প্রধানমন্ত্রীকে স্মারকলিপি

আইভীর বিরুদ্ধে একাট্টা না’গঞ্জের সুশীল সমাজ

  নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি ২০ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আইভীর বিরুদ্ধে একাট্টা না’গঞ্জের সুশীল সমাজ

সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর বিরুদ্ধে জামায়াত-বিএনপির সঙ্গে সখ্য ও নারায়ণগঞ্জকে অস্থিতিশীল করার অভিযোগ এনে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করে স্মারকলিপি দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের সব শ্রেণী-পেশার প্রতিনিধিরা।

প্রধানমন্ত্রীকে দেয়া স্মারকলিপিতে মেয়র আইভীর বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনী ও কলেজছাত্রী তনু হত্যাকাণ্ড নিয়ে মন্তব্য করে সরকারকে বিব্রত ও প্রশ্নবিদ্ধ করার অভিযোগও আনা হয়।

পাশাপাশি জেলার ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবার হিসেবে পরিচিত ওসমান পরিবার নিয়ে মেয়র আইভীর দেয়া অশালীন বক্তব্যেরও প্রতিবাদ জানানো হয়।

নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে দেয়া স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর করেছেন জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, জেলা আইনজীবী সমিতি, ৬১ জন সরকারি আইন কর্মকর্তা, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ), শিক্ষক সমিতি, ইমাম সমিতি, জেলা ও ৫টি উপজেলা পূজা উদ্যাপন কমিটি, জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ, জাতীয় ও স্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠন, সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়রসহ ২৪ জন কাউন্সিলর, জেলা পরিষদ, জেলা ক্রীড়া সংস্থা, নারায়ণগঞ্জ ক্লাব, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের ২২ জন চেয়ারম্যান, বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন, পত্রিকা মালিক সমিতি, ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন, বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনসহ ২১ শ্রেণীর কয়েক হাজার মানুষ।

মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টায় নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নারায়ণগঞ্জের সচেতন নাগরিক সমাজের ব্যানারে ওই স্মারকলিপি জমা দেয়া হয়।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের চত্বরে নাগরিক সমাজের পক্ষে প্রেস ব্রিফিং ও স্মারকলিপি পাঠ করেন জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট হাসান ফেরদৌস জুয়েল।

লিখিত স্মারকলিপিতে বলা হয়, গত ৬ মার্চ মেয়র আইভী বলেছেন, সাগর-রুনীর ব্যাপারে আমরা অনেক কিছুই জানি, অনেক কিছু জড়িত, তনু হত্যার বিচার কেন হচ্ছে না, সেটাও জানি কারা জড়িত। শুধু তাই নয়, মেয়র আইভীর উপস্থিতিতে ভাড়া করে আনা সুশীল ও তার সঙ্গে থাকা জনবিচ্ছিন্ন গুটিকয়েক লোক প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে যেসব মিথ্যাচার ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দিচ্ছে তাতে আমরা নারায়ণগঞ্জবাসী বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ। নারায়ণগঞ্জের সর্বমহলে একটিই প্রশ্ন- নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের নেত্রী ও দলীয় মেয়র হয়ে আইভীর এমন বক্তব্য ও সুশীলদের প্রতি তার এতটা নগ্ন সমর্থন কেন?

মেয়র আইভী জনসম্মুখে বললেন, নারায়ণগঞ্জে আজ পর্যন্ত যত খুন হয়েছে সে সবই ওসমান পরিবারের দ্বারা হয়েছে। আমরা স্তম্ভিত হলাম।

আমরা আরও অবাক হলাম যখন শুনলাম যুদ্ধাপরাধী আলবদর প্রধান আলী আহসান মুজাহিদের ঘনিষ্ঠ সহচর, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য ও নারায়ণগঞ্জ জামায়াতে ইসলামের আমীর মাওলানা মঈনুদ্দিন গত বছরের ২০ অক্টোবর ২০১৮ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর একটি জবানবন্দি দিয়েছিলেন।

সেখানে জামায়াত আমীর অবলীলায় স্বীকার করেছেন বিলুপ্ত নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা থেকে বর্তমান সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন পর্যন্ত মেয়র আইভীকে কীভাবে কী কৌশলে জামায়াত পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে। এর মূল কারণ, পারিবারিকভাবে জামায়াতে ইসলামের সঙ্গে মেয়র আইভীর সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক।

ওই জবানবন্দিতে পরিষ্কারভাবে জামায়াতের আমীর বলেছেন, প্রথম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আগে থেকেই আইভীর সঙ্গে বেগম জিয়ার সরাসরি যোগাযোগ ছিল।

মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাসের মাধ্যমেই এ সম্পর্কটা হয়। খালেদা জিয়ার সঙ্গে সমঝোতা ছিল নির্বাচনের পর বিএনপিতে যোগ দেবেন আইভী। এ শর্তেই বিএনপির প্রার্থী তৈমুর আলম খন্দকারকে নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে গভীর রাতে বসিয়ে দেয়া হয়েছিল।

কিন্তু জামায়াতে ইসলাম চেয়েছিল আইভী আওয়ামী লীগেই থাকুক। নিজের জবানবন্দিতে জামায়াত আমীর বলেছেন, বিএনপি-জামায়াতের পক্ষে শামীম ওসমানকে ঠেকানো সম্ভব নয়, তাই আইভীকে আওয়ামী লীগই করতে হবে। ওকে আওয়ামী লীগে রাখতে পারলেই ভালো। এতে বিএনপি-জামায়াত সবার জন্য সুবিধা আছে। জামায়াতের সঙ্গে আইভীর যোগাযোগ প্রসঙ্গে জামায়াত নেতা মাঈনুদ্দিন বলেন, রিলেশনটা ওপেন হলে সমস্যা।

