সঞ্চয়পত্রের বিক্রি বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে

আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বিরূপ প্রভাব

সুদ পরিশোধে ব্যয় বেড়েছে ৯২ শতাংশ * খতিয়ে দেখতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কমিটি গঠন

  মিজান চৌধুরী ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সঞ্চয়পত্রের বিক্রি অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা খাতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। সঞ্চয়পত্র খাতে সরকারকে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। ব্যাহত হচ্ছে ঋণ ব্যবস্থাপনার মূলনীতিও। এছাড়া আমানতকারীরা সঞ্চয়পত্রমুখী হওয়ায় ব্যাংকগুলোর আমানত কমে যাচ্ছে। সার্বিকভাবে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বিরূপ প্রভাবের বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন সরকার। ইতিমধ্যে সামষ্টিক অর্থনীতি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা খাতে সঞ্চয়পত্র বিক্রি বেড়ে যাওয়ার প্রভাব খতিয়ে দেখতে একটি কমিটি গঠন করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।

জানা গেছে, সরকার চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে ৩০ হাজার ১৫০ কোটি টাকা ঋণ ঋণ নেয়ার লক্ষ্য ছিল। কিন্তু অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসেই (জুলাই থেকে ডিসেম্বর) সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রির পরিমাণ হচ্ছে ২৩ হাজার ৮২৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ ৬ মাসেই মোট লক্ষ্যমাত্রার ৮০ শতাংশ অর্জিত হয়ে গেছে। সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি অর্থ আসায় ব্যাংকিং খাত থেকে সরকার ঋণ গ্রহণ করেনি। তবে এ সময় সরকার ব্যাংকিং খাতের বকেয়া ২ হাজার ২৯২ কোটি টাকা ঋণ পরিশোধ করেছে।

অস্বাভাবিক হারে সঞ্চয়পত্র বিক্রি বেড়ে যাওয়ার পেছনে তিনটি কারণ দেখছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটি। প্রথমত, ব্যাংকগুলোতে মেয়াদি আমানতের বিপরীতে প্রদেয় সুদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে। ব্যাংকিং খাতে তারল্য উদ্বৃত্তের কারণে সুদের হার কমেছে। দ্বিতীয়ত, শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশের অভাব। যে কারণে সঞ্চয়কারীরা বিনিয়োগের উত্তম বিকল্প হিসেবে আকর্ষণীয় ও ঝুঁকিমুক্ত সঞ্চয় স্কিমকেই বেছে নিচ্ছেন। সর্বশেষ কারণ হচ্ছে, বিদ্যমান কর নীতিতে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে কর রেয়াত সুবিধা পাওয়া। এসব কারণে বিনিয়োগকারীরা ব্যাংক ও পুঁজিবাজার ছেড়ে সঞ্চয়পত্রমুখী হচ্ছেন।

সঞ্চয়পত্রের বিক্রি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার ফলে, জুলাই থেকে নভেম্বর এ ৫ মাসে সরকারকে সুদ হিসেবে পরিশোধ করতে হয়েছে ৮ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে ব্যয় ছিল ৪ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা। ফলে সুদ পরিশোধ বাবদ ব্যয় বেড়েছে ৯২ শতাংশ। অথচ সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনার মূলনীতি হচ্ছে ঋণ ব্যয় (সুদ) এবং ঝুঁকি সব সময় সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা। কিন্তু সঞ্চয়পত্রের অস্বাভাবিক এ বিক্রির কারণে সুদ ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। যা ঋণ ব্যবস্থাপনার মূলনীতিকে আঘাত করছে। এতে ঋণ ব্যবস্থাপনাও চাপের মুখে পড়েছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক এমকে মুজেরী যুগান্তরকে বলেন, অস্বাভাবিক হারে সঞ্চয়পত্র বিক্রি বৃদ্ধিতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়বে। স্বল্পকালীন প্রভাব হচ্ছে, সুদের হার বেশি থাকায় ব্যাংকের আমানতকারীরা সঞ্চয়পত্রমুখী হবেন। এতে ব্যাংকগুলো আমানত কমে ঋণ প্রদানের ক্ষমতা হারাবে। এর বিরূপ প্রভাব পড়বে বেসরকারি খাতের ওপর। আর দীর্ঘকালীন প্রভাব হচ্ছে, সরকার বেশি সুদে সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে ঋণ নিচ্ছে। এতে সুদের খরচ বেড়ে ঋণভার বাড়বে। যাতে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, সরকার সঞ্চয়পত্রের সুদ হার সবচেয়ে বেশি নির্ধারণ করেছে। মূলত সমাজের পেনশন হোল্ডার, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্রবীণ জনগোষ্ঠীকে সুবিধা দেয়ার লক্ষ্যে সর্বোচ্চ সুদ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু এ সুবিধা আদৌ প্রকৃত জনগোষ্ঠী পাচ্ছে কিনা তা শনাক্ত করতে হবে। কারণ এ খাতে কর্পোরেট বিনিয়োগ বেড়ে গেছে, যা সরকারের কাম্য নয়।

এদিকে সামষ্টিক অর্থনীতি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা খাতে অস্বাভাবিক হারে সঞ্চয়পত্র বিক্রির প্রভাব খতিয়ে দেখতে সম্প্রতি একটি কমিটি গঠন করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। অর্থ বিভাগের ট্রেজারি ও ঋণ ব্যবস্থাপনার অতিরিক্ত সচিব এখালাছুর রহমানকে প্রধান করে গঠিত এ কমিটি ঋণ ব্যবস্থাপনার ওপর সঞ্চয়পত্রের প্রভাব এবং উত্তরণের উপায় নিরূপণ করে সরকারের কাছে রিপোর্ট পেশ করবে।

জানতে চাইলে কমিটির প্রধান এখালাছুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, প্রাথমিকভাবে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারীদের শনাক্ত করতে একটি ডাটাবেজ তৈরি হবে। ইতিমধ্যে এ ব্যাপারে জাতীয় সঞ্চয়পত্র অধিদফতরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এটি সম্পন্ন হলে অনেক সংস্কার সম্পন্ন করা যাবে। কারণ এ ডাটাবেজের মাধ্যমে বিনিয়োগকারী শ্রেণী চিহ্নিত করা হবে। অনেকে বেনামে একাধিক বিনিয়োগ করছেন তাও ধরা পড়বে। পাশাপাশি অপ্রদর্শিত আয় এবং বড় কর্পোরেট বিনিয়োগকারীদের শনাক্ত করা হবে।

কমিটি ইতিমধ্যে একটি খসড়া ধারণাপত্র তৈরি করেছে, সেখানে সঞ্চয়পত্রের ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নে সমন্বিতভাবে সংস্কারের সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি ওয়েবভিত্তিক ডাটাবেজ প্রস্তুত করার কথা বলা হয়। সঞ্চয়পত্রের সব ধরনের তথ্য এ ডাটাবেজে সংরক্ষণ করা হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ডাটাবেজ তৈরির জন্য ইতিমধ্যে অনুমতি দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এটি সম্পন্ন হলে জানা যাবে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারী ব্যক্তি শ্রেণী, কর্পোরেট ও প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter