রাজধানীর সাত সরকারি কলেজ

রাষ্ট্রবিজ্ঞান-দর্শনের শিক্ষকরা পড়াচ্ছেন ইতিহাস

  মুসতাক আহমদ ২১ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

তিতুমীর,

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজের স্নাতক পর্যায়ের সব বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে ‘স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস’ কোর্স। এ বিষয়ে পড়ানোর কথা ইতিহাসের শিক্ষকদের। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত রাজধানীর সাত সরকারি কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, দর্শন, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ের শিক্ষকরাও কোর্সটি পড়াচ্ছেন। কেবল ক্লাস নেয়াই নয়, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি ও উত্তরপত্রও মূল্যায়ন করছেন বিষয়বহির্ভূত শিক্ষকরা। এ নিয়ে কলেজগুলোয় এক ধরনের ঘোলাটে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ক্ষোভ দেখা দিয়েছে ইতিহাসের শিক্ষকদের মধ্যে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্য বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে পড়ানোর এ সুযোগ তৈরি করে দেয়া হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জারি করা এক নির্দেশনায়। যদিও তাতে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষকদের দিয়ে ওই কোর্সটি পড়ানোর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কোনো কোনো কলেজ দর্শনসহ অন্য বিষয়ের শিক্ষকদেরও এ বিষয়টি পড়ানোর জন্য নিয়োগ করেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত রাজধানীর ওই সাতটি কলেজ হচ্ছে- সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, বেগম বদরুননেসা কলেজ, সরকারি বাঙ্?লা কলেজ, কবি নজরুল কলেজ ও সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ।

জানা গেছে, এসব কলেজের প্রত্যেকটিতে ১৫ থেকে ১৮টি বিষয়ে স্নাতক পাঠদান করা হয়। এ কারণে প্রত্যেকটি বিভাগেই গড়ে দুই থেকে আড়াইশ’ শিক্ষার্থী রয়েছেন। কোনো কোনো কলেজ ইতিহাসের নিজ বিভাগের পাঠদানের ব্যস্ততা, সময়ের ঘাটতি ও শিক্ষক সংকটের দোহাই দিয়ে অন্য বিভাগের শিক্ষক দিয়ে পড়ানোর ব্যবস্থা করেছে। এর মধ্যে দু-একটি প্রতিষ্ঠান আবার কলেজের বাইরে থেকে খণ্ডকালীন শিক্ষকও নিয়োগ করেছে। এমন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঢাকা কলেজ একটি। জানা গেছে, ওই কলেজে সাভারের একটি বেসরকারি কলেজের দর্শন বিষয়ের এক শিক্ষক ‘স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস’ কোর্সটি পড়াচ্ছেন। ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন মোল্লা বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

তিনি বলেন, আমাদের কলেজে ১৮টি বিভাগ আছে। কিন্তু ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক আছেন মাত্র ১১ জন। তাদের অনার্স, মাস্টার্স, ডিগ্রি ও উচ্চ মাধ্যমিকের ক্লাস নিতে হয়। এরপর বাকি ১৭টি বিভাগে পাঠদান করানো কঠিন। যে কারণে খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ করতে হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ইতিহাসের এ বিষয়টি আমরা সবাই কমবেশি জানি। তাই পাঠদান করা সমস্যা নয়।

তবে শিক্ষকরা বলছেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের মতো এ বিষয়টি গ্রাজুয়েটদের জাতীয় চেতনাসমৃদ্ধ করার জন্যই প্রবর্তন করা হয়েছে। কিন্তু অন্য বিষয়ের শিক্ষকরা পাঠদান করলে এর মূল আবেদনে ব্যত্যয় ঘটবে। দৃষ্টান্ত দিয়ে ঢাকা কলেজের ইতিহাসের সহযোগী অধ্যাপক ড. আবদুল কুদ্দুস সিকদার বলেন, এই কোর্সটি একটি স্পর্শকাতর ও বিশেষ গুরুত্বের বিষয়। কেননা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ভারত দেখে তাদের সঙ্গে পাকিস্তানের যুদ্ধ হিসেবে। আবার পাকিস্তান দেখে ভিন্ন দৃষ্টিতে। কিন্তু এটা বাঙালির ২২ বছরের সংগ্রামের পরিণতি এবং ৭ কোটি মানুষের স্বাধিকার ও মুক্তির যুদ্ধ। এই ইতিহাসটি ঐতিহাসিকের দৃষ্টিকোণ থেকে না পড়ালে মর্মার্থ শিক্ষার্থীর কাছে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে আর দর্শনের শিক্ষক দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে পড়াবেন। সেই বিবেচনায় ইতিহাস বিভাগের শিক্ষকরা পড়ালেই সঠিক হবে বলে আমরা মনে করি। তাছাড়া ইতিহাসের শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ফসল হিসেবে এ কোর্সটি চালু করা হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোর একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আবশ্যিক হওয়ায় এ বিষয়ের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী আছে। এসব শিক্ষার্থীর প্রশ্নপত্র তৈরি, মডারেশন ও খাতা দেখার কাজের সঙ্গে আর্থিক লাভের বিষয় জড়িত। এ কারণে পাঠদানের ইস্যুতে এই টানাপোড়েন। অথচ প্রায় সব বিভাগের শিক্ষকই নিজ নিজ গ্রাজুয়েটদের ঠিকমতো ক্লাস নেন না। অনেকেই নোটিশ দিয়ে বা বিনা নোটিশে ক্লাস কামাই দেন। সুতরাং আপত্তির ক্ষেত্রে পাঠদানের চেয়ে এখানে নেপথ্যে অন্য বিষয় আছে। যদিও ইতিহাসের কয়েক শিক্ষক এমন ধারণার সঙ্গে একমত নন। তারা বলেন, বিষয় প্রবর্তনের আবেগ সমুন্নত রাখাই তাদের লক্ষ্য।

সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন কলেজের শিক্ষকরা এ সমস্যার কথা তুলে ধরেন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অ্যাপেক্সবডি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নানের কাছে। এ সময় তারা ওপরে উল্লিখিত যুক্তি তুলে ধরার পাশাপাশি আরও জানান, রাজধানীর সাতটি কলেজে ইতিহাস বিষয়ের প্রায় অর্ধশত শিক্ষক কর্মরত আছেন। তারা পাঠদানের জন্য যথেষ্ট। তারপরও যদি কোনো কলেজে শিক্ষকের ঘাটতি পড়ে, সেক্ষেত্রে ঢাকা, জগন্নাথ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের শিক্ষক বা সিনিয়র গ্র্যাজুয়েটরাও এ বিষয়ে পাঠদান করতে পারেন। কিন্তু কিছুতেই অন্য বিষয়ের শিক্ষক এনে পাঠদান করানোর যৌক্তিকতা নেই।

প্রসঙ্গত, গত বছরের ১৩ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সাত কলেজকে এক সার্কুলারে জানায়, ‘স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস’ কোর্সটি ইতিহাসের পাশাপাশি ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকরাও পড়াতে পারবেন।’ ২০১৩ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ‘স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস’ কোর্স প্রবর্তনের পর থেকে ইতিহাসের শিক্ষকরাই এটি পড়াতেন। কিন্তু এ সার্কুলারের পর জটিলতা তৈরি হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ৩১ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানকে একটি চিঠি দেয় ইউজিসি।

ওই চিঠিতে বলা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাত কলেজে ‘স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস’ কোর্সটি কলেজগুলোর শুধু ইতিহাস বিভাগের শিক্ষকরা পাঠদান, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও উত্তরপত্র মূল্যায়ন করতে পারবেন। ইউজিসির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট বিভাগের পরিচালক মো. কামাল হোসেন স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতেও ভিসিকে অনুরোধ করা হয়।

ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, যে কোনো বিষয় সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদেরই পড়ানো যুক্তিযুক্ত। সাত কলেজে ‘স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস’ কোর্সটি পড়ানোর ইস্যুতে একটি জটিলতা আমাদের নজরে আসার পরে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে এ সাত কলেজের সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন (বিশ্ববিদ্যালয়ের) ব্যবসায় অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলাম। তিনি শনিবার যুগান্তরকে বলেন, ‘ভালোর জন্যই বিকল্প হিসেবে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষকদের দিয়ে পাঠদান করানোর কথা বলা হয়েছে। কেননা পরিদর্শনে আমরা দেখেছি যে, সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের অনেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। কেউ কেউ কলেজ ফেলে সরকারি অফিসে দৌড়াদৌড়ি করেন। তাছাড়া এ আবশ্যিক বিষয়ের সব শিক্ষার্থীকে পাঠদানের জন্য কলেজগুলোয় সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিক্ষকের ঘাটতি আছে। এমন অবস্থায় নিশ্চয়ই পাঠদান বন্ধ রাখা সম্ভব নয়। এরপরও আমরা বলেছি, যেসব কলেজে ইতিহাসের পর্যাপ্ত শিক্ষক আছেন, তারাই পড়াবেন। কিন্তু এরপরও কলেজগুলোর কয়েকজন শিক্ষক এ নিয়ে উচ্চবাচ্য করছেন।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগের কথা এসেছিল। কিন্তু কোনো কোনো কলেজ আমাদের কাছে টাকা চেয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেছে তাদের তহবিল ঘাটতি। এমন নানা ঝামেলা আছে। তারপরও আমরা কলেজগুলোর সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করব।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×