অর্থমন্ত্রীর কাছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের প্রতিবেদন

বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের ৬৮ শতাংশই দুর্নীতির কারণে

সব অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চু

  মিজান চৌধুরী ২৪ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বেসিক ব্যাংক

দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণেই বেসিক ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের ৬৮ শতাংশই খেলাপি হয়েছে। ২০০৯ সালে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১৪১ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত ঋণের ৪ দশমিক ৪২ শতাংশ।

কিন্তু ২০১৮ সালে বেসিক ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৮ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের হার ৯ বছরে বেড়েছে ৫৬ দশমিক ৭১ শতাংশ। ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত নানা ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণেই এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, সেসব দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুসহ কতিপয় পরিচালক ও কর্মকর্তা।

সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের কাছে উত্থাপিত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য। এতে বলা হয়, ঋণ মঞ্জুর থেকে শুরু করে জনবল নিয়োগ, পদোন্নতি, নতুন শাখা খোলা, ক্রয়-বিক্রয় ও অফিস স্পেস ভাড়াসহ সর্বক্ষেত্রে অনিময় ও দুর্নীতি হয়েছে ব্যাংকটিতে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বেসিক ব্যাংকের সব অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুসহ কতিপয় পরিচালক ও কর্মকর্তার সংশ্লেষ ছিল। ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই বেসিক ব্যাংকের ওপর পরিচালিত বহিঃনিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান মেসার্স আজিজ হালিম খায়ের চৌধুরী চাটার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস ফার্মের নিরীক্ষা ও অনুসন্ধানে এ তথ্য উদ্ঘাটন হয়। ফার্মটির প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়ে এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে সাবেক চেয়ারম্যানসহ কতিপয় কর্মকর্তার জড়িত থাকার বিষয়টি।

২০০৯ সালের পর থেকেই বেসিক ব্যাংকের অবনতি ঘটতে থাকে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৯ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত নানা ধরনের অনিময় ও দুর্নীতি হয় ব্যাংকটিতে। ২০০৯ সালে এ ব্যাংকের শ্রেণীকৃত ঋণ ছিল ১৪১ কোটি টাকা। এটি বিতরণকৃত ঋণের ৪ দশমিক ৪২ শতাংশ। কিন্তু এরপর ক্রমান্বয়ে খেলাপি ঋণ বাড়তে থাকে। সর্বশেষ ২০১৮ সালে বেসিক ব্যাংকে শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৮ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের হার এ ৯ বছরে বেড়েছে ৫৬ দশমিক ৭১ শতাংশ।

ব্যাংকের মুনাফা প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৯ সালে ব্যাংকটি মুনাফা করেছিল ১৫৭ কোটি টাকা। কিন্তু ওই সময়ের তুলনায় বেশি জনবল, শাখা ও আধুনিক সুবিধা নিয়ে ২০১৮ সালে মুনাফার পরিমাণ বাড়ার পরিবর্তে কমে দাঁড়ায় ১১৩ কোটি টাকা। একদিকে খেলাপি ঋণ বাড়া, অন্যদিকে মুনাফা কমে যাওয়ায় পরিচালনার ক্ষেত্রে ক্ষতির মুখে পড়ে ব্যাংকটি। এ সময় ব্যাংকে জনবল নিয়োগেও নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে।

প্রতিবেদনের বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, বেসিক ব্যাংকে দুর্নীতি ও অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সময়। বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল দায়িত্ব গ্রহণের পর ব্যাংকিং খাতের সংস্কারে বিশেষ মনোযোগ দিয়েছেন। তারই অংশ হিসেবে বেসিক ব্যাংকের পুরো বিষয়টি জানাতে এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। অর্থমন্ত্রী এ প্রতিবেদনে উল্লিখিত তথ্য অবহিত হয়ে পরবর্তী কার্যক্রম ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবেন ব্যাংকটি সম্পর্কে।

জানতে চাইলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (ব্যাংকিং) ফজলুল হক বলেন, বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আদায় ও কার্যক্রম পুরোপুরি ওই ব্যাংকের এখতিয়ার। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ যে কোনো ব্যাংকের নীতিগত কোনো বিষয় থাকলে সেটি সহায়তা করে থাকে। বেসিক ব্যাংকে এ ধরনের কিছু কাজ হচ্ছে।

বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন এ মজিদ শনিবার যুগান্তরকে জানান, চেষ্টা চলছে এ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনার। তিনি বলেন, একটি ব্যাংক অবলুপ্ত হওয়া কারও কাম্য নয়। ফলে প্রচেষ্টা চলছে সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে বেসিক ব্যাংকের তিনটি শাখায় প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়ে। এর মধ্যে গুলশান শাখায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা, শান্তিনগর শাখার ৩৮৭ কোটি টাকা, মেইন শাখায় প্রায় ২৪৮ কোটি টাকা ও দিলকুশা শাখায় ১৩০ কোটি টাকা অনিয়মের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ শনাক্ত করা হয়। পাশাপাশি বেসিক ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তে আরও এক হাজার কোটি টাকার জালিয়াতির ঘটনা বেরিয়ে আসে। সব মিলে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়ে। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই ও অনুসন্ধান শেষে বেসিক ব্যাংকের দুর্নীতির ঘটনায় ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর ৫৬টি মামলা করে দুদক। তবে এসব মামলার কোনোটিতেই ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুকে আসামি করা হয়নি। তিনি এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে আছেন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×