রাফির ভাই রায়হানের আবেগঘন লেখা

আপুকে হারিয়ে সব উৎসব আজ অশ্রুজলে বিবর্ণ

  যুগান্তর ডেস্ক    ২০ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আপুকে হারিয়ে সব উৎসব আজ অশ্রুজলে বিবর্ণ
নুসরাত। ফাইল ছবি

মানুষরূপী হায়েনাদের নৃশংসতায় পৃথিবী ছেড়েছেন ফেনীর ফুলগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি। বোনকে কিছুতেই ভুলতে পারছে না একই মাদ্রাসার ছাত্র ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হান। মৃত্যুর পর রায়হান তার ডায়েরিতে বোনকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছে। আবেগঘন এ লেখাটি রায়হান তার ফেসবুক পেজেও পোস্ট করেছে। যুগান্তরের পাঠকদের জন্য লেখাটি হুবহু তুলে ধরা হল-

আবার এসেছিল বৈশাখ, পাড়া-প্রতিবেশীর ঘরে ঘরে দেখছি আনন্দের বন্যা। আর আমাদের ছোট্টঘর নিকষ অন্ধকারে আচ্ছন্ন। অথচ গত বছরের এ সময় আমাদের সংসারে কতই না আনন্দ ছিল। আজ আপুমণিকে হারিয়ে সব উৎসব অশ্রুজলে বিবর্ণ হয়ে গেছে। ঘাতকের আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে গেল আমাদের সোনালি সংসার। কখনও ভাবিনি আমাদের সমাজে মানুষের পোশাকধারী কিছু অসভ্য জন্তু-জানোয়ার বসবাস করে।

যদি আগে জানতে পারতাম তাহলে কলিজার টুকরা আপুকে কখনও ঘর থেকে বের হতে দিতাম না। মানুষ কতটা নির্দয়-নির্মম হলে একজন মানুষকে পুড়িয়ে মারতে পারে! কী অপরাধ ছিল আমার আপুর?

একজন লম্পটের যৌন নিপীড়ন রুখে দিতে প্রতিবাদী হয়েছিল আপু। সেই প্রতিবাদের মৃত্য হয়েছে ১০৮ ঘণ্টা বার্ন ইউনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের মাধ্যমে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। বাবা-মায়ের পর শিক্ষকরাই আমাদের বড় অভিভাবক।

আর সেই অভিভাবক যখন একজন ছাত্রীর শ্লীলতাহানির চেষ্টা করে, তখন মনে হয় এ সমাজ আর ভালো নেই। আবার লম্পটকে বাঁচানোর জন্য তার পক্ষ নিয়েছিল কিছু রাজনীতিবিদ ও মানুষরূপী লম্পট। লম্পটের বিচার চাইতে গিয়েছিলাম ওসি সাহেবের কাছে। তিনি আমার আপুকে নিরাপত্তা না দিয়ে মানসিক নির্যাতন করে ভিডিও করলেন। ওসি সাহেব যদি সচেতন হয়ে বিষয়টি তদন্ত করতেন কিংবা আপুর নিরাপত্তা জোরদার করতেন, তাহলে তাকে পরপারে পাড়ি দিতে হতো না।

মনে পড়ছে আপুমণির আইসিইউতে বলা শেষ কথাগুলো- ‘রায়হান, আম্মা-আব্বার দিকে খেয়াল রাখিস। আমাকে নিয়ে চিন্তা করতে বারণ করিস। আমাকে যারা পুড়িয়ে দিল তাদের যেন সঠিক বিচার হয়। না হলে আমি মরেও শান্তি পাব না।’ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমার আপুর চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। লম্পটদের গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছিলেন। আপুকে দেশের বাইরে পাঠানোর জন্য ডাক্তারদের নির্দেশ দিয়েছিলেন।

ডাক্তাররা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও আপুকে বাঁচাতে পারেননি। আমাদের পরিবারকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ডেকে একজন মমতাময়ী মায়ের পরিচয় দিয়েছেন। আমরা তার কাছে বলেছি, আমার আপুর হত্যাকারীদের যেন দ্রুতবিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়া হয়। তিনি আমাদের নিশ্চিত করেছেন, বিচারে কোনো দুর্বলতা রাখা হবে না। আসামিদের রেহাই দেয়া হবে না বলে তিনি জানিয়েছেন। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিচার-প্রশাসনের প্রতি আস্থা রেখে বলতে চাই, এসব জানোয়ারদের কঠিন শাস্তি দেয়া প্রয়োজন। ভবিষ্যতে যেন কোনো ভাইয়ের বুক থেকে তার বোনকে কেড়ে নিতে না পারে।