আইভীর মধ্যে কৃতজ্ঞতা বোধ আছে। আমরাও চাই না আইভীকে বিব্রত করতে। আমাদের যে কোনো কাজে অনুরোধ করলে ডিরেক্ট, ইনডিরেক্ট সে বসে সহজে করে দিছে।

অনেক কাজ করে দিছে। ওই জবানবন্দিতে আরও যে ভয়ংকর তথ্য দেয়া হয়েছে তা হল, যে সময় পুরো দেশ যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে উত্তাল, সে সময় মেয়র আইভী যুদ্ধাপরাধী মুজাহিদের পরিবারকে অতি গোপনে জন্মনিবন্ধন করে দিয়েছেন।

জামায়াতের আমীরের দেয়া জবানবন্দিতে বলেছেন, মুজাহিদ সাহেবের ওয়াইফ আর আইভী ক্লাসমেট ছিলেন। মুজাহিদ সাহেব যখন জেলে, তখন ওনার ছেলেদের জন্মনিবন্ধনও এখানেই হয়েছে।

অনেক ঘোরাঘুরি করে যখন পাচ্ছিল না, তখন মুজাহিদের ওয়াইফ আইভীকে বলার পরই আধা ঘণ্টার মধ্যে এই জন্মনিবন্ধন হয়ে গেল। উল্লিখিত এসব ঘটনা ও আইভীর বক্তব্য প্রমাণ করে, দলে জামায়াতের এজেন্ট কে বা কারা। জামায়াতের আমীরের দেয়া সেই জবানবন্দির প্রতিটি কথাই মিলে যাচ্ছে তার কর্মকাণ্ডে।

ফলে আমরা চরমভাবে শঙ্কিত ও আশঙ্কা করছি, নারায়ণগঞ্জে আবারও অশান্ত পরিবেশ সৃষ্টির পাঁয়তারা করা হচ্ছে। ২০০১-এর ১৬ জুনের বোমা হামলার মতো আবারও কোনো পৈশাচিক ঘটনার পরিকল্পনা হচ্ছে কি?

প্রেস ব্রিফিংয়ে আইনজীবী সমিতির সভাপতি গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে বলেন, সরকারকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করে সাগর-রুনী ও তনু হত্যাকাণ্ড নিয়ে মেয়র আইভীর বক্তব্যে আমাদেরও জিজ্ঞাসা, আসলে তিনি সাগর-রুনী ও তনু হত্যাকাণ্ড নিয়ে এমন কি জানেন? কোনো সভ্য দেশে বিচারাধীন বিষয়ে কথা বললে তাকে আইনের আওতায় আনা হয়।

জুয়েল স্মারকলিপির বরাত দিয়ে বলেন, যেখানে প্রধানমন্ত্রী মহান জাতীয় সংসদে আপনার বক্তব্যে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর ও স্বাধীনতা পদকে ভূষিত (মরণোত্তর) প্রয়াত একেএম সামসুজ্জোহা ও ঐতিহ্যবাহী ওসমান পরিবারের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং ’৭৫-পরবর্তী সময়ের ভূমিকা নিয়ে যেভাবে বর্ণনা দিয়েছিলেন, তাতে নারায়ণগঞ্জবাসী গর্বিত ও সম্মানিত হয়েছে। সেখানে মেয়র আইভী ক্রমবদ্ধভাবে পুরো ওসমান পরিবারকে খুনি পরিবার আখ্যা দিয়ে চলেছেন।

তার এসব বক্তব্যের দ্বায়ভার নারায়ণগঞ্জবাসী নেবেন না। এসব ঘটনা ও আইভীর বক্তব্য প্রমাণ করে- আওয়ামী লীগে জামায়াতের এজেন্ট কে বা কারা। জামায়াতের আমীরের দেয়া সেই জবানবন্দির প্রতিটি কথাই মিলে যাচ্ছে তার কর্মকাণ্ডে।

আমরা কারও পক্ষে বা বিপক্ষে নই। আমরা সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলতে চাই। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে আমরা লজ্জিত, দুঃখিত ও শঙ্কিত। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করা আমাদের দায়িত্ব ও পবিত্র কর্তব্য মনে করছি এবং তার হস্তক্ষেপ কামনা করেছি। আমাদের এই স্মারকলিপি প্রমাণ করে, পুরো নারায়ণগঞ্জের সুশীল সমাজ ও সব শ্রেণী-পেশার মানুষ আইভীর কার্যকলাপের বিরুদ্ধে একাট্টা হয়েছে।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদল, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহা, জেলা পিপি অ্যাডভোকেট ওয়াজেদ আলী খোকন, বাংলাদেশ হোসিয়ারি সমিতির সভাপতি নাজমুল আলম সজল, সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র মতিউর রহমান মতি, নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি খালেদ হায়দার খান কাজল, স্বাচিপের সাধারণ সম্পাদক ডা. দেবাশীষ রায়, জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মহসিন, জেলা ক্রীড়া সংস্থার যুগ্ম সম্পাদক ইব্রাহীম চেঙ্গিস প্রমুখ।

সকালে জেলা প্রশাসক রাব্বী মিয়া ওই স্মারকলিপি গ্রহণ করে বলেন, এ স্মারকলিপিটি প্রধানমন্ত্রীর কাছে যথাযথ নিয়মেই প্রেরণ করা হবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×