চলছে কবিতার জয়রথ

  হক ফারুক আহমেদ ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কবিতা লেখেননি এমন বাঙালি মেলা ভার। অনেক লেখক বলেন, আমাদের এ অঞ্চলের মানুষের মূল ভাষাটাই হচ্ছে ‘কাব্যের’। ক্ষোভ, প্রতিবাদ, আনন্দ, বেদনা, ভালোবাসা সবকিছুর প্রকাশেই আমরা কবিতার কাছে যাই। কবিতা লিখি, কবিতা পড়ি। তাই কবিতা ভাব প্রকাশের উর্বর ক্ষেত্র হিসেবে প্রসারিত হয়েছে। আর এ কারণেই বইমেলায় সবচেয়ে বেশি প্রকাশিত হয় কবিতার বই। প্রতি বছর প্রতিষ্ঠিত কবিদের পাশাপাশি প্রচুর তরুণ কবিদের বই প্রকাশ হয়। এবারের বইমেলাও তার ব্যতিক্রম নয়। বাংলা একাডেমির জনসংযোগ ও সমন্বয় উপবিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, শনিবার মেলার ১০তম দিন পর্যন্ত কবিতার বই এসেছে ৩৭৩টি। যেকেনো ধরনের বইয়ের তুলনায় কবিতার বইয়ের সংখ্যা এবারও অনেক বেশি। এ বইগুলোর মধ্যে তরুণ কবিদের বইয়ের সংখ্যাই বেশি। কবিতার বই প্রকাশের এ সংখ্যা মেলার শেষ দিকে গিয়ে হাজার ছাড়িয়ে যাবে। এত কবিতার বই প্রকাশ নিয়ে আলোচনা যেমন আছে তেমনি রয়েছে কিছু সমালোচনাও। কিন্তু দেশের অগ্রগণ্য কবিরা এ পুরো বিষয়টাকেই দেখেন ইতিবাচক হিসেবে।

এত কবিতার বইয়ের প্রকাশ নিয়ে জানতে চাইলে দেশের শীর্ষস্থানীয় কবি নির্মলেন্দু গুণ যুগান্তরকে বলেন, “আমাদের সাহিত্যের প্রধান ভাষাই হল ‘পদ্য’। বাঙালির ইতিহাস ও আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কবিতা। এ দেশের মানুষ যেকেনো কিছুর প্রকাশে কবিতা লিখবে এটাই স্বাভাবিক। শুধু আবেগের প্রকাশ নয় সব অশুভ কিছুর বিরুদ্ধেও কথা বলেছে কবিতা। দেশের এত মানুষ যে কবিতার চর্চা করেন এটা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়। কিন্তু যারা এটাকে বিদ্রূপের জায়গায় পরিণত করতে চান আমি বলি তারা ‘অপশক্তির অপপ্রচার’ করছেন।’’

নির্মলেন্দু গুণ আরও বলেন, ‘সব দেশেই ছোট কবি বড় কবি আছেন। বড় কবি সর্বকালে হয় না। একজন নতুন বা তরুণ কবি কিছুটা দুর্বল কবিতা লিখবেন এটাই স্বাভাবিক। তাই বলে তাকে নিরুৎসাহিত করা যাবে না। বরং তাকে স্বাগত জানাতে হবে। তারপর সতর্ক করে ভাষাটা আরও সমৃদ্ধ করা আরও সাবলীলভাবে লেখার কথা বলতে হবে। পাশাপাশি তরুণ কবিদের আরও বেশি প্রচার দরকার। এ দায়িত্বটি মিডিয়ার।’

কবি আসাদ চৌধুরী বলেন, ‘ইউরোপ, আমেরিকার মিথ, জাপান ও চীনের হাইকু- ইত্যাদির ব্যবহার করছেন তরুণ কবিরা। তারা আমাদের সাহিত্যের পুনর্গঠনে ভাষার উৎস সন্ধান করে চলেছেন। সময়ের সঠিক ধ্বনি তারা ধরতে পেরেছেন, যা তাদের কবিতায়ও প্রতিফলিত হতে দেখি।’

