোনো কাগজপত্র তিনি দেখাতে পারেননি।

ঝালকাঠীর রাজাপুর উপজেলার নৈকাঠীর জেপি-৫ পাম্প স্টেশনের তিন একর জমিতেও গড়ে উঠেছে ইটভাটা। এর মালিক মিলন ফকির কোনো কথা বলতে রাজি হননি। নলছিটি উপজেলার এনপি-৯ পাম্পের জমিতে বাজার গড়ে উঠেছে। এনপি-১২ ও এনপি-৮নং পাম্পের জমি নিলামে তুলেছে ভূমি রাজস্ব বিভাগ।

পরিচয় গোপন রাখার শর্তে পাউবোর একটি সূত্র জানায়, পাম্প হাউসের এসব জমির বিপরীতে প্রতি বছর খাজনা বাবদ বিপুল অংকের টাকা পাওয়া যায়। তবে সেই টাকা সংশ্লিষ্ট বিভাগে জমা হয় না। এ সুযোগে বহু পাম্পের জমি ভুয়া জরিপ করিয়ে নিজেদের নামে রেকর্ড করিয়ে নিয়েছে স্বার্থান্বে^ষী মহল।

বিভিন্ন এলাকা থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, এমন একটি পাম্প হাউস নেই যেটির জমি পাউবোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এসব পাম্প স্টেশনের বিষয়ে তেমন কোনো আপডেট তথ্য পর্যন্ত নেই পাউবোর স্থানীয় দফতরে। এদিকে, নদী ভাঙনে বরিশালের বাবুগঞ্জ, বাকেরগঞ্জ ও ঝালকাঠীর পাঁচটি পাম্প হাউস বিলীন হয়ে গেছে। এসব পাম্প হাউসের ১৫ একর জমি ছিল। বেদখল হওয়া জমি সম্পর্কেও তেমন কিছু জানেন না কেউ। পাউবোর স্থানীয় দফতর সূত্র জানায়, ৭৮টি পাম্পের জনবল শূন্য হয়ে যাওয়ার পর পাম্প হাউসগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিচর্যার কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। শুধু জমি দখলই নয়, এসব পাম্প হাউসের হাজার কোটি টাকার যন্ত্রপাতি যেমন স্লুইস গেট, কপাট, হোয়েস্ট ফ্রম ও হোয়েস্ট বিমেরও কোনো অস্তিত্ব নেই। বহু আগেই সব চুরি হয়ে গেছে। অবশ্য পাউবোর কাছে এসবের কোনো পরিসংখ্যান নেই।

এ ব্যাপারে বরিশাল পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী (পওর) মো. আবু সাইদ বলেন, এসবের দেখভাল করে যান্ত্রিক বিভাগ। তাই এ ব্যাপারে কিছুই বলতে পারব না। যান্ত্রিক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী (পওর) মো. শামসুল আলম বলেন, আমি মূলত ঢাকায় থাকি। বরিশালের যে দায়িত্ব তা আমাকে অতিরিক্ত হিসেবে দেয়া হয়েছে। জনবল সংকটে সব দিকে সঠিকভাবে খেয়াল রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এরপরও আমরা চেষ্টা করছি। তবে একটি বিষয় নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে, কোনো পাম্প হাউসের জমি লিজ দেয়া হয়নি। কেউ যদি লিজ নেয়ার কথা বলে থাকেন তবে তিনি মিথ্যা বলেছেন। দু-একটি জায়গায় জমি দখল বিষয়ে আমরা ব্যবস্থাও নিয়েছি। বরিশাল সদর উপজেলার একটি জমি নিয়ে মামলা চলছে। খুব শিগগিরই আমরা বাকি পাম্প হাউসগুলোর ব্যাপারেও ব্যবস্থা নেব। পাউবোর বেদখল জমি এবং সব সম্পত্তির তথ্য সংগ্রহে কেন্দ্রীয়ভাবে গঠিত টাস্কফোর্সের আহ্বায়ক কাজী তোফায়েল হোসেন বলেন, বর্তমানে সব তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। এ কাজ শেষ হলেই জমি দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হবে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×