প্রকল্প বড়ভাগা নদীর খনন উলাকি খালে

পুরনো কাজ দেখিয়ে নতুন প্রকল্পের অর্থ লুটের আয়োজন

  আজমল খান, সিলেট ব্যুরো ০৪ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রকল্প বড়ভাগা নদীর খনন উলাকি খালে

সিলেটে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকার প্রকল্পে লুটপাটের আয়োজন করা হয়েছে। নির্ধারিত প্রকল্পে কাজ না করে আগে কাজ করা হয়েছে এমন প্রকল্পে নামমাত্র কাজ করে টাকা তুলে নেয়ার পাঁয়তারা চলছে। অভিযোগ উঠেছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা যোগসাজশ করে এমনটি করছে।

দক্ষিণ সুরমা উপজেলায় বড়ভাগা নদী (প্রকল্পপত্রে ‘খাল’ লেখা রয়েছে) খননে ওই প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। খনন চলছে উলাকির খালে। অথচ উলাকির খালে খনন কাজ গত বছর শেষ হয়, ওই প্রকল্পের টাকাও তুলে নেয়া হয়েছে।

এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সিলেট-গোলাপগঞ্জ সড়কের পাশে শ্রীরামপুর মৌজার শেষ প্রান্তে একটি উদ্বোধনী ফলক রয়েছে। ফলকে দেখা যায়, ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে উলাকির খালের খনন কাজ উদ্বোধন করেন সিলেট-৩ আসনের এমপি মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী।

প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)। কাজ শেষ হওয়ার পর গত বছরের ১১ মার্চ কৃষি মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মকবুল হোসেন এমপির নেতৃত্বে সংসদীয় টিম উলাকি খালের কাজ পরিদর্শন করেন। উলাকির খাল কুচাই ও দাউদপুর এলাকার লুলা বিল, মেদি বিল ও দবাগি বিলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে টলা খালে মিলিত হয়েছে। টলা খালটিও গত অর্থবছরে খনন করা হয়েছে।

সিলেট-ফেঞ্চুগঞ্জ সড়কের মহিলুকা ব্রিজের পাশে আরেকটি ফলক দেখা গেছে। এতে দেখা যায়, টলা খালের সোয়া ৩ কিলোমিটার এলাকা ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে খনন করা হয়েছে।

বড়ভাগা নদী পুনঃখনন প্রকল্পের ৫০ কিলোমিটার খননের জন্য ১৬ কোটি ৪ লাখ টাকার একটি প্রকল্প প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে (অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে) অনুমোদন হয়। এর মধ্যে দক্ষিণ সুরমা উপজেলার অংশের জন্য ৩ কোটি ৭৮ লাখ ৩৫৯ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। প্রকল্পের কাজ করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসএ এসআই প্রাইভেট লিমিটেড। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি কার্যাদেশ অনুযায়ী কাজ করছে না। ফেব্রুয়ারিতে মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী এমপি এ প্রকল্প কাজের উদ্বোধন করেন।

উদ্বোধনী ফলকের পশ্চিম দিকে প্রায় ২ হাজার ফুট দূরবর্তী স্থান থেকে বড়ভাগা নদী শুরু হয়েছে। পূর্ব দিক থেকে টলাখাল ও উত্তর দিকে কাটা খালের সংযোগস্থল পুড়ারখাল মৌজা থেকেই বড়ভাগা নদীর উৎপত্তি। নদীটি পুড়ারখাল, ছত্তিঘর, বারই গ্রাম, হরিষপুর, গোপাল, সুনামপুর হয়ে জালালপুর অতিক্রম করে বালাগঞ্জের কুশিয়ারা নদী হয়ে সুনামগঞ্জ জেলায় প্রবেশ করে।

কুচাই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আনা মিয়া বলেন, এ প্রকল্পে পুকুর চুরি হচ্ছে। গত বছর উলাকি খাল খনন করা হয়েছে। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ড উলাকি খাল খনন কেন করছে সংশ্লিষ্টদের কাছে জানতে চাইলে তারা সদুত্তর দিতে পারেনি। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান তিনি।

কুচাই ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আবদুল বাছিত বলেন, যেখানে খনন করা হচ্ছে সেটি উলাকি খাল। আর যেভাবে খনন করা হচ্ছে সেটাও ভয়ংকর। একটু বৃষ্টি হলেই পুরো এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়ে ব্যাপক ফসলহানির আশঙ্কা রয়েছে। জলাবদ্ধতা ও ফসলহানির আশঙ্কায় শ্রীরামপুর ফসল সমবায় সমিতি দক্ষিণ সুরমা উপজেলার ইউএনওর কাছে আবেদন করেছে।

এ ব্যাপারে মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী এমপি যুগান্তরকে বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বড়ভাগা নদী খননের তদারকি করছেন।’ আরেক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন দাউদপুরের উজানে বড়ভাগা নদী শুরু হয়েছে। বড়ভাগা নদী খনন প্রকল্প ছাড়া বর্তমানে এখানে আর কোনো প্রকল্প নেই। গত বছর উলাকি খাল ও টলা খালে কাজ হয়েছে।’

এ বিষয়ে কথা বলতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসএ এসআই প্রাইভেট লিমিটেডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নম্বর চাইলে তা দেননি সাইট কর্মকর্তা মাহতাব মিয়া। তিনি বলেন, ‘যা বলার আমাকেই বলুন।’ এক প্রকল্পের কাজ কেন অন্য প্রকল্পের স্থানে হচ্ছে জানতে চাইলে মাহতাব বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের দেখানো মতে কাজ করা হচ্ছে। প্রকল্পের স্থান কোথায় এটি আমার সঠিক জানা নেই।’ এমনটি বলেই ফোন কেটে দেন তিনি। পরে বহুবার ফোন দিলেও আর ধরেননি।

প্রকল্পটি তদারকির দায়িত্বে রয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাব ডিভিশন-৩ এর প্রকৌশলী মো. মনির হোসেন। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাজ করা খালে আমাদের কাজ করার সুযোগ নেই। তবে তারা আপত্তি না দেয়ায় আমরা কাজ করছি। এক প্রকল্পের কাজ কিভাবে আরেক প্রকল্পে হচ্ছে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমি শুধু কাজ তদারকি করছি। প্রকল্প যারা প্রস্তুত করেছে (সাব ডিভিশন-২) তারা বিষয়টি ভালো জানে। ‘বড়ভাগা নদী’ কিভাবে ‘বড়ভাগা খাল’ হল সেটিও তারাই বলতে পারবে। ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশ করে অর্থ লোপাটে তার সস্পৃক্তির অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি। বলেন, এসব বিষয়ে আমি কিছু জানি না।

প্রকল্প প্রস্তুতকারী সাব ডিভিশন ২-এর কর্মকর্তা গোলাম বারীর কাছে জানতে চাইলে তিনি, তখন বন্যার পানি ছিল। চতুর্দিকে পানি থাকায় সঠিকভাবে নদী নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। তাই ভুল হতে পারে।

জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহিদুজ্জামান বলেন, প্রকল্প মতে কাজ হচ্ছে। তবে এটি প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্প হওয়ায় তাড়াহুড়া করতে গিয়ে একটু এদিক-সেদিক হতে পারে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×