কবিতার বই ও তরুণ কবিদের বইয়ের প্রকাশ নিয়ে অনন্যার স্বত্বাধিকারী মনিরুল হক বলেন, ‘আমাদের দায়িত্ব তরুণ কবিদের কাজগুলো সবার সামনের তুলে ধরা। কারণ সেটা না করলে তরুণ কবিদের সৃষ্টিকর্মগুলো মানুষ কিভাবে জানবে। আমাদের প্রতিষ্ঠান সে দায়িত্ববোধ থেকে প্রতি বছর প্রচুর কবিতার বই প্রকাশ করে।’

এ বছর মেলায় এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত এবং তরুণ কবিদের বেশকিছু বই প্রকাশ হয়েছে। প্রায় তিন বছর পর মেলায় এসেছে কবি নির্মলেন্দু গুণের কবিতার নতুন বই ‘একটি সন্তানসম্ভবা পাখির গল্প’, কাকলী থেকে এসেছে লেখকের ‘রচনাবলী পঞ্চম খণ্ড’, অন্যপ্রকাশ থেকে এসেছে সৈয়দ শামসুল হকের নতুন কাব্যগ্রন্থ ‘উৎকট তন্দ্রার নিচে’, চারুলিপি প্রকাশ করেছে সৈয়দ শামসুল হকের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’, অনন্যা থেকে এসেছে মহাদেব সাহার ‘অনন্তের বাঁশি’, ইত্যদি গ্রন্থ প্রকাশ থেকে এসেছে মোহম্মদ রফিকের ‘কবিতাসমগ্র’, অন্বেষা প্রকাশন থেকে এসেছে রফিক আজাদের ‘প্রেম ও প্রকৃতির কবিতা’। পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স থেকে এসেছে পিয়াস মজিদের ‘নাচ, মারবেল ও গোধূলি’, ঐতিহ্য থেকে এসেছে একই কবির ‘ছোটকবিতা’, ঐতিহ্য থেকে এসেছে জুননু রাইনের ‘এয়া’, আগামী থেকে এসেছে কাজল শাহনেওয়াজের ‘কবিতাসমগ্র’, অনিন্দ্য প্রকাশ থেকে এসেছে কামরুল হাসানের ‘ছেলেটা বৃক্ষ হতে চেয়েছিল’, অন্যপ্রকাশ থেকে এসেছে মারুফুল ইসলামের ‘নতুন করে পাব বলে’, মূর্ধন্য থেকে এসেছে তাহসিনা অ্যানির ‘ব্যস্ত পিঁপড়ার মতো ব্যস্ততা’, বলাকা প্রকাশনী থেকে এসেছে মারজু মুনের ‘স্পর্শের আড়ালে তুমি’, অন্যধারা থেকে এসেছে ফারহানা হোসেনের ‘নিষুপ্ত নিষাদ’, বটেশ্বর বর্ণন থেকে এসেছে হাসান মোস্তফার ‘সুবর্ণগায়ে যাবো’, অন্যপ্রকাশ থেকে দিলরুবা শাহাদৎ-এর ‘বসন্ত স্বপ্নের আলোছায়ায়’, একই প্রকাশনী থেকে ইসমত সুলতানার ‘আমি চিত্রাঙ্গদা’, তাম্রলিপি থেকে আশরাফুল আলমের ‘স্বপ্নচূড়া’, র‌্যামন পাবলিশার্স থেকে অংশুমানের ‘মাটির মৃত মগজ’ ইত্যাদি।

