সিপিডির মূল্যায়ন

জিডিপি প্রবৃদ্ধির হিসাবে স্বচ্ছতা জরুরি

রাজস্ব আয়ে ৮৫ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি থাকবে, তবে সরকারের কিছু ভালো উদ্যোগও আছে * আওয়ামী লীগের এবারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি সবচেয়ে বেশি সুচিন্তিত হলেও সফলতা অর্জন করতে হলে আরও নিষ্ঠাবান হতে হবে

  যুগান্তর রিপোর্ট ২৪ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জিডিপি প্রবৃদ্ধির হিসাবে স্বচ্ছতা জরুরি

মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হিসাবে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হবে ৮ শতাংশের বেশি।

কিন্তু প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সম্পৃক্ত সূচকগুলোতে তার প্রতিফলন নেই। বিশেষ করে বেসরকারি বিনিয়োগ, পুঁজির আমদানি, কর আদায়, ব্যাংকের ঋণপ্রবাহ, মূল্যস্ফীতি এবং শ্রমের উৎপাদনশীলতার তথ্যের সঙ্গে উচ্চ প্রবৃদ্ধির মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন। এ অবস্থায় কী কী তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে প্রবৃদ্ধির এই হিসাব করা হয়েছে, তা প্রকাশ করা হোক।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) মূল্যায়নে এসব দাবির বিষয় উঠে এসেছে। মঙ্গলবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সরকারের ১শ’ দিনের কর্মকাণ্ডের ওপর এ মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। বক্তারা বলেন, অনিবার্য কিছু কারণে সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে চলতি অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আয়ে ৮৫ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি থাকবে।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সিপিডির সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, ড. মোস্তাফিজুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান।

তবে সংস্থাটির মতে, আলোচ্য সময়ে সরকারের কিছু ভালো উদ্যোগও রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের ওপর কর আরোপ অন্যতম। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিজ্ঞাপনের ওপর কর আরোপ, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা ও জেলা বাজেট চালুর উদ্যোগ এবং টাকা পাচার রোধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের বিধিমালা প্রকাশ করা উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক কাজ। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে প্রবৃদ্ধি-নির্ভর অর্থনৈতিক পর্যালোচনা প্রাধান্য পাচ্ছে।

কিন্তু বিশ্বব্যাপী যে আলোচনা হচ্ছে, তার মূল কথা প্রবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ, তবে যথেষ্ট নয়। অর্থনৈতিক শাস্ত্রে এটি একটি দ্বৈবজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। এ কারণে মানব উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন সূচকের ওপর জোর দেয়া হচ্ছে।

সবশেষে যে বৈশ্বিক ঐকমত্য হয়েছে, তা হল টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য বা এসডিজি। এটি প্রবৃদ্ধির বাইরে গিয়ে পূর্ণাঙ্গ উন্নয়নের ধারণাকে সামনে নিয়ে এসেছে। এ কারণে প্রবৃদ্ধি নিয়ে যখন আলোচনা হবে, তখন পূর্ণাঙ্গ উন্নয়নের বিষয়টি আমাদের ধারণার বাইরে যাতে চলে না যায়, সে বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে জিডিপির যে প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, তা অত্যন্ত উচ্চতর, প্রশংসনীয় এবং অনেকের কাছে ঈর্ষণীয়। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধির মধ্যে পূর্ণাঙ্গ উন্নয়নের প্রকাশ দেখা যাচ্ছে না।

দেবপ্রিয় বলেন, বর্তমানে উন্নয়নের যে তথ্য এসেছে, তার মধ্যে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের বাড়তি কোনো ভূমিকা নেই। অন্যদিকে উন্নয়ন হলে যে ধরনের কর আহরণ হয়, সেই কর আহরণ দেখিনি। বাড়েনি বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ। ব্যাংকিং খাতে ঋণ পরিশোধেও চাঞ্চল্য নেই। বড় ধরনের পুঁজি পণ্যের আমদানিতে গত বছরের চেয়ে প্রবৃদ্ধি কমেছে। ফলে জিডিপি প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে যে ধরনের সূচক থাকে, সেই সূচকগুলোতে যে প্রতিফলন হওয়ার কথা, সেগুলো আমাদের কাছে ধরা পড়ছে না।

দ্বিতীয় বিষয় হল, ধরে নিলাম, যে প্রবৃদ্ধির কথা বলা হচ্ছে তা সঠিক। কিন্তু প্রবৃদ্ধির অন্যতম উপকরণ হল বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান। অর্থাৎ দেশে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়লেই প্রবৃদ্ধি বাড়বে। তবে দৃশ্যত এ দুটি উপকরণ তো বাড়েনি।

তাহলে প্রশ্ন হল- প্রবৃদ্ধি বাড়ল কিসের ভিত্তিতে? তিনি বলেন, এ ছাড়া যে শ্রমের উৎপাদনশীলতার কথা বলছি, এটি শুধু গার্মেন্টস নয়। এর মধ্যে কৃষি, পরিবহন এবং ব্যবসাসহ সবকিছু আছে। সরকারের হিসাবে, মনে হচ্ছে, এই সবকিছুতেই বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে।

কিন্তু প্রশ্ন হল- যেখানে ব্যবসার হিসাবের জন্য ইলেট্রনিক অ্যাকাউন্টিং মেশিন চালু করা যায়নি, সেখানে কীভাবে এবং কোন ধরনের উৎপাদনশীলতা বাড়ল, সেটি চিন্তার বিষয়।

তার মতে, প্রবৃদ্ধির হিসাবের ক্ষেত্রে যে ডিফ্লেটেড (মূল্য সমন্বয়ক) ব্যবহার করা হয়েছে সেখানে মূল প্রবৃদ্ধি থেকে মূল্যস্ফীতি ৪ শতাংশের কিছু বেশি বাদ দেয়া হয়েছে।

কিন্তু সরকারি হিসাবেই মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশের উপরে। সে ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি ১ থেকে দেড় শতাংশ কমিয়ে দেখানো হয়েছে। এ বাড়তি মূল্যস্ফীতিটুকু বাদ দিলেই প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশ কমত।

ফলে কী কারণে এই ১ থেকে দেড় শতাংশ সমন্বয়ে সমস্যা হচ্ছে, সেটি আমাদের বুঝার ব্যাপার। এ জন্য প্রবৃদ্ধির হিসাবে বিকল্প ব্যবস্থা আছে কি না, সেটি চিন্তার সুযোগ আছে। তিনি বলেন, এই সন্দেহ নিরসনের জন্য আমরা বলছি, যেসব তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে প্রবৃদ্ধির হিসাব অনুমিত হয়েছে, তা সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করা হোক; না হলে প্রবৃদ্ধি নিয়ে সরকার ও সরকারি প্রতিষ্ঠান পরিসংখ্যান ব্যুরো, অর্থ মন্ত্রণালয়, বিনিয়োগ বোর্ড, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে অনেক প্রশ্ন করা যাবে।

ড. দেবপ্রিয় বলেন, প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ হয়েছে বলে কোনো হিংসা, পরিতাপ বা গ্লানি এখানে নেই। আমরা এখানে হিসাবের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা চাই। যার মাধ্যমে পরবর্তী নীতি নির্ধারণে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া যায়।

তিনি আরও বলেন, ১শ’ দিনের পরিকল্পনার মূল্যায়নের সময় এখনও আসেনি। এটি মূল্যায়নের জন্য সরকারকে আরও সময় দিতে হবে। তবে বিবেচ্য বিষয় হল একটি সরকার যখন ক্ষমতায় আসে, পেছনের অভিজ্ঞতার আলোকে নতুনভাবে কিছু উদ্যোগ নেয়।

আর যে উদ্যোগের প্রাথমিক বিন্দু হল তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। এ ক্ষেত্রে এ পর্যন্ত দেশে যত নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এসেছে, তার মধ্যে আওয়ামী লীগের এবারের প্রতিশ্রুতি সবচেয়ে বেশি সুচিন্তিত। সে কারণে সরকার ও শাসক দল এটির ব্যাপারে সমানভাবে নিষ্ঠাবান হওয়া উচিত। আশা করেছিলাম, শুরুটা বড় ধরনের একটি উত্থানের মধ্য দিয়ে হবে। কিন্তু গত একশ’ দিনে সরকারের ব্যাপারে সার্বিক মূল্যায়ন হল আমরা উৎসাহহীন, উদ্যোগহীন, উচ্ছ্বাসহীন এবং একটি উদ্যমহীন সরকার দেখেছি।

তিনি আরও বলেন, আমাদের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ছিল দিনবদলের, কিন্তু বদল আটকিয়ে রাখছে, এমন একটি গোষ্ঠী, যারা এই মুহূর্তে দুর্নীতি, অনিয়ম এবং অব্যবস্থাপনা থেকে সুবিধাভোগী।

রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে থাকা এই সুবিধাভোগী সম্প্রদায়, রাজনৈতিক শক্তিকে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে দিচ্ছে না। অর্থাৎ রাষ্ট্র যারা নিয়ন্ত্রণ করছে, তাদের কার্যক্রম শাসক দলের রাজনেতিক প্রতিশ্রুতির মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়ে এই ভিন্নতা দূর করতে না পারলে নির্বাচনী ইশতেহার কাল্পনিক দলিল ইতিহাস বিচার করবে।

তিনি বলেন, গত ৫ থেকে ১০ বছরে বড় বড় কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে সেগুলোকে সামনে এগিয়ে নিতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হল- নতুনভাবে কী উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, সেটি বিবেচ্য বিষয়। উল্টো সাম্প্রতিক সময়ে যেসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তা আমাদেরকে মিশ্র ইঙ্গিত দিচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধিদের কার্যকর ভূমিকা লক্ষ করা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় যে ধরনের কাঠামোগত সংস্কার করার দরকার ছিল, তা হয়নি। আগামীতে সে ধরনের উদ্যোগ নেয়া হবে বলে আশা করেছিলাম। কিন্তু সে ধরনের পদক্ষেপও দেখিনি।

তিনি বলেন, বর্তমানে শুধু ব্যাংকিং খাত, কর আহরণ, শেয়ারবাজারে সমস্যা নয়; সামষ্টিক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বৈদেশিক লেনদেন ও দায় পরিশোধের ক্ষেত্রে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। এগুলো যে কোনো সময় আমাদের সোনার সংসারে আগুন ধরিয়ে দিতে পারে, সে ব্যাপারে সচেতন কোনো পদক্ষেপ দেখি না। কিন্তু গত কয়েক বছরে এখানে স্থিতিশীলতা ছিল।

ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বিদ্যমান ব্যাংকিং ব্যবস্থার নানা সংকটের কারণে আগামীতে আমরা নাগরিকদের নিয়ে ব্যাংকিং কমিশন গঠনের কথা ভাবছি। তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, গত অর্থবছরে রাজস্ব আয়ে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৭১ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা ঘাটতি ছিল। কর রাজস্ব ৮৭ শতাংশ এবং করবহির্ভূত ১৩ শতাংশ।

এই ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছর শেষে ৮৫ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি থাকবে। তবে রাজস্ব আদায়ে গত দশ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ রেকর্ড অর্জন করলেও ঘাটতি ৭২ হাজার কোটি টাকার নিচে নামানো যাবে না। তিনি বলেন, মূল্য সংযোজন করা বা ভ্যাটের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ছাড়ের কথা শোনা যাচ্ছে। আমাদের প্রস্তাব হল ভ্যাটের হার ১২ শতাংশ করে সবার জন্য সমান করা হোক।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×