যুগান্তরের সঙ্গে আলাপে ড. আকবর

রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় বদলে যাবে ক্যান্সার চিকিৎসা

৩০ বছর ধরে জাপানে গবেষণা করছেন হেপাটাইটিস-বি রোগের ওষুধ আবিষ্কারক এই বাংলাদেশি চিকিৎসক

  রাশেদ রাব্বি ৩১ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জাপানের ‘এহিমে ইউনিভার্সিটি গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব মেডিসিনের সিনিয়র সহকারী অধ্যাপক ড. শেখ মোহাম্মদ ফজলে আকবর।
জাপানের ‘এহিমে ইউনিভার্সিটি গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব মেডিসিনের সিনিয়র সহকারী অধ্যাপক ড. শেখ মোহাম্মদ ফজলে আকবর।

রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা পরিবর্তনের মাধ্যমে বদলে যেতে পারে ক্যান্সারসহ নানা জটিল-কঠিন রোগের চিকিৎসা। বর্তমানে যেসব রোগের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ব্যবস্থা চলমান রয়েছে, প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে যেগুলো হয়ে যেতে পারে স্বল্পমেয়াদি।

এমনকি রোগ যত কঠিনই হোক না কেন, পদ্ধতি বদলের মাধ্যমে রোগী থাকবেন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ামুক্ত। এমনটিই মনে করছেন জাপানের ‘এহিমে ইউনিভার্সিটি গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব মেডিসিনের সিনিয়র সহকারী অধ্যাপক ড. শেখ মোহাম্মদ ফজলে আকবর।

সম্প্রতি ড. আকবর ঢাকায় এলে তার সঙ্গে এ নিয়ে যুগান্তরের এ প্রতিবেদকের কয়েক দফা আলাপ হয়। ড. আকবর বলেছেন, ৩০ বছর ধরে আমি ‘মানুষের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা’ বা ‘ইমিউন সিস্টেম’ নিয়ে গবেষণা করছি। চেষ্টা করছি কীভাবে মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা উন্নত করে রোগমুক্তি পাওয়া যায়। ইতিমধ্যে এ পদ্ধতি প্রয়োগ করে, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা উন্নীতকরণের মাধ্যমে হেপাটাইটিস-বি রোগের চিকিৎসায় অভূতপূর্ব সাফল্য পেয়েছি। এখন একইভাবে ক্যান্সার নিরাময়ে গবেষণা করছি।

অধ্যাপক আকবর বলেন, ওষুধ কোম্পানিগুলো নিজেদের ব্যবসার জন্য শুধু জীবাণু মারার ওষুধ তৈরি করে। জীবাণু আক্রমণের ফলে যতবার মানুষ রোগাক্রান্ত হবে, ততবারই তাকে ওষুধ কিনতে হবে। কিন্তু রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ালে ওষুধ কোম্পানিগুলোর ব্যবসা সংকুচিত হয়ে পড়বে।

ড. আকবর বলেন, মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কাজে ভিন্নতা রয়েছে, ফলে এসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং ব্যবস্থাও আলাদা। তিনি বলেন, যেমন: কিডনি, যকৃৎ, হৃদযন্ত্র, ফুসফুস, বৃহদান্ত, ক্ষুদ্রান্ত, প্লিহা, পাকস্থলীর কাজের ধরন ভিন্ন।

ফলে এদের প্রত্যেকের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাও ভিন্ন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বিভিন্ন উপাদানের জটিল সমন্বয়ে তৈরি এক প্রাকৃতিক ক্ষমতা, যা মানবদেহে রোগ-জীবাণুর বিরুদ্ধে সুরক্ষা জোগায়। এসব উপাদানের যে কোনোটির অভাব হলে প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।

ড. আকবর বলেন, বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন রোগ সারাতে যেসব ওষুধ ব্যবহৃত হচ্ছে, সেগুলো সবই জীবাণু মারার ওষুধ। এ ধরনের ওষুধ ব্যবহারের পরও একই রোগ একজনকে একাধিকবার আক্রমণ করতে পারে। ওষুধ কোম্পানিগুলো ব্যবসার স্বার্থে এ ধরনের ওষুধ আবিষ্কার ও উৎপাদন করে থাকে।

কেননা এ ধরনের রোগ যতবার আক্রমণ করবে মানুষ ততবারই ওষুধ কিনবে। তিনি বলেন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো গেলে ওই জীবাণু মানুষের শরীরে প্রবেশই করতে পারবে না, করলেও ‘ইমিউন সিস্টেম’ তা প্রতিরোধ করবে।

এর আগে ড. আকবর হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার্থে ‘প্রতিরোধ ব্যবস্থা’ উন্নীতকরণে ‘ন্যাসভ্যাক’ নামে একটি ওষুধ আবিষ্কার করেন। যে ওষুধটি শুধু আক্রান্ত ব্যক্তির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস নিরাময়ে বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করে। যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএসহ একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে তার স্বীকৃতিও পেয়েছেন তিনি। প্রচলিত চিকিৎসা ব্যবস্থায় রোগীর শরীরে পার্শ্বপতিক্রিয়া দেখা দিলেও ‘ন্যাসভ্যাকে’-এর কোনো পার্শ্বপতিক্রিয়া নেই। এটি বিশ্বজুড়ে লিভার রোগের চিকিৎসায় নতুন যুগে প্রবেশ করেছে।

রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা উন্নত করে ক্যান্সার নিরাময়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করে ড. আকবর বলেন, হয়তো সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে ক্যান্সার জয় করা সম্ভব হবে। মানুষ মুক্তি পাবে কেমোথেরাপি এবং রেডিও থেরাপির মতো ভয়ংকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াযুক্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা থেকে।

জাপানে কোনো বিদেশি চিকিৎসককে (যারা জাপানে এমবিবিএস করেননি) রোগী দেখার অনুমতি দেয়া না হলেও ডা. ফজলে আকবর ব্যতিক্রম। এসএসসি এবং এইচএসসিতে রাজশাহী বোর্ডে ফার্স্ট হওয়া আকবর রাজশাহী মেডিকেল কলেজ থেকেও প্রথম স্থান অধিকার করেন।

ডা. আকবরই প্রথম কোনো বাংলাদেশি যিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানের ওপর দুই শতাধিক পূর্ণাঙ্গ গবেষণা করেছেন এবং যেগুলো আন্তর্জাতিক জার্নালে ছাপা হয়েছে। মানুষের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত তত্ত্ব ‘সেলফ-ননসেলফ’ ধারণা চ্যালেঞ্জ করে ‘ডেঞ্জার-ননডেঞ্জার’ তত্ত্ব প্রদান করেন। বর্তমান চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই তত্ত্বের ওপরেই বিভিন্ন ধরনের প্রতিষেধক তৈরি হচ্ছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×