মাসিক মিটার ভাড়ার ফাঁদে খুলনার বিদ্যুৎ গ্রাহকরা

  নূর ইসলাম রকি, খুলনা ব্যুরো ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

খুলনা নগরীতে বিদ্যুৎ গ্রাহকরা প্রি-পেইড মিটার ভাড়ার ফাঁদে পড়েছেন। মাসে তাদের দিতে হচ্ছে প্রায় ২৫-৩০ লাখ টাকা। পাশাপাশি প্রি-পেইড মিটারে টাকা পুরতে হয়রানির শিকার হচ্ছেন গ্রাহকরা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এনালগ মিটার থেকে ডিজিটাল মিটার ব্যবহার করার সময় গ্রাহকদের কাছ থেকে ডিমান্ড চার্জ ও ভ্যাট নেয়া হলেও মাসিক ভাড়া নেয়া হয়নি। সম্প্রতি নগরীতে প্রি-পেইড মিটার গ্রাহকদের কাছ থেকে মাসিক ৪০-২৫০ টাকা হারে নেয়া হচ্ছে। সেই হিসাবে নগরীর ৬৩ হাজার প্রি-পেইড মিটার থেকে ভাড়া বাবদ গ্রাহকদের পকেট থেকে নেয়া হচ্ছে ২৫-৩০ লাখ টাকা। এ ভাড়া দেয়ার নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। যা মধ্যবিত্ত ও নিুবিত্ত পরিবারের জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জানা গেছে, নগরীতে মিটার গ্রাহক রয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার। ২০১৪ সালের জুলাই মাসে ‘প্রি-পেমেন্ট মিটারিং প্রজেক্ট ফর খুলনা সিটি’ নামক প্রকল্পের মাধ্যমে নগরীর এনালগ ও ডিজিটাল মিটার গ্রাহকদের প্রি-পেইড মিটার প্রতিস্থাপনের জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়। বিনা টাকায় প্রতিস্থাপন এবং কোনো ধরনের মাসিক ভাড়া ছাড়াই ব্যয়বহুল আধুনিক ডিজিটাল মিটারের মাধ্যমে এ সেবা দেয়া হবে। এমন তথ্য জানিয়েছিল ২১ জেলার বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ওজোপাডিকো) কর্তৃপক্ষ। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে ৬৩ হাজার প্রি-পেইড মিটার প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে কাজ শুরু হয়। প্রি-পেইড মিটার প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে মিটার সংযোগে ত্রুটি, মাসিক ভাড়া গ্রাহকের ওপর চাপিয়ে দেয়া, মিটারের রিচার্জে হয়রানিসহ বিভিন্ন সমস্যা উঠে এসেছে দুই মাসে। তবে সব থেকে বেশি হয়রানি হচ্ছে মাসিক ভাড়া নিয়ে।

খালিশপুরের একটি মিলের নারী শ্রমিক জয়নাব বেগম সকালে মিলে যান। তার তিনটি মেয়েও স্কুলে। সারা দিন বাড়িতে তেমন কেউ থাকে না। গরমের দিন রাতে দুটি ফ্যান ও তিনটি এনার্জি সেভার লাইট জ্বলে। সব মিলিয়ে মাসে ৫০০-৬০০ টাকা বিদ্যুৎ খরচ হয়। কিন্তু ৫০০ টাকার প্রি-পেইড মিটারের জন্য তার ভাড়া গুনতে হয় মাসে ৪০ টাকা, ডিমান্ড চার্জ ২৫ টাকা এবং ভ্যাট ২৩ টাকা। অর্থাৎ ৮৮ টাকা তার প্রতি মাসে বাড়তি খরচ হচ্ছে। তার দাবি মাসে ৪০ টাকা ভাড়া দেয়ার কথা প্রথমে বলা হয়নি। তাহলে কেন এখন নেয়া হচ্ছে। আর কতদিন দিতে হবে তার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই।

বিধবা ৬২ বছরের মরিয়ম বেগম স্বামীর রেখে যাওয়া ২ লাখ টাকা ভেঙে সংসার চালাচ্ছেন। তার অভিযোগ, প্রতি মাসে মিটারের ভাড়া বাবদ ৪০ টাকা দেয়া তার জন্য অনেক কষ্টকর। তাছাড়া মিটারে রিচার্জের জন্য পাসওয়ার্ড চেপে রিচার্জ করতে অন্যের হাত-পা ধরতে হয়। তাই সরকারের উচিত মিটারের মাসিক ভাড়া বন্ধ করে দেয়া এবং রিচার্জ আরও সহজতর করা।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের (ঠিকাদারি) সঙ্গে মিটার প্রতিস্থাপন কাজের চুক্তি করে ওজোপাডিকো। সেই হিসেবে কয়েকটি টিম নগরীর বিভিন্ন গ্রাহকের কাছে বিনা মূল্যে মিটার প্রতিস্থাপন করার কথা বললেও প্রতিস্থাপনের পর তাদের খুশি করতে হয়। নাসরিন বেগম নামে এক গ্রাহক এ প্রতিবেদককে জানান, মিটারপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা দিয়ে খুশি করতে হয় প্রতিস্থাপনকারী টিমকে। এর মধ্যে টিম লিডারকে অতিরিক্ত খুশিও করতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রি-পেইড মিটার প্রতিস্থাপন করার পর সেই মিটার কানেকশনে জটিলতার অভিযোগ মিলেছে। দৌলতপুর নিবাসী সাইয়া জ্যোতি জানান, মিটারে পর্যাপ্ত টাকা থাকার পরও বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ হয়ে যায়। আশপাশে বিদ্যুৎ থাকলেও তার মিটারের সংযোগ নেই। তিনি এ বিষয়ে কাছের বিদ্যুৎ অফিসে যোগাযোগ করলে অফিস থেকে জানানো হয়, বৈদ্যুতিক পিলার থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। তৎক্ষণাৎ বৈদ্যুতিক পিলার চেক করলে কোনো সমস্যা পাওয়া যায়নি। আধা ঘণ্টা পর নিজ থেকে মিটারের সংযোগ ঠিক হয়ে যায়। এমন ঘটনা তার বাড়িতে সম্প্রতি ২-৩ বার হয়েছে।

২০১৪ সাল থেকে নগরীতে প্রি-পেইড মিটার প্রতিস্থাপন শুরু হলেও গ্রাহকদের কাছ থেকে মাসিক ভাড়া নেয়া শুরু হয়েছে প্রকল্পের শেষ বছরে। অর্থাৎ ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে। গ্রাহকদের অভিযোগ, যদি শুরুতেই বলা হতো প্রতি মাসে গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রি-পেইড মিটার বাবদ মাসিক ভাড়া নেয়া হবে তা হলে অনেকেই হয়তো রাজি হতো না। সিঙ্গেল ফেজের গ্রাহকদের জন্য মাসে ৪০ টাকা এবং থ্রি ফেজের গ্রাহকদের জন্য মাসে ২৫০ টাকা প্রি-পেইড মিটারে রিচার্জ করার সঙ্গে সঙ্গে কেটে নেয়া হয়।

আবাসিক এলাকায় কিলোওয়াটপ্রতি সর্বোচ্চ ২৫ টাকা, ক্ষুদ্র শিল্প এলাকায় ১৫-২৫ টাকা এবং বাণিজ্যিক ও অফিস এলাকায় ৩০ টাকা ডিমান্ড চার্জ প্রি-পেইড মিটারে রিচার্জ করার সময় কেটে নেয়া হয়। এ ছাড়া ৫ ভাগ ভ্যাট দিতে হয় গ্রাহকদের। এই দুটিতে গ্রাহকরা অভ্যস্ত থাকলেও অনাকাক্সিক্ষত মাসিক ভাড়ায় বিরক্ত হয়ে উঠেছেন গ্রাহকরা।

প্রি-পেইড মিটারে রিচার্জ করতে হয় সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ অফিস অথবা নির্দিষ্ট ব্যাংক থেকে। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে এবং প্রি-পেইড মিটারের ডকুমেন্ট নিয়ে রিচার্জ করতে হয়। নির্দিষ্ট টাকা রিচার্জ করার পর ওজোপাডিকোর ২০-২০০ ডিজিটের গোপন পাসওয়ার্ড দেয়। যা পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট প্রি-পেইড মিটারে রিচার্জের জন্য পাসওয়ার্ড চেপে রিচার্জ করতে হয়। যা বৃদ্ধ, মহিলা ও দিনমজুরদের জন্য খুব হয়রানিমূলক। কারণ বৃদ্ধ মানুষ এই ডিজিট চেপে মিটারে রিচার্জ করতে সহজে পারেন না।

‘প্রি-পেমেন্ট মিটারিং প্রজেক্ট ফর খুলনা সিটি’র প্রজেক্ট ডিরেক্টর ইঞ্জিনিয়ার মো. তোফাজ্জেল হোসেন যুগান্তরকে বলেন, সব অভিযোগ সত্য নয়। মিটারে রিচার্জে হয়রানির বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি। খুব দ্রুত মোবাইল অ্যাপ এবং মোবাইলের নিজস্ব ব্যালেন্স থেকে ডিজিটাল মিটারে টাকা পরিশোধ করার বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ ছাড়া ২০১৭ সালের সরকারি এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে গ্রাহকের কাছ থেকে মাসিক ভাড়া নেয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ভবিষ্যতে ভাড়া নেয়া হবে কিনা সেটা সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।

pran
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
bestelectronics

 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter