ঝড়ো মৌসুম

সভা সেমিনারেই সীমাবদ্ধ দুর্ঘটনা রোধের প্রস্তুতি

বৈরী আবহাওয়ায় ঘটে ৩৫ শতাংশ দুর্ঘটনা * চলতি বছরে ১৫টি দুর্ঘটনা * ফিটনেস সনদে নানা অনিয়ম

প্রকাশ : ২১ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  কাজী জেবেল

চলতি ঝড়ো মৌসুমে নৌযান ও নৌপথের যাত্রীদের নিরাপত্তায় সভা, সেমিনার ও সচেতনতামূলক পদক্ষেপে সরকারি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রয়েছে। নৌপরিবহন অধিদফতর এবং বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) বড় নদীবন্দরগুলোতে নৌযান চলাচল মনিটরিংয়ে কমিটি গঠন ও কয়েকটি নদীবন্দরে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়েছে। তবে কমিটিগুলোকে সক্রিয় কার্যক্রম চালাতে দেখা যায়নি।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘূর্ণিঝড় বা কালবৈশাখী ঝড় ও প্রবল সে াতের কারণে ৩৫ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে। চলতি মাসে কালবৈশাখী ঝড়ে আটটি লঞ্চ, কার্গো ও ট্রলার ডুবেছে। এতে কয়েকজনের প্রাণহানিও ঘটেছে। ২০১৮ সালের তুলনায় চলতি বছরে নানা কারণে নৌদুর্ঘটনা ও হতাহত উভয় সংখ্যা বেড়েছে।

নৌদুর্ঘটনার কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে- আনফিট ও অনিবন্ধিত নৌযান চলাচল, নৌযানে অতিরিক্ত যাত্রী ও মাল বোঝাই, সনদবিহীন বা অদক্ষ মাস্টার ও ড্রাইভার দিয়ে নৌযান চালানো এবং রাতে বালুবাহী বাল্কহেড চলাচল। এছাড়া দুর্ঘটনার অন্য কারণগুলোর সমাধানেও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। রাতে বালুবাহী বাল্কহেড চলাচল বন্ধ হয়নি। এটিও নৌদুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।

সারা দেশে নৌযান নিবন্ধন, ফিটনেস ও চালকদের পরীক্ষা নিয়ে থাকে নৌ-পরিবহন অধিদফতর। নৌযানের নিরাপত্তার বিষয়টিও দেখভাল করে সংস্থাটি। জানা গেছে, নতুন নৌযানের নিবন্ধন দেয়া এবং নাবিকদের পরীক্ষা নেয়াসহ সবই করছেন নৌপরিবহন অধিদফতরের মাত্র ছয়জন সার্ভেয়ার। এ হিসেবে একজন সার্ভেয়ার বছরে গড়ে চার হাজার ৫২৫টি নৌযানের ফিটনেস সনদ দিচ্ছেন।

এসব জাহাজের ফিটনেস দেয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও রয়েছে নানা অনিয়মের অভিযোগ। ঝড়ো মৌসুমে নেয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে নৌপরিবহন অধিদফতরের মহাপরিচালক কমডোর সৈয়দ আরিফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন- ঢাকা, বরিশাল, খুলনাসহ কয়েকটি নদীবন্দরে সচেতনতামূলক সভা করা হয়েছে। সচেতনতা বাড়াতে কর্মশালাসহ বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান করা হয়েছে। সার্ভেয়ার সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি অনেক দিনের সমস্যা। চেষ্টা করছি এ সমস্যার সমাধান করতে।

নৌবন্দরগুলোর দেখভালের দায়িত্বে থাকা বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান কমডোর মাহবুব-উল ইসলাম বলেন, প্রতিটি বন্দরে নোটিশ দেয়া হয়েছে। আবহাওয়া খারাপ হলে লঞ্চসহ সব নৌযান চলাচল বন্ধ করে দেয়া হবে। কোনো নৌযান পথিমধ্যে থাকলে সেটিকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হবে।

