প্রণোদনার ২৪০ কোটি টাকা মিলারদের পকেটে

প্রতি কেজিতে কৃষকের লোকসান ৬ টাকা * কৃষক বাঁচাতে বেশি করে ধান কিনবে সরকার * ২৮ মার্চ খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির বৈঠক * বোরো মৌসুমে কেনা হতে পারে ১২-১৫ লাখ টন

  উবায়দুল্লাহ বাদল ২৫ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রণোদনার ২৪০ কোটি টাকা মিলারদের পকেটে
ফাইল ছবি

অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে চলতি বছর আমন মৌসুমে ৮ লাখ টন চাল কিনেছে সরকার। কৃষকদের প্রণোদনা দেয়ার জন্য বাজার মূল্যের চেয়ে কেজিপ্রতি ৩ টাকা বেশি দিয়ে চালের ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয়। তবে এতে প্রান্তিক কৃষকের উপকার হয়নি। প্রতি কেজি ধানে ৬ টাকা করে লোকসানও পূরণ হয়নি।

কৃষক নয়, চাল কেনা হয়েছে মিলারদের কাছ থেকে। ফলে অতিরিক্ত ২৪০ কোটি টাকা গেছে মিলারদের পকেটে। এ অবস্থায় প্রান্তিক কৃষকের কাছ থেকে চলতি বোরো মৌসুমে চালের বদলে ধান কেনার চিন্তা করছে সরকার। আগামী ২৮ মার্চ খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির বৈঠকে এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে।

এটি কার্যকর হলে ধান-চালে সরকারের প্রণোদনার টাকার সুফল পাবে সরাসরি কৃষক। দৌরাত্ম্য কমবে মধ্যস্বত্বভোগী দালাল ও ফড়িয়াদের। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার রোববার নিজ দফতরে যুগান্তরকে বলেন, ‘ধান-চাল সংগ্রহ নিয়ে সরকার উভয় সংকটে। চালের দাম বৃদ্ধি পেলে পত্রপত্রিকায় নেতিবাচক সংবাদে ভরে যায়। অন্যদিকে চালের দাম সহনীয় পর্যায়ে থাকলে কৃষকের উৎপাদন খরচই ওঠে না। সরকার কৃষককে বাঁচাতে বাজার মূল্যের চেয়ে বেশি দামে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে চাল কিনে থাকে। কিন্তু এই বেশি টাকা কৃষকের পকেটে যায় না।

সরকারি শর্ত মেনে কৃষক চাল দিতে না পারায় তা কেনা হয় মিলারদের কাছ থেকে। ফলে লাভবান হন মিলাররাই। এবার আমরা চিন্তা করছি চালের বদলে বেশি করে ধান কিনব। কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনলে প্রণোদনার টাকার সুফল পাবে কৃষক।’

বোরো মৌসুমে ধান-চাল মিলে ১২ থেকে ১৫ লাখ টন কেনা হতে পারে আভাস দিয়ে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ধান সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় ‘পেডি সাইলো’ নির্মাণ করা হবে। প্রতিটি সাইলোতে ড্রায়ার মেশিন বসানো হবে। যাতে সরকারের শর্ত মেনে কৃষক ধান দিতে পারে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ এবং এ সংক্রান্ত একটি প্রকল্প প্রস্তাবও তৈরি করতে বলা হয়েছে।’

সূত্র জানায়, গত আমন মৌসুমে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে মোট ৮ লাখ টন চাল সংগ্রহ করা হয়। প্রথমদিকে ৬ লাখ টন থাকলেও পরে আরও ২ লাখ টন বাড়ানো হয়। সরকার প্রতি কেজি চালের দাম নির্ধারণ করে দেয় ৩৬ টাকা। খাদ্য অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী পুরো মৌসুমে বাজারে প্রতি কেজি মোটা চাল (স্বর্ণা/পুটি) পাইকারি ২৭ থেকে ২৯ টাকা আর খুচরা ৩০ থেকে ৩৩ টাকা। কৃষকের স্বার্থে গড়ে প্রতি কেজি চালে ৩ টাকা বেশি দাম নির্ধারণ করে সরকার।

সে হিসাবে ৮ লাখ টন চালে সরকারের অতিরিক্ত দিতে হয়েছে ২৪০ কোটি টাকা। যা প্রান্তিক কৃষকের জন্য দেয়া হলেও তা চলে গেছে মিলারদের পকেটে। কারণ সরকারি নীতিমালার শর্ত পূরণ করে কৃষক গুদামে চাল দিতে পারে না। এ কারণে চালকল মালিক বা মিলারদের কাছ থেকে সরকার চাল কিনে থাকে। আর মিলাররা কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনে চাল করে সরকারি গুদামে দিয়ে থাকে।

ফলে সরকারি প্রণোদনার টাকার পুরোটাই মিলারদের পকেটে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা বলছেন। তাদের হিসাবে, বর্তমানে দেশের উত্তরাঞ্চলের হাটবাজারে প্রতি মণ স্বর্ণা-৫ জাতের ধান ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা, রনজিত ৬২০ থেকে ৬৭০ টাকা ও বিআর-৪৯ জাতের ধান ৬১০ থেকে ৭০০ টাকা দরে কেনাবেচা হচ্ছে।

অর্থাৎ প্রতি কেজি ধান বিক্রি হচ্ছে (সর্বোচ্চ ৭০০ টাকা ধরে) ১৮ টাকা ৯২ পয়সায়। অথচ কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে এবার প্রতি কেজি আমন ধানের উৎপাদন ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫ টাকা ৩০ পয়সা। এই হিসাবে কেজিপ্রতি ধানে কৃষকের লোকসান হচ্ছে ৬ টাকার বেশি।

বিষয়টি অস্বীকার করেননি বাংলাদেশ অটো রাইস মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম মোস্তফা। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘সরকারের নীতিনির্ধারকরাও এটা মনে করেন। কিন্তু সরকার যে প্রণোদনা দেন তা গুটিকয়েক মিলারদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তারা অনৈতিকভাবে নিজেদের মিলের নামে ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত বরাদ্দ নিয়ে থাকেন। তারাই এটার সুফলভোগী। তাদের কারণে উত্তরবঙ্গের ৮০ শতাংশ হাস্কিং মিল বন্ধ হয়ে চাতালে ঘাস জন্মেছে।

ব্যাংকঋণ শোধ করতে পারছে না।’ কৃষকদের বাঁচাতে হলে সরকারকে ভরা মৌসুমে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনতে হবে। পাশাপাশি এখনই সরকারকে ঘোষণা দিতে হবে আরও ১০-১২ লাখ টন ধান কেনা হবে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে। তাহলে ধান-চালের দাম বাড়বে। কৃষক উপকৃত হবে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে খাদ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক আরিফুর রহমান অপু যুগান্তরকে বলেন, কৃষকের স্বার্থ রক্ষা করতে হলে তাদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কিনতে হবে। তবে গুদামে রাখতে ধান একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় শুষ্ক থাকা প্রয়োজন। কৃষকরা এই মাত্রায় শুষ্ক ধান দিতে পারেন না। তবে ইতিমধ্যে বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা হয়েছে। পেডি সাইলো নির্মাণে একটি প্রকল্প তৈরি করা হচ্ছে। উপযুক্ত গুদাম নির্মাণ সাপেক্ষে ভবিষ্যতে বেশি করে ধান কেনা হবে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×