ডেমরায় সওজের ৫০ কোটি টাকার সম্পত্তি দখল

  সিরাজুল ইসলাম ২২ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ডেমরায় সওজের ৫০ কোটি টাকার সম্পত্তি দখল

সড়ক ও জনপথের (সওজ) ৫০ কোটি টাকার সম্পত্তি জালিয়াতির মাধ্যমে দখল করে নিয়েছে একটি চক্র।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সংলগ্ন ডেমরা থানার সাইনবোর্ড এলাকার ডগাইর মৌজায় এ জমির পরিমাণ ১ দশমিক ৭১ একর।

জমি উদ্ধারে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংশ্লিষ্ট দফতরে চিঠি দিলেও ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। উপরন্তু ডেমরা থানা পুলিশ ও ভূমি অফিসের অসাধু কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় ওই চক্রটি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

সরকারি ওই জমির পাশে ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পত্তি দখলের পাঁয়তারাও চালায় চক্রটি। তা ঠেকানোর আবেদন করেন এক ব্যবসায়ী। এর ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট দফতরে খোঁজ নিতে গিয়ে বেরিয়ে আসে সরকারি জমি দখলের তথ্য। পরে আবারও (১২ মার্চ) দুদকে অভিযোগ করা হয়।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ডগাইর মৌজার ১৬৬৫ দাগের ৬৩ শতাংশ জমি আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার কাছ থেকে ৫ বছরের চুক্তিতে ভাড়া নিয়ে সেখানে ব্যবসা পরিচালনা করছিলেন ডেমরা পারিজাত সিটি মার্কেট এলাকার ব্যবসায়ী মো. ইউসুফ। গত ডিসেম্বরে হঠাৎ রাতের আঁধারে ডেমরা মাতুয়াইল এলাকার ফজলুল কবির ও নূরে আলম ওই জমিতে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করেন। এ সময় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে থাকা ইউসুফের ১৫টি গাড়ি ভাংচুর করা হয়। এ নিয়ে ডেমরা থানায় গেলে পুলিশ মামলা নেয়নি। একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) নিয়ে ইউসুফকে ডেমরা থানার ওসি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, উভয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টির সমাধান করে দেয়া হবে।

এরপর একদিকে আলোচনার নামে কালক্ষেপণ, অন্যদিকে জিডির তদন্তের নামে সময় অতিবাহিত হতে থাকে। তদন্ত কর্মকর্তা এসআই কবির হোসেন উকিল জালিয়াত চক্রের কাছে ‘ম্যানেজ’ হন। এ নিয়ে পুলিশের ওয়ারী বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিনের কাছে অভিযোগ দেয়া হয়। এর তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এসপি পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত) শাহ ইফতেখার আহমেদকে। তিনি বেশ কয়েকবার বৈঠক ডাকেন। এসব বৈঠকে ইউসুফ ও তার পক্ষের লোকজন নিয়মিত অংশ নিলেও ফজলুল কবির ও নূরে আলম বারবার বৈঠক এড়িয়ে গেছেন। তবে কখনও কখনও আইনজীবী খলিলুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

নিষ্পত্তির দায়িত্ব পাওয়ার পর এসপি শাহ ইফতেখার আহমেদ একাধিকবার বিরোধপূর্ণ জমিতে যান। উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে সার্ভেয়ার দিয়ে জমি পরিমাপের ব্যবস্থা করেন। এতে দেখা যায়, ইউসুফের ৬৩ শতাংশ জমির মধ্যে ৩০ শতাংশের বেশি জমি দখল করে নিয়েছেন ফজলুল কবির ও নূরে আলম। পুলিশ দখল করা জমি ছেড়ে দিতে বললেও তারা ছেড়ে দেয়নি। জমি উদ্ধারে পুলিশও পরে জোরালো ভূমিকা নেয়া হয়নি। পরে মান্নান ভূঁইয়া ও ইউসুফ ডেমরার ওসি সিদ্দিকুর রহমানের কাছে গেলে তিনি (ওসি) জানান, দখলদারদের পক্ষে তদবির করছেন পুলিশের ডিআইজি (মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের পরিচালক) ড. মাসুম রব্বানী। তাই এ নিয়ে তিনি ব্যবস্থা নিতে পারছেন না।