প্রতিদিন সন্ধ্যায় যখন বাড়ি ফিরে দেখি আপুর রুমটা খালি পড়ে আছে। যেই টেবিলে বসে আপু পড়ালেখা করত সেখানে বই-খাতাগুলো ঠিকই আছে। আছে আপুর ব্যবহৃত জিনিসপত্রগুলো। নেই শুধু আমার কলিজার টুকরা আপুটি। বিশ্বাস করুণ, একবুক চাপা কষ্ট-বেদনায় আমার ছোট্ট হৃদয়টি দুমড়েমুচড়ে যায়। প্রতিটি মুহূর্তে মনে পড়ে যায় আপুর কথা। ঘুমের ঘোরে জেগে উঠি আপুর শেষ দিনগুলোর নির্মম কষ্টের কথা স্বপ্নে দেখে। শেষ রাতে চোখে এক ফোঁটা ঘুম আসে না আপুর কথা ভেবে।

আমাদের পরিবারের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক ছিল আপু। পরিবারের প্রতিটি সদস্যের সঙ্গে তার ছিল আন্তরিকতাপূর্ণ ভালোবাসার সম্পর্ক। শান্ত মেজাজের অধিকারী হওয়ায় পরিবারের সব সমস্যা অত্যন্ত ধীরচিত্তে সমাধান করত। আমাদের সঙ্গে দূরের কথা, পাড়া-প্রতিবেশীর কারও সঙ্গে কোনো দিন ঝগড়া-বিবাদে নিজেকে জড়ায়নি। আব্বুর অনেক আস্থাভাজন হওয়ার কারণে, আব্বু কোনো দিন তার প্রিয় সন্তানের কোনো চাহিদা অপূর্ণ রাখেননি। প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর তার কোরআন তেলাওয়াতের মধুর সুর এখনও আমার কানে বাজে।

বাড়ির সব কাজে আম্মুকে সহযোগিতা করত। আম্মু আমাদের নিয়ে টেনশন করলে আপু অভয় দিয়ে বলত- আমরা এমন কোনো কাজ করব না, যাতে আপনাদের সম্মানহানি হয়। বরং আমরা তিন ভাইবোন পড়ালেখা করে মানুষের মতো মানুষ হয়ে সমাজে আপনাদের মুখ উজ্জ্বল করব। সেই উজ্জ্বলতার প্রতিচ্ছবি ছিল আমাদের সংসার। আপুর মতো ক্ষণজন্মা বোন আমাদের ছোট ঘরকে সব সময় আলোকিত করে রাখত; যা আজ নিভে গিয়ে একমুঠো ছায়ায় পরিণত হয়েছে।

আজ সারা দেশে এমনকি দেশের বাইরেও আমার আপুর হত্যাকাণ্ড নিয়ে মানুষ যেভাবে প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছে, তাতে আমার মনে পড়ে যাচ্ছে কবির বলে যাওয়া কথা...

‘এমন জীবন করিবে গঠন

মরণে হাসিবে তুমি

কাঁদিবে ভুবন’

আল্লাহর কাছে একটাই চাওয়া- আমার আপুকে যেন তিনি জান্নাতুল ফেরদাউস দান করেন। আর খুনিদের দুনিয়া ও আখেরাতে কঠোর শাস্তি প্রদান করেন। (আমিন)

রায়হানের ফেসবুক আইডি হ্যাকড : সোনাগাজী (ফেনী) প্রতিনিধি জানান, নুসরাত জাহান রাফির ভাই রাশেদুল হাসান রায়হানের ফেসবুক আইডি হ্যাকড করেছে অজ্ঞাত হ্যাকাররা। শুক্রবার দুপুর ২টা থেকে পেজটি আর খুলতে পারছে না সে। রাফিকে নিয়ে একটি আবেগঘন লেখা রায়হান তার ফেসবুক পেজে দেয়ার পরই এটি হ্যাক করা হয়। লেখাটি পোস্ট করার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়ে।

ঘটনাপ্রবাহ : পরীক্ষা কেন্দ্রে ছাত্রীর গায়ে আগুন

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×