শনিবার ছুটির দিনে মেলার দ্বার খুলে যায় সকাল ১১টায়। রাত ৯টা পর্যন্ত চলে মেলা। দুপুর ১টা পর্যন্ত মেলায় ছিল শিশু প্রহর। বিকালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রাঙ্গণে অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত তাবারক হোসেনের উপন্যাস ‘একরাত্রি’র মোড়ক উন্মোচন করেন কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি ও অন্যপ্রকাশের প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলাম, সাবেক সভাপতি ও আগামীর স্বত্বাধিকারী ওসমান গণি ও সমিতির নির্বাহী পরিচালক কামরুল হাসান শায়খ। মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান হয় মোহম্মদ আলী খান রচিত উপন্যাসের বই ‘মৌমিতা’র। বইটি প্রকাশ করেছে মুক্তচিন্তা।

নতুন বই : বাংলা একাডেমির তথ্যকেন্দ্র জানিয়েছে, শনিবার মেলার দশম দিনে নতুন ২২৫টি বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে অন্যপ্রকাশ থেকে এসেছে সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যগ্রন্থ ‘উৎকট তন্দ্রার নিচে’, প্রথমা থেকে আনিসুল হকের উপন্যাস ‘আলো-আঁধারের যাত্রী’, ঐতিহ্য থেকে সুব্রত কুমার দাসের ‘শ্রীচৈতন্যদেব’, মহাকাল পাবলিকেশন্স থেকে জি এম রুহুল আমিনের কাব্যগ্রন্থ ‘শেষ অধ্যায়’, সময় প্রকাশন থেকে দন্তস্য রওশনের ‘উড়ে গেল গাছটা’, ফরিদ আহমেদের ‘হুমায়ূন আহমেদের উত্তরাধিকারী নির্ধারণ’, শ্রাবণ থেকে তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরীর ‘চ্যারিয়ট অব লাইফ’, বিদ্যা প্রকাশ থেকে মোহিত কামালের ‘বাংলাদেশের তরুণদের ৩০ গল্প’, কথাপ্রকাশ থেকে সুমন্ত আসলামের ‘অদৃশ্য আতংক’ ও ইকবাল খন্দকারের ‘রহস্যময় গুহা’, ঐতিহ্য থেকে জাভেদ হোসেনের ‘মীর তকি মীর গজল থেকে’ ও জীবনানন্দ দাশের ‘কল্যাণী’, অনিন্দ্যপ্রকাশ থেকে মোশতাক আহমেদের ‘ছায়াস্বর্গ’, বাংলা একাডেমি থেকে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ‘শওকত ওসমান জন্মশতবর্ষ স্মারক গ্রন্থ’, অনন্যা থেকে মুনতাসীর মামুনের ‘উনিশ শতকে বাংলা সংবাদ সাময়িকপত্র’ ও ফরিদুর রেজা সাগরের ‘সিঙ্গাপুরের ডালপুরী ও ছয় ফিলিপ’।

মূলমঞ্চের আয়োজন : অমর একুশে উদ্যাপনের অংশ হিসেবে শনিবার সকালে অনুষ্ঠিত হয়েছে শিশু-কিশোর সঙ্গীত প্রতিযোগিতা। এতে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কণ্ঠশিল্পী সুবীর নন্দী। উপস্থিত ছিলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। বিচারক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চন্দনা মজুমদার, ইয়াকুব আলী খান ও সাগরিকা জামালী। এরপর অনুষ্ঠিত হয় শিশু-কিশোর সাধারণ জ্ঞান ও উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতা। এতে বিচারক ছিলেন অধ্যাপক আন্্জুমান আরা, অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সেলিম ও মোবারক হোসেন। গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘রবি গুহ ॥ মুনীর চৌধুরী ॥ সরদার ফজলুল করিম’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে সভাপতিত্ব করেন ছায়ানট সভাপতি সনজীদা খাতুন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মফিদুল হক ও এম এম আকাশ। আলোচনায় অংশ নেন বেগম আকতার কামাল, অজয় দাশগুপ্ত, পিয়াস মজিদ ও রবি গুহের মেয়ে অলকানন্দা গুহ। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করেন শিল্পী সাইদুর রহমান বয়াতি, শফি মণ্ডল, রনজিত দাস বাউল, পাগলা বাবলু ও আনোয়ার হোসেন।

pran
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
bestelectronics

mans-world

 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.