এ বিষয়ে ডিআইজি মাসুম রব্বানী যুগান্তরকে বলেন, যারা আমার নাম ভাঙাচ্ছেন তারা সঠিক কাজ করছেন না। ওই জমির বিষয়ে আমি পুলিশের কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলিনি। ফজলুল করিম বা নূরে আলম নামে কারও সঙ্গে আমার কোনো পরিচয় নেই। যারা আমার নাম ভাঙিয়ে সরকারি জমি দখলের চেষ্টা করছেন, তাদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেব। অবৈধ কাজে সহযোগিতা করা পুলিশ সদস্যের কাজ না। যারা হয়রানির শিকার হবে, তাদের সহযোগিতা করাই পুলিশের কাজ।

দখল হয়ে যাওয়া সম্পত্তি রক্ষায় স্থানীয় ভূমি অফিস, ভূমি মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যোগাযোগ করেন ইউসুফ ও মান্নান। এর পরিপ্রেক্ষিতে নথিপত্র তল্লাশি দেয় সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরগুলো। এর মাধ্যমে জানা যায়, ফজলুল কবির ও নূরে আলম জালিয়াতির মাধ্যমে ডেমরা ডগাইর মৌজার ১৬৬৪ ও ১৬৬৫ দাগের ১ দশমিক ৭১ একর সওজের জমি জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে দখল করে নিয়েছে। সরকারি এ সম্পত্তি উদ্ধারে ঢাকা জেলা প্রশাসককে ৬ জানুয়ারি চিঠি দেয় ভূমি মন্ত্রণালয়। এর আগে গত বছরের ২৬ আগস্ট দুদক সম্পত্তি উদ্ধারে ভূমি মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছিল।

নথিপত্র ঘেঁটে ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সওজ ১৯৬৭/৬৮ সালে এলএ (ল্যান্ড একোয়ার) কেসের মাধ্যমে এ জমি অধিগ্রহণ করে। পরে জনৈক শামীম মাহমুদ ও মনজুর মোর্শেদ গংয়ের কাছ থেকে পাওয়ার অব অ্যটির্নিমূলে এ সরকারি জমির মালিকানা দাবি করে জনৈক কমল সরকার গং। তারা সরকারি অধিগ্রহণ বাতিল করার জন্য ২০০৯ সালে আবেদন করে। সওজ অধিগ্রহণ বাতিল করে। কিন্তু ২০১০ সালে অধিগ্রহণ বাতিল সংক্রান্ত আদেশ আদালতে অবৈধ ঘোষণা হওয়ায় জমিটি কমল গংয়ের কাছ থেকে ফেরত নেয়ার জন্য জেলা প্রশাসককে আদেশ দেয় ভূমি মন্ত্রণালয়।

ওই বছরেই শামীম মাহমুদ গং সরকারের এ আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট করে (নং ৮২০০)। এর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনও হয়নি। এর মধ্যেই ২০১১ সালে কমল সরকার গং ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের জোগসাজশে জমিটি ফজলুল কবির গংয়ের কাছে বিক্রি করে। এ জালিয়াতির তথ্য দুদকের নজরে এলে সংস্থাটি সরকারি এ সম্পত্তি উদ্ধারের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিবকে চিঠি লেখেন।

জানতে চাইলে পুলিশের ওয়ারী বিভাগের এডিসি (এসপি পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত) শাহ ইফতেখার আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, জমি-জমার বিষয়ে পুলিশের তেমন কিছু করার এখতিয়ার নেই। বিষয়টি সামাজিকভাবে নেগশিয়েশনের চেষ্টা করেছি। একজন অফিসারকে সার্বক্ষণিক নিয়োজিত রেখেছি। দু-একদিনের মধ্যে উভয় পক্ষকে ডেকে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করব। বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে রোববার রাতে যোগাযোগ করা হয় সওজের সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী মেহেদী ইকবালের সরকারি মোবাইল নম্বরে। ওই নম্বরটি ধরেন একজন সাব-ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার।

তিনি বলেন, ‘বিষয়টি দেখভাল করছেন নির্বাহী প্রকৌশলী মহোদয়। উনার অবর্তমানে আমি চলতি দায়িত্বে আছি। তাই এ নিয়ে আমি তেমন কিছু বলতে পারব না।

নির্বাহী প্রকৌশলী মহোদয় দেশের বাইরে আছেন। ২১ মার্চ দেশে ফিরবেন।’ তিনি দাবি করেন, ‘দখল করা জমি উদ্ধারে যথাযথ প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হচ্ছে।’ এ বিষয়ে যোগাযোগ করলে নূরে আলম যুগান্তরকে বলেন, অনেকে অনেক কথা বলতে পারে।

আমরা এতে ভীত নই। আমরা কারও জমিতে প্রবেশ করিনি। নিজেদের জমি নিজেরা ভোগ-দখল করছি। বিষয়টি পুলিশ প্রশাসনসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতর জানে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×