জানা গেছে, চলতি মাসের প্রথমার্ধে বাগেরহাটের পশুর চ্যানেলের হারবাড়িয়া এলাকায় কালবৈশাখীর সময় বাণিজ্যিক জাহাজের ধাক্কায় ৬০০ মেট্রিক টন সার বোঝাই কার্গো জাহাজ এফবি হারদা ও লঞ্চ এমএল আকতার ডুবে যায়। ওই ঘটনায় দু’জনের প্রাণহানি ঘটে। এ সময় সেন্টমার্টিন দ্বীপের কাছাকাছি পাঁচটি মাছ ধরার ট্রলার ডুবলে ১৫ জন নিখোঁজ হন। এ ছাড়া মাসের শুরুতে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও এলাকায় ঝড়ে ট্রলার ডুবে উপজেলা নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী একজন নারী আনসারের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় আরও দু’জন নিখোঁজ হন।

মার্চ থেকে ১৫ অক্টোবর সময় পর্যন্ত দেশে নৌদুর্ঘটনা বেশি ঘটে। এ বছর ৩০ মার্চ থেকে ৫ এপ্রিল নৌনিরাপত্তা সপ্তাহ পালন করেছে নৌ-পরিবহন অধিদফতর। এ সময় কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকা ও স্থানীয়ভাবে নারায়ণগঞ্জ, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি ও বরিশালে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান করেছে সংস্থাটি। তবে নৌযানের ফিটনেস রক্ষায় এ সংস্থাটির পদক্ষেপ নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কালবৈশাখী ঝড় ও বৈরী আবহাওয়ায় ৩৫ শতাংশ, অতিরিক্ত মাল ও পণ্য বোঝাইয়ের কারণে ২৫ শতাংশ, সনদবিহীন বা অদক্ষ মাস্টারের কারণে ১০ শতাংশ, নৌযানে সংঘর্ষে ১৫ শতাংশ, রাতে বালুবাহী নৌযানের সঙ্গে সংঘর্ষে পাঁচ শতাংশ এবং অন্য সব কারণে ১০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে।

২৯ ও ৩০ মার্চ রাতে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ ও চাঁদপুরে কয়েকটি নদীতে (বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, মেঘনা) সরেজমিন বিপুলসংখ্যক বালুবাহী বাল্কহেড চলাচল করতে দেখা গেছে। বালু বোঝাইয়ের কারণে এসব বাল্কহেডের বডির প্রায় সব অংশই পানিতে ডুবে থাকে। সামনের মাস্তুল ও পেছনের চালকের স্থান শুধু ভেসে থাকে। অন্ধকারে এসব নৌযান দেখা যায় না। এতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার শঙ্কা থাকে বলে জানান লঞ্চ মালিক ও চালকরা।

এ বিষয়ে লঞ্চ মালিক সমিতির সহ-সভাপতি ও পারাবত লঞ্চের মালিক শহীদুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, চলতি মৌসুমে নদী এমনিতেই উত্তাল থাকে। এর মধ্যে অন্ধকারে এসব বালুবাহী নৌযান চলাচল করায় যাত্রীবাহী লঞ্চ চালকরা আতঙ্কে থাকেন। তিনি বলেন, শুধু সভা-সেমিনার করলেই হবে না, রাতের বালুবাহী নৌযান চলাচল বন্ধ করতে হবে। তিনি বলেন, ২০০৪ সালে নদীতে আশ্রয়স্থান নির্মাণের কথা বলা হলেও তা করা হয়নি। মুন্সীগঞ্জ থেকে বরিশালের মিয়ারচর পর্যন্ত কোনো আশ্রয়স্থান নেই।

বাড়ছে দুর্ঘটনা : নৌপরিবহন অধিদফতরের হিসাব অনুসারে চলতি বছরে ৯টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। তবে দুর্ঘটনার সংখ্যা ১৫টিরও বেশি। সংস্থাটির কর্মকর্তারা জানান, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ৯টি দুর্ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। বাকি নয় মাসে আরও দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে তাদের শঙ